এক
আকাশ কালো হয়ে আসছে। ঝড়-বৃষ্টির খবর শোনা যাচ্ছে রেডিও-টিভিতে। আবুরালী ঘরের চালে তার দিয়ে শক্ত টানা বেঁধে দেন, একমাত্র ছেলে সুজন বাবার কাজে সাহায্য করে।
প্রতি বছর একটা করে গরু পোষেন আবুরালী। গতবার কোরবানির ঈদের আগে গরুটা চুরি হয়ে গেলে দুদিন কিছু মুখে দেননি বাবা। শেষে মা তার সব গয়না বিক্রি করে টাকা ধার করে এই গরু কিনেছেন। সুজন তার নাম রেখেছে লালচান। লাল-রঙা লালচান। আবুরালীও বলেন, ‘আমার দুই ছেলে—সুজন আর লালচান।’
সুজনের মা মরিয়ম বলেন, ‘অত আহ্লাদ দেখিও না। সময়মতো ভালো দাম পালি ওকে তো বিক্রি করে দিতিই হবে। কত টাকা ধারদেনা আচে, তা মনে আচে তো?’
মরিয়মের কথায় দুমড়েমুচড়ে ওঠেন আবুরালী। সুজনের মনটাও খুব খারাপ হয়ে যায়। এত যত্ন করে এত ভালোবেসে তাকে কি না তুলেই দিতে হবে অন্যের হাতে... !
ভাবতেই চোখ ভিজে আসে ক্লাস ফাইভে পড়া সুজনের। বাবাও কথা বলেন না। গামছাঘাড়ে পুকুরপাড়ে চলে যান। তোলা পানিতে লালচানকে বেশ যত্নে গা ধুইয়ে দেন। তারপর আপন মনে গোসল করে বাবার সঙ্গে সুজনও গোসল সেরে নেয়।
ঘরের বারান্দায় পাটি পেতে দেন মরিয়ম। তারপর ভাত বাড়েন। কচুশাক আর মসুরের ডাল দিয়ে হাত চেটেপুটে খেয়ে উঠে পড়ে সুজন ও আবুরালী।
দুই
দুপুর গড়াতে না গড়াতেই সারা আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। সমানে মেঘ ডাকতে শুরু করল। একটু বাদে নামল বজ্রবৃষ্টি, সঙ্গে শুরু হলো ঝড়। গোয়ালঘরের টিনের চাল উড়ে গিয়ে পড়ল পাশের এক ধানক্ষেতে। তড়িঘড়ি করে লালচানকে নিয়ে ঘরের বারান্দায় উঠে পড়লেন আবুরালী। মনে মনে কতবার যে আল্লাহকে স্মরণ করে সুরা-কালাম পড়তে লাগলেন মরিয়ম। তবু ঝড়বৃষ্টির কোনো থামাথামি নেই। বড় ঘরে খুঁটি আর ঘরের চাল বাতাসে উথালপাথাল দুলতে লাগল।
লালচান ডাকতে লাগল সমানে। আবুরালী শক্ত করে লালকে ধরে রাখলেন। এটাই যে তাদের একমাত্র সম্বল। লালচানের কিছু হলেই গোটা পরিবার শেষ। প্রতিবেশী রহমত মিয়া এগিয়ে এসে বললেন, ‘আর দেরি করবা না, আবুরালী ভাই। সামনেই কোরবানির ঈদ। ভালো দাম পাবা। সময় থাকতি গরুটা বেচে দিয়ে আসো। ঝড়বৃষ্টির সুময়, কখন কী হয়ে যায়, বলা তো যায় না! যদি আগের গরুটার মতো হয়! তালিই তো সব শেষ।’
আগের গরুটার কথা মনে করিয়ে দিতেই কেঁপে ওঠেন আবুরালী। নাহ্! এবার আর ভুল করা যাবে না। পরশু ফুলবাড়ির হাটে তুলেই বিক্রি করে দিতে হবে লালুকে। অত লাভের দরকার নেই। এসব ভাবেন আর শক্ত করে জড়িয়ে রাখেন লালুকে।
তিন
আজ ফুলবাড়ির গরুর হাট। আকাশের অবস্থা ভালো থাকলে হয়তো আরো জমজমাট হতো। কিন্তু কী আর করা! আর দু’সপ্তাহ বাদে ঈদ। এখনো বেশ কয়েকটা হাট পাওয়া যেত, কিন্তু সাহস পাচ্ছে না আবুরালী। লালচানকে গোসল করানো হয়েছে। শিংয়ে তেল মাখিয়ে চকচকা করা হয়েছে। গলায় রঙিন মালা। কিন্তু কিছু মুখে তুলছে না লালচান। হয়তো সব বুঝতে পেরেছে সে। এ বাড়ি থেকে এটাই যেন তার শেষযাত্রা। কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে গরুটা। হাটে যাওয়ার আগে সুজন আর মরিয়মকে পাওয়া গেল না। মরিয়ম আঁচলে মুখ লুকিয়ে হয়তো কোথাও কাঁদছে। আর সুজন তো আজ স্কুলেও যায়নি। সেও চোখ ভেজাচ্ছে পুকুরপাড়ে বসে। আবুরালীও চোখ মুছে মন শক্ত করে আল্লাহকে স্মরণ করে বাড়ি থেকে বের হন।
আজ হাটে লোকজন কম। বেচাবিক্রিও ভালো নয়। আক্তার কসাই লালুর দাম তোলেন এক লাখ ষাট হাজার টাকা। অথচ বাড়িতে লালচানকে দেখে দাম বলেছিলেন, দুই লাখ বিশ হাজার টাকা। অনেক অপেক্ষা করেও আর দাম উঠল না। তাই ওই দামেই বিক্রি করবেন বলে ঠিক করলেন আবুরালী। কিন্তু লালচানকে ওদের হাতে তুলে দেওয়ার সময় ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। আবুরালীর হাত থেকে ছুটে গেল গরুটা। গর্জন করে হাত-পা ছুড়ে ছুট লাগাল। আবুরালীও তার পিছু পিছু ছুটে গেলেন। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে থেমে গেলেন তিনি। লালুকে আর দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিম পাড়ার দিকে গেছে। ডাকাতপাড়া বলে পরিচিত ওই জায়গাটা। ওখানে গিয়ে কখনো কেউ ফিরে এসেছে, এমন কথা শোনা যায়নি। মেঘ গর্জে হঠাৎ বৃষ্টি নামে, সঙ্গে দমকা হাওয়া। লালচানকে হারিয়ে শিশুর মতো কাঁদতে থাকেন আবুরালী। বুঝে পান না, কেন এমন করল গরুটা। এত শান্ত লালচান কেন এমন করল!
শূন্য হাতে বাড়ি ফিরলেন তিনি। সুজন ও মরিয়মকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন তিনি। বিকাল ও সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এলো।
শূন্য গোয়ালে হঠাৎ শব্দ পেয়ে তড়িঘড়ি করে সবার দৃষ্টি পড়ল সেদিকে। হারিকেন হাতে এগিয়ে যেতেই মরিয়মের কাছে এসে গা ঘষতে লাগল লালচান। সুজন তার মাথায় হাত বোলাতে লাগল। লালচানের চোখে তখন অশ্রু। ডান পায়ের কাটা জায়গা থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে।