ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। প্রত্যেক ঋতুরই নিজস্ব রূপ আছে। তবে বসন্ত একটু ভিন্ন। বসন্ত হলো সর্বশেষ ঋতু। বসন্ত এলে নিষ্প্রাণ পাতাহীন গাছে গজায় সবুজ পাতা। ফল গাছগুলোয় মুকুল উঁকি দেয়। চারদিকে বসন্তের উৎসবের বাতাস দোলা দেয়।
ফুলের গন্ধের সঙ্গে পাখিদের কলকাকলি; সুজলা-সুফলার চিরায়ত বাংলা যে রূপ, তা সগৌরবে ফিরে আসে। সে জন্যই ঋতুরাজ বসন্ত। আজ আমরা পরিচিত হব বসন্তের সৌরভ, সৌন্দর্য ও মোহনীয়তা ছড়ানো এবং দৃষ্টিনন্দিত আকর্ষণীয় কিছু ফুলের সঙ্গে।
ছয় ঋতুর শেষ ঋতু বসন্তের ফুলের মধ্যে পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, গন্ধরাজ, নয়নতারা, কনকচাঁপা, গাঁদা, চাঁপা, ডালিয়া অন্যতম।
পলাশ : বনের বা বাগানের আগুন বলা হয় পলাশকে। এই গাছটি প্রায় ৫০ ফুট লম্বা হয়। পলাশগাছ খুব ধীরগতিতে বাড়ে। নজরকাড়া এ ফুলটি গাছের শাখায় শাখায় লাল ও কমলা রঙের আগুন ধরিয়ে দেয়।
‘হলুদ গাঁদার ফুল, রাঙা পলাশ ফুল এনে দে এনে দে নৈলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল...’ এমন করেই নজরুলগীতিতেও জায়গা করে নিয়েছে পলাশ ফুল। তার মধ্যে ওষুধি গুণও রয়েছে ঢের।
শিমুল : বসন্তের অন্যতম সৌন্দর্য শিমুল। শীতে সব পাতা ঝরে গেলেও ফাল্গুনের শুরুতেই ফুল ফোটে। ধীরে ধীরে লাল টুকটুকে রঙ ধরা শিমুল ফুলে মানুষ তো বটেই, পাখিরাও মেতে উঠে কিচিরমিচির কলতানে। গাছটি উচ্চতায় প্রায় ৯৯ ফুট থেকে ১৩২ ফুট লম্বা হয়। শিমুল ফুলের দৈর্ঘ্য ৮ থেকে ১২ সেন্টিমিটার। চৈত্র ও বৈশাখে শিমুলগাছে তুলা আসে।
কৃষ্ণচূড়া : বসন্ত মৌসুমের সৌন্দর্যের দূত হলো কৃষ্ণচূড়া। শীতের সময় বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে থাকে। ঝরে পড়ে সব পাতা। কিন্তু মাঘ মাসের শেষের দিকেই কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে সবুজ পাতা গজায়। ধীরে ধীরে কৃষ্ণচূড়ার শাখায় শাখায় লাল আগুন ধরিয়ে দিয়ে ফুলের চারটি পাপড়ি মেলে ধরে। কৃষ্ণচূড়া বসন্তের সাজে সজ্জিত হয়ে প্রকৃতিকে রঙিন করে তোলে। অপরূপ রূপে সেজে ওঠা কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে বসন্তের কোকিল এসে বসে। তার মধুর কু কু তানে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে।
গন্ধরাজ : বসন্তের সৌরভের অন্যতম উৎস গন্ধরাজ। সাদা পাপড়ি আর মিষ্টি গন্ধে এই ফুল সবাইকে মুগ্ধ করে। ছোট থেকে মাঝারি আকারের গাছে ফোটে গন্ধরাজ। এর সুগন্ধ এতটাই মনোমুগ্ধকর যে, দূর থেকেও এর অস্তিত্ব জানান দেয়। সারাদিন তো বটেই সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এর সুবাস আরো গভীর হয়ে ওঠে। শুধু সৌন্দর্যেই নয়, এর সুবাস মানুষের মন ও মস্তিষ্ককে প্রশান্ত করে তোলে।
নয়নতারা : পাঁচ পাপড়ির ফুল নয়নতারা। গোলাপি রঙের নয়নতারা দেখতে পয়সার মতো হয়ে থাকে। তাই অনেকে একে পয়সা ফুলও বলে। এর পাতাও গোলাকার। নয়নতারা গাছ অনেক বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
কনকচাঁপা : শীতে সব কটি পাতা ঝরে পড়ার পর যখন বসন্তের শুরুতে নতুন পাতা গজায়, তখন বাদামি রঙের হয় কনকচাঁপা। এরপর ধীরে ধীরে সবুজ হয়। বসন্তের মধ্যেই কনকচাঁপা থোকায় থোকায় সুবাস ছড়ায়। মৃদু বাতাসে ডালে ডালে হলুদ কনকচাঁপা ফুল দোল খায়।
গাঁদা : বসন্তে সুবাস ছড়ানো ফুল গাঁদা। গায়ে হলুদ, বিয়ে অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাঁদা ফুল তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। গাঁদা ফুল হলুদ, সাদা, কমলা বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। তাছাড়া এর ওষুধি গুণও রয়েছে। সে সুবাদে বাণিজ্যিকভাবেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গাঁদা ফুল চাষ হয়।
চাঁপা : চাঁপা বসন্তের আরেকটি মনকাড়া ফুল। হলুদ বর্ণে বা হালকা কমলা রঙের পাপড়ি আর মিষ্টি গন্ধে চাঁপা সহজেই হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গাছের ডালে ডালে ফুটে থাকা চাঁপা ফুল মৃদু বাতাসে দুলতে দুলতে চারদিকে সুবাস ছড়িয়ে দেয়। সকালবেলা এর ঘ্রাণ বিশেষভাবে হৃদয়ে দোলা দেয়। বহু কবিতা ও গানে চাঁপা ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। সৌন্দর্য ও গন্ধে চাঁপা বসন্তের আবহকে আরো সজীব ও রোমান্টিক করে তুলতে সাহায্য করে।
ডালিয়া : ডালিয়া রঙিন সৌন্দর্যের প্রতীক। লাল, হলুদ, গোলাপি, সাদা, বেগুনিসহ নানা রঙে সেজে ওঠে এই ফুল। আকারেও ডালিয়া বেশ বড় ও দৃষ্টিনন্দন। যদিও এ ফুলে তেমন গন্ধ নেই, তবু তার বর্ণিল রূপই তাকে অনন্য করে দিয়েছে।