বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারগুলো কেবল বইয়ের ভান্ডার নয়; এগুলো জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মেধা বিকাশের প্রাণকেন্দ্র। দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন, কোথাও অব্যবস্থাপনা ও সীমাবদ্ধতা, আবার কোথাও পরিকল্পিত উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার : ঐতিহ্য, জ্ঞান ও আধুনিকতার মিলনস্থল
মাহির কাইয়ুম, ঢাবি
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী জ্ঞানতীর্থ। টিএসসি ও শাহবাগের ব্যস্ততা আর নগরজীবনের কোলাহলের মাঝেও লাল ইটের এই স্থাপনাটি যেন একাগ্রতা ও মননের আশ্রয়স্থল। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যাত্রা শুরু করা এই গ্রন্থাগার আজ প্রজন্মের পর প্রজন্মের মেধা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
প্রথম দিকে ঢাকা কলেজের প্রায় ১৮ হাজার বই নিয়ে যাত্রা শুরু হয় গ্রন্থাগারটির। শুরুতে এটি ঢাকা হলের (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) অংশ ছিল, পরে জগন্নাথ হল হয়ে বর্তমান স্থানে স্থায়ী রূপ পায়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাবলির নীরব সাক্ষী। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছুর প্রতিফলন যেন এর দেয়ালে লুকিয়ে আছে।
গ্রন্থাগারের স্থাপত্যশৈলীও মনোযোগ কাড়ার মতো। প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশের উপযোগী নকশা, বিশাল পাঠকক্ষ এবং নীরব পরিবেশ শিক্ষার্থীদের গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়াশোনার সুযোগ করে দেয়। প্রতিদিন ভোরে লাইব্রেরির সামনে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সারি এই প্রতিষ্ঠানের চাহিদারই প্রতিফলন।
এখানে প্রায় সাত লাখ বইয়ের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি—সব বিষয়ের বইয়ের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি জার্নাল ও গবেষণাপত্র নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ আকর্ষণ হলো পাণ্ডুলিপি বিভাগ, যেখানে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত। সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, বাংলা ও তিব্বতি ভাষার এসব দলিল উপমহাদেশের ইতিহাস গবেষণায় অমূল্য।
পুরোনো সংবাদপত্রের মাইক্রোফিল্ম সংরক্ষণও এই গ্রন্থাগারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ‘ইত্তেফাক’ বা ‘আজাদ’-এর মতো পত্রিকার সংরক্ষিত কপি গবেষকদের জন্য অতীতের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা অনুধাবনের সুযোগ তৈরি করে।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লাইব্রেরি আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। OPAC সিস্টেমের মাধ্যমে বই খোঁজা সহজ হয়েছে। JSTOR, Emerald ও Oxford Journals-এর মতো আন্তর্জাতিক ডেটাবেস ব্যবহারের সুযোগ শিক্ষার্থীদের গবেষণাকে বৈশ্বিক পরিসরে নিয়ে গেছে। পাশাপাশি হাই-স্পিড ইন্টারনেট, কম্পিউটার ল্যাব ও ডিজিটাল রিসোর্স সেন্টার এই পরিবর্তনকে আরো গতিশীল করেছে।
তবে সীমাবদ্ধতাও কম নয়। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আসনসংখ্যা মাত্র দুই থেকে আড়াই হাজার। ফলে প্রতিদিনই আসন দখলের প্রতিযোগিতা দেখা যায়। অনেক শিক্ষার্থী হলের রিডিং রুমে পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় এখানে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এছাড়া বিসিএস ও চাকরির প্রস্তুতির প্রবণতা লাইব্রেরির ব্যবহারধারায় পরিবর্তন এনেছে। একদিকে এটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করছে, অন্যদিকে একাডেমিক গবেষণার জায়গা কিছুটা সংকুচিত হচ্ছে। অবকাঠামোগত কিছু সমস্যাও রয়েছে; যেমন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, বই সংরক্ষণে অবহেলা এবং অন্যান্য সেবার সীমাবদ্ধতা।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন আধুনিক লাইব্রেরি নির্মাণের উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। পরিকল্পিত নতুন ভবনে উন্নত পাঠকক্ষ, স্মার্ট ক্যাটালগ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধা যুক্ত হলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট লাইব্রেরিতে রূপ নেবে। সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার কেবল একটি পাঠাগার নয়; এটি দেশের জ্ঞানচর্চা ও ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক, যা ভবিষ্যতেও মেধাবিকাশের আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার : সম্ভাবনার ভিড়ে অব্যবস্থাপনার ছায়া
ফাহমিদুর রহমান ফাহিম, রাবি
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও আত্মোন্নয়নের প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের বর্তমান চিত্র অনেকটাই হতাশাজনক। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রন্থাগার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এলেও এখনো আধুনিকায়নের কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছাতে পারেনি।
প্রায় আড়াই লাখ বই, জার্নাল ও গবেষণাপত্র থাকা সত্ত্বেও বই খুঁজে পাওয়া এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই বই খোঁজা ও ইস্যুর কাজ সম্পন্ন হয়। প্রযুক্তিনির্ভর ক্যাটালগিং ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বই থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা তা খুঁজে পান না। ২০১৩ সালে গ্রন্থাগারকে ডিজিটালাইজড করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থের অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে আজও শিক্ষার্থীদের বই খুঁজতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।
অবকাঠামোগত সমস্যাও এখানে প্রকট। পর্যাপ্ত আসন নেই, নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। গরমের সময় পড়াশোনা প্রায় অসহনীয় হয়ে ওঠে। ফ্যানের শব্দ ও অস্বস্তিকর পরিবেশ মনোযোগ নষ্ট করে। যদিও সম্প্রতি কিছু গদিযুক্ত চেয়ার সংযোজন করা হয়েছে এবং এসি স্থাপনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তবুও তা এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
গ্রন্থাগারের পাঠকসংখ্যা কমে যাওয়াও একটি উদ্বেগজনক দিক। গত এক দশকে প্রতিদিনের পাঠকসংখ্যা ২০০ থেকে কমে ৩০-৪০ জনে নেমে এসেছে। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিমুখী হতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—পুরোনো বই বিদ্যমান থাকা, নতুন সংস্করণের অভাব, দুর্বল ইন্টারনেট, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং অনলাইন ক্যাটালগের অকার্যকারিতা। অনেক সময় অনলাইনে বই ‘available’ দেখালেও বাস্তবে পাওয়া যায় না, যা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে সামনে আনে।
এছাড়া বই চুরি বা ভুল স্থানে রেখে দেওয়ার প্রবণতাও সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। পর্যাপ্ত মনিটরিং এবং দক্ষ জনবল না থাকায় এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। একটি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল ক্যাটালগ, নতুন বই সংযোজন, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই গ্রন্থাগার আবার তার গুরুত্ব ফিরে পেতে পারে। শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে এটি আবার জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হওয়া সম্ভব।
সর্বোপরি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি আধুনিক ও কার্যকর গ্রন্থাগার সময়ের দাবি। যথাযথ উদ্যোগই পারে এই অব্যবস্থাপনাকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার : গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার আধুনিক আলোকবর্তিকা
মো. আমানউল্লাহ, বাকৃবি
সবুজে ঘেরা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি দেশের কৃষি গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী এই ক্যাম্পাসে অবস্থিত গ্রন্থাগারটি দীর্ঘ ছয় দশক ধরে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জ্ঞানপিপাসা পূরণ করে আসছে।
১৯৬১ সালে মাত্র পাঁচ হাজার বই নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই গ্রন্থাগার আজ দুই লক্ষাধিক বই, হাজারো থিসিস ও জার্নালের সমৃদ্ধ ভান্ডারে পরিণত হয়েছে। ১৯৬৯ সালে বর্তমান ভবনে স্থানান্তরিত হওয়ার পর এর পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। আধুনিক স্থাপত্য ও কার্যকর নকশা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আরামদায়ক পড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।
এই গ্রন্থাগারের অন্যতম শক্তি হলো এর পরিকল্পিত আধুনিকায়ন। ১৯৯০ সালে কম্পিউটারভিত্তিক সার্চ চালু এবং ২০০৪ সালে ইন্টারনেট সংযোগ যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে এটি ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করে। বর্তমানে Research4Life, PERI নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হাজারো ই-জার্নাল ও গবেষণাপত্রে প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন।
২০২৪ সালে এলসেভিয়ার থেকে ই-বুক সংযোজনের মাধ্যমে ডিজিটাল সংগ্রহ আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা এখন সহজেই বিশ্বমানের তথ্য ও গবেষণার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারছেন।
অবকাঠামোগত দিক থেকেও এটি প্রশংসনীয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, পর্যাপ্ত আসন, নিরিবিলি পাঠকক্ষ এবং আলাদা রিডিং স্পেস শিক্ষার্থীদের দীর্ঘসময় মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পৃথক কক্ষ থাকায় পড়াশোনার পরিবেশ আরো সুশৃঙ্খল হয়েছে।
গ্রন্থাগারটিতে সংরক্ষিত পুরোনো সংবাদপত্র ও গবেষণামূলক উপকরণ ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সিডি, মাইক্রোফিল্মসহ বিভিন্ন আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, এই গ্রন্থাগারের শান্ত পরিবেশ, আধুনিক সুবিধা এবং সহজলভ্য রিসোর্স তাদের পড়াশোনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় অধ্যয়নের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচিত।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পরিকল্পিত উন্নয়ন, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশের মাধ্যমে এটি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে গ্রন্থাগারটি দেশের কৃষি গবেষণা ও জ্ঞানচর্চাকে আরো সমৃদ্ধ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা।