সুষম খাদ্য যেসব খাদ্যে সব ধরনের খাদ্য উপাদান একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ও সঠিক অনুপাতে থাকে এবং মানবদেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে, তাকে সুষম খাদ্য বলে। মূলত সুষম খাদ্যে বলতে খাবারের মধ্যে শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি এই ছয়টি উপাদান উপস্থিত থাকে।
মানবদেহের জন্য সুষম খাদ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে মানবদেহের প্রয়োজনীয় সব উপাদান সঠিক মাত্রায় থাকে। সুষম খাদ্যগ্রহণের ফলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাই আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় সুষম খাদ্য রাখা প্রয়োজন, যা শরীরের পুষ্টিহীনতা দূর করতে সাহায্য করবে। ২০০৪ সালে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদদের একটি প্যানেল (কোপেনহেগেন কনসেনসাস) বিশ্বের সবচেয়ে জরুরি সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপের র্যাংকিং প্রকাশ করে দেখিয়েছিল, ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূরীকরণের জন্য কার্যকর বিনিয়োগ সবচেয়ে ফলপ্রসূ।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ শতাংশ জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে অপুষ্টির হার প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়; এটি একটি দ্বিমুখী সম্পর্ক—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুষ্টির উন্নতি ঘটায়, আবার ভালো পুষ্টি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। নানা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, পুষ্টিতে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে গড়ে ২৩ ডলারের অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যায় এবং স্কুল মিল কর্মসূচিতে প্রতি ১ ডলারের বিনিময়ে ৪-৯ ডলার পর্যন্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন আহরণ সম্ভব।
সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারার কারণে অসংক্রামক রোগ যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও ক্রনিক শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অসংক্রামক রোগের কারণে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রায় ৭৪ শতাংশ ঘটায় এবং ৮৬ শতাংশ প্রিম্যাচিউর মৃত্যু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে ঘটে—এতে পরিবার, সমাজ এবং জাতিকে বড় ধরনের আর্থিক ও উন্নয়নগত চাপের মুখে ফেলে।
প্যান-আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন (PAHO/WHO) এবং ম্যাককিনসি হেলথ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুধু অসংক্রামক রোগের কারণে ২০১১-৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে। এই ক্ষতির প্রধান কারণ হলো হারানো কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতার হ্রাস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) উল্লেখ করেছে, অসংক্রামক রোগের পাঁচটি প্রধান ঝুঁকি হলো তামাক সেবন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, মদ্যপান ও বায়ুদূষণ। এর মধ্যে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অতিরিক্ত লবণ, ফ্রি সুগার, অপরিকল্পিত ফ্যাট ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
অসংক্রামক রোগ শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, অর্থনৈতিকভাবে ও ক্ষতিকর; পরিবারগুলোর বাড়তি চিকিৎসা ব্যয় তাদের আর্থিক সংস্থান কমায়, দারিদ্র্য বাড়ায় এবং সমগ্র অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অসংক্রামক রোগপ্রতিরোধে বছরে মাত্র জনপ্রতি ৩ ডলারের বিনিয়োগ ২০৩০ সালে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লাভ নিশ্চিত করতে পারে।
সুষম খাদ্যাভ্যাস অপুষ্টি হ্রাস করে, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করে, প্রাপ্তবয়স্কদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং প্রবীণদের দীর্ঘমেয়াদি রোগপ্রতিরোধে সাহায্য করে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ অসংক্রামক রোগ কমাতে কার্যকর হাতিয়ার। বাংলাদেশ জাতীয় খাদ্য নির্দেশিকা ২০২০ প্রমাণ করে যে, জনগণের সুস্বাস্থ্যই দেশের প্রকৃত উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি।
এই নির্দেশিকা সুষম খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করতে ১০টি মূল নির্দেশনা দেয়। এর মধ্যে প্রথম হলো প্রতিদিন সুষম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যগ্রহণ। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক ২৭০-৪২০ গ্রাম চাল বা গম গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। শ্বেতসারসমৃদ্ধ মূল ও কন্দজাত খাদ্য যেমন আলু, মিষ্টি আলু, কচু, কলা ৭৫-১০০ গ্রাম গ্রহণ করা উত্তম। ভাত বা রুটির সঙ্গে ডাল, মাছ, মাংস বা ডিম গ্রহণ করলে প্রোটিন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত হয়।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিনজাতীয় খাবার গ্রহণ শরীরের গঠন, কর্মক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক। দৈনিক মাঝারি আকারের এক-চার টুকরো মাছ বা মাংস এবং এক-দুই কাপ ডাল গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি লবণ ছাড়া বাদাম ও বীজজাতীয় খাদ্য সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন গ্রহণ করা স্বাস্থ্যসম্মত। হাড় ও দাঁত গঠনের জন্য প্রতিদিন অন্তত ১ কাপ দুধ বা ১৫০ গ্রাম দই, ৩০ গ্রাম পনির গ্রহণ অপরিহার্য।
ল্যাকটোজ সহ্য করতে না পারলে বিকল্প হিসেবে দই বা সয়াদুধ গ্রহণ করা যেতে পারে। ফল ও সবজি গ্রহণ সুষম খাদ্যাভ্যাসের অপরিহার্য অংশ। প্রতিদিন অন্তত দুটি মৌসুমি ফল গ্রহণ করা উচিত, যার মধ্যে একটি লেবুজাতীয় (ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ) এবং অন্যটি ভিটামিন-এ-এর উৎস হতে পারে। প্রতিদিন অন্তত ১০০ গ্রাম শাক ও ২০০ গ্রাম বিভিন্ন ধরনের সবজি গ্রহণ সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে।
তেল ও চর্বি গ্রহণ সীমিত রাখার নির্দেশনা অনুযায়ী সরিষা, সয়াবিন বা রাইসব্রান তেল স্বাস্থ্যকর। দিনে ৩০ গ্রাম চর্বি ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। হাইড্রোজেনেটেড তেল (ঘি, মাখন) এবং ট্রান্সফ্যাটসমৃদ্ধ ফাস্টফুড এড়িয়ে চলা জরুরি।
জাতীয় খাদ্য নির্দেশিকায় লবণ ও আয়োডিন নিয়ন্ত্রণ, চিনি এবং মিষ্টিজাতীয় খাবার সীমিত রাখার নির্দেশনা রয়েছে। দৈনিক লবণ পাঁচ গ্রামের নিচে রাখা, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও নোনা মাছ এড়িয়ে চলা উচিত। ‘Free sugar’ অর্থাৎ যোগ করা চিনি ও মধু মোট ক্যালরির ১০ শতাংশের নিচে রাখা এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য ৫ শতাংশের কম থাকা বাঞ্ছনীয়। নিরাপদ পানি গ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ১ দশমিক ৫৩ দশমিক ৫ লিটার পানি পান করা সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের জন্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে খাবার সংগ্রহ করা, শাকসবজি ও ফল ভালোভাবে ধুয়ে ব্যবহার করা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখতে নিয়মিত শারীরিক শ্রম, সময়মতো খাবার গ্রহণ, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার, দিনে অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করা অত্যন্ত কার্যকর।
সুস্থতার জন্য BMI ১৮ দশমিক ৫ থেকে ২৫-এর মধ্যে রাখা, পুরুষদের কোমর পরিধি ৩২ ইঞ্চি বা তার কম এবং নারীদের কোমর পরিধি ৩৬ ইঞ্চি বা তার কম রাখা গুরুত্বপূর্ণ। খাবার গ্রহণের পর হালকা শারীরিক ব্যায়াম করা রক্তের শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে, হজমে উন্নতি এবং মেটাবলিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক। এই নিয়মগুলো মেনে চললে স্বাস্থ্যকর ও দীর্ঘায়ু জীবনধারার ভিত্তি গড়ে ওঠে।
গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর জন্য উচ্চমানের প্রোটিন এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট যেমন আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম গ্রহণ জরুরি। শিশুর প্রথম ছয় মাস শুধু মাতৃদুধ খাওয়ানো প্রয়োজন। পরে পর্যাপ্ত পরিপূরক খাদ্য শুরু এবং দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়ানোর সুপারিশ করা হয়। পরিপূরক খাবার প্রস্তুতের সময় প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচটি বা তার বেশি সুপারিশ করা খাদ্যশ্রেণি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যেমন শস্য ও শস্যজাত খাবার, ডাল, বাদাম এবং বিচি, দুধ ও দুধজাত খাবার, মাংসজাত খাবার (মাছ, গরু/খাসি, হাঁস-মুরগি ও কলিজা), ডিম, ভিটামিন ‘এ’-সমৃদ্ধ ফল ও সবজি এবং অন্যান্য ফল ও সবজি।
শিশুদের জন্য অতিরিক্ত লবণ ও মসলা ব্যবহার এড়ানো জরুরি এবং প্রথম বছরে কোমল ও মিষ্টিপানীয় থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, স্তন্যদায়ী মায়েরা ধূমপান, মদ্যপান, পামাজ ও ক্ষতিকর ওষুধ থেকে বিরত থাকলে শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য আরো উপকার। এই নির্দেশনাগুলো মেনে চললে শিশুর পুষ্টি, শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখক : পুষ্টিবিদ