দোকান থেকে কেনা অনেক খাবারে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত সাধারণ প্রিজারভেটিভ বা সংরক্ষণকারী উপাদানগুলোর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ফ্রান্সের এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব প্রিজারভেটিভ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ এবং হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি ১৬ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।
ইউরোপীয় হার্ট জার্নালে গত বুধবার প্রকাশিত এই গবেষণায় ১৫ বছরের বেশি বয়সি ১ লাখ ১২ হাজারেরও বেশি মানুষের হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর ৫৮টি প্রিজারভেটিভের প্রভাব খতিয়ে দেখা হয়। ২০০৯ সাল থেকে ফ্রান্সে চলমান ‘নিউট্রিআইনেট- -সান্তে’ গবেষণার অংশ হিসেবে এটি পরিচালিত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের বিবর্ণতা রোধে ব্যবহৃত সাইট্রিক অ্যাসিড এবং অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের (যা ভিটামিন সি নামে পরিচিত) মতো তথাকথিত ‘প্রাকৃতিক’ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রিজারভেটিভও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ২২ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।
তবে গবেষণার প্রধান গবেষক এবং ফ্রান্সের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল রিচার্চের পরিচালক মাথিল্ড তুভিয়ের জানান, ফলমূল বা শাকসবজিতে প্রাকৃতিকভাবে থাকা উপাদান এবং খাবারে কৃত্রিমভাবে যুক্ত করা প্রিজারভেটিভের প্রভাব এক নয়। রাসায়নিকভাবে তৈরি এই উপাদানগুলো ফলমূলের মতো প্রাকৃতিক উপাদানের গুণাগুণ বহন করে না।
গবেষণার সহ-লেখক আনাইস হাসেনবোহলার জানান, আল্ট্রা-প্রসেসড বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের (ইউপিএফ) বাইরেও এসব প্রিজারভেটিভের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। মানুষের খাওয়া প্রিজারভেটিভযুক্ত খাবারের মাত্র ৩৫ শতাংশ আসে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে। তাই কোনো নির্দিষ্ট একটি খাদ্যদল বাদ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর বদলে তিনি ফ্রেশ, না রান্না করা ও অপ্রক্রিয়াজাত খাবার অথবা কম তাপমাত্রায় সংরক্ষিত হিমায়িত (ফ্রোজেন) খাবার বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে বাড়তি কোনো প্রিজারভেটিভ থাকে না।
গবেষকেরা বহুল ব্যবহৃত ১৭টি প্রিজারভেটিভের ওপর বিশদ বিশ্লেষণ চালিয়ে দেখেছেন, এর মধ্যে আটটি উপাদান পরবর্তী এক দশকে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এর মধ্যে তিনটি হলো নন-অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রিজারভেটিভ-পটাশিয়াম সরবেট, পটাশিয়াম মেটাবিসালফাইট এবং সোডিয়াম নাইট্রাইট।
পটাশিয়াম সরবেট সাধারণত ওয়াইন, বেকড খাবার, পনির ও সসে ব্যবহৃত হয়। পটাশিয়াম মেটাবিসালফাইট পাওয়া যায় ওয়াইন, জুস, সিডার ও বিয়ারে। আর সোডিয়াম নাইট্রাইট নামক রাসায়নিক লবণটি বেকন, হ্যাম ও ডেলির মতো প্রক্রিয়াজাত মাংসে ব্যবহৃত হয়।
বাকি পাঁচটি প্রিজারভেটিভ হলো-অ্যাসকরবিক অ্যাসিড, সোডিয়াম অ্যাসকরবেট, সোডিয়াম ইরিথরবেট, সাইট্রিক অ্যাসিড এবং রোজমেরির নির্যাস। এগুলো মূলত খাবারের পচন ও বিবর্ণতা রোধে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে অ্যাসকরবিক অ্যাসিড বা ভিটামিন সি সরাসরি হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
অবশ্য ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব রিডিং-এর খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গুন্টার কুহনলে জানান, খাদ্য ব্যবস্থায় প্রিজারভেটিভের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ করার পাশাপাশি খাবার নষ্ট হওয়া রোধ করে এবং স্থায়িত্ব বাড়ায়।
তুভিয়ের এবং তার দলের পূর্ববর্তী আরো দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, এসব প্রিজারভেটিভের সঙ্গে ক্যানসার এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসেরও সম্পর্ক রয়েছে। সোডিয়াম নাইট্রাইট, পটাশিয়াম নাইট্রেট, সরবেটস, পটাশিয়াম মেটাবিসালফাইট, অ্যাসিটেটস এবং অ্যাসিটিক অ্যাসিড-এই ছয়টি প্রিজারভেটিভ প্রোস্টেট, স্তনসহ সব ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে একটি বাদে বাকি সবকটি উপাদান টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ বাড়ায়।
আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা 'দ্য ককোরেন কোলাবোরেশন'-এর মেথডস সাপোর্ট ইউনিট ম্যানেজার রেচেল রিচার্ডসন বলেন, এই গবেষণাটি পর্যবেক্ষণমূলক হওয়ায় এটি সরাসরি কার্যকারণ প্রমাণ করতে পারে না। তবে বয়স, বিএমআই, ধূমপান এবং শারীরিক পরিশ্রমের মতো স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করার অন্য উপাদানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখে যেভাবে ডায়েট ও হৃদরোগের ঝুঁকির মূল্যায়ন করা হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। এই ফলাফলগুলো নিশ্চিত হতে আরো বিশদ অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র: সিএএন
এএম