থানছিগামী একটা বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে লক্কড়ঝক্কড় মার্কা হলেও পাহাড়ি উঁচুনিচু খাড়া বাঁক নেওয়া পথে যাত্রী পরিবহনকারী ঝুঁকিপূর্ণ এ গাড়িগুলোই মানুষের একমাত্র ভরসা। বাসের হেলপার ও ড্রাইভার দুজনই মারমা উপজাতির। ব্যাগট্যাগসহ ইমনকে হেঁটে আসতে দেখে হেলপার যুবক এগিয়ে আসে। গাড়িতে আরো যাত্রী উঠতে শুরু করেছে দেখে ইমন আর দেরি করে না। জানালার ধারে একটি সিটে জেঁকে বসে। অল্প কিছুক্ষণ পর ভেঁপু বাজিয়ে ছেড়ে দেয় বাস।
ইমনের পাশের সিটে বসেছে এক পাহাড়ি যুবক। সিটে বসেই তার সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেয়। থাইল্যান্ডি-ভিয়েতনামিদের মতো দেখতে যুবকটির নাম অংসাই মারমা। পাহাড়ি রাস্তায় বেশ ভালো স্পিডে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে খাড়া হয়ে রাস্তা নেমে গেছে। এরই মধ্যে বাসটি কয়েকটি বিপজ্জনক বাঁক পেরোয়। একটার পর একটা পাহাড়ি ঝরনা পথ চিরে নেমে গেছে । ঝরনার ওপরে ব্রিজ। ব্রিজের ওপর দিয়ে গাড়ি পার হওয়ার সময় ঢং-ঢং শব্দ হয়। সহযাত্রী অং সাই মারমার সঙ্গে ইমনের আলাপ জমে ওঠে। ‘থানছি অনেক দূরের পথ। বান্দরবান থেকে দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের বেশি। এখন বান্দরবান থেকে থানছি পর্যন্ত চমৎকার রাস্তা হয়েছে। বাসে করে যেতে তেমন কোনো অসুবিধা হয় না যাত্রীদের,’ অংসাই একটানা বলে চলে। ইমন তার কথা বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনতে থাকে।
কিছুদিন আগে বগা লেকে কিছু ভয়ংকর লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। ওখানে বেড়াতে আসা কয়েকজন পর্যটক হঠাৎ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। বগা লেক আর লেকের আশেপাশে অনেকভাবে খোঁজাখুঁজি করেও নিখোঁজ মানুষগুলোর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ইমনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাজুর মামাও কিছুদিন আগে বগা লেকে বেড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। তার মৃতদেহেরও খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরপর একইভাবে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলো ইমনকে বেশ আলোড়িত করেছে। ভূগোলের ছাত্র হলেও রহস্যময় নানা ঘটনা তাকে খুব আকর্ষণ করে। অনেক সময় নিজেই ছুটে যায় ঘটনাগুলোর অন্তরালে থাকা কারণগুলো জানতে। এবারও তেমনি মনের তাগিদে রহস্যময় বগা লেকে যাচ্ছে ইমন।
অংসাই মারমা এখানকার রাস্তাঘাট ও জনপদের বিবরণ দিচ্ছে । শুনতে বেশ লাগছে। ‘জানেন, দাদা-দাদি, নানা-নানিরা স্বপ্নেও ভাবেননি এই পাহাড়ে এমন সুন্দর রাস্তাঘাট হবে। তখন তাদের কত কষ্ট করে এখানে চলাফেরা করতে হতো, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে ১১ নম্বর ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না ।’
‘১১ নম্বর মানে? ঢাকার মতো এখানেও ১১ নম্বর রুটের বাস ছিল নাকি?’ অবাক হয়ে জানতে চায় ইমন।
‘আরে নাহ্, ১১ নম্বর মানে হলো পায়ে হেঁটে যাওয়া,’ অংসাই ব্যাখ্যা করে।
তার কথা শুনে হো হো করে হেসে ওঠে ইমন। ইমনের মনে পড়ে যায় ১৫-১৬ বছর আগের কথা। বড় মামা ছিলেন ফরেস্ট অফিসার। বান্দরবানে তখন পোস্টিং ছিল তার। তখন ঢাকা গেলে বান্দরবানের গল্প করতেন বড় মামা। তখন তিনি বলেছিলেন, বান্দরবান থেকে থানছি যেতে হতো নৌকায় করে, সাঙ্গু নদী ধরে। সকালে বান্দরবান থেকে রওনা হয়ে বলিপাড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে অন্ধকার ঘনিয়ে আসত। সেখানেই রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে আবার যাত্রা করে পৌঁছাতে হতো থানছিতে। এভাবে যেতে গিয়ে নানা ধরনের বিপদের মুখে পড়তে হতো প্রায়ই। সে তুলনায় এখন অনেক কম সময়ে, কত আরামে থানছি যেতে পারছে—নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করে ইমন।
পথে যেতে যেতে শৈলপ্রপাত চোখে পড়ল। এখন বেশ শুকনো, বর্ষায় অবশ্য অনেক পানি থাকে—পাশে বসা অংসাই জানাল। গাড়ি এখন পাহাড় বেয়ে উপরের দিকে উঠছে। অনেকটা খাড়া পথ বেয়ে উপরে উঠতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। খুব বিপজ্জনক মুহূর্ত। এখন যদি ব্রেক ফেল করে, তাহলে গাড়ি ঢালু পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নামতে নামতে উল্টে ডিগবাজি খেয়ে পাশের গভীর খাদে গিয়ে পড়বে। যাত্রীদের খুঁজে পাওয়া যাবে না কোনোভাবেই। গাড়ির চিহ্ন থাকবে না তখন।
ওয়াই জংশনে এসে গাড়ি ডান দিকের পথ ধরল। এখানে দুভাগ হয়ে যাওয়া রাস্তাটিকে ইংরেজি ওয়াই অক্ষরের মতো লাগে দেখতে। ওয়াইয়ের একটা বাহু চলে গেছে রুমার দিকে। ওখানেই বগা লেক। অন্য বাহু গেছে চিম্বুক হয়ে একেবারে থানছি পর্যন্ত। তারপর আবার বাস চলতে শুরু করেছে। চিম্বুকের আশেপাশে মুরং উপজাতিদের বেশ কয়েকটা পাড়া আছে। রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে পাহাড়ের ঢালে মুরংদের ছোট ছোট ঘর চোখে পড়ল ইমনের। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল, রাস্তাটা এঁকেবেঁকে পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে উঠে গেছে অনেক দূর । সূর্যের আলো পড়ে পুরো প্রকৃতি ঝিকমিক করছে। এমন দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় ইমন। অংসাই মারমা ইমনের মুগ্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করছিল। সে বলে উঠল, ‘আমাদের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে চলেছে পাহাড়ি মেয়ে সাঙ্গু। বাসে বসে নদীটা দেখা না গেলেও বাস থেকে নামলেই তা দেখা যাবে।’
রাস্তার দুপাশের গাছগাছালি আর আদিবাসীদের বাড়িঘর দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে পড়ে ইমন। তার কাছে মনে হতে থাকে, এ যাত্রা শেষ না হলেও বুঝি তার কিছু আসবে-যাবে না। এখানকার প্রকৃতি নানা জাতের জংলি ফুলে বিচিত্র সাজে সেজেছে চমৎকারভাবে। গাছপালা আর ফুলের বুনো গন্ধে কেমন যেন ঘোর লেগে যায়। নিজেকে হারিয়ে ফেলে সে অন্য এক জগতে।