হোম > ফিচার > স্বাস্থ্য

গর্ভাবস্থায় রোজা: স্বাস্থ্যসুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

পবিত্র রমজান মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাস। এই মাসে রোজা রাখা ফরজ ইবাদত হলেও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্নভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে নানা ধরনের শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে এবং এ সময় মায়ের পাশাপাশি গর্ভের শিশুর সুস্থতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে মায়ের শারীরিক অবস্থা, পুষ্টি এবং গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর। সব গর্ভবতী নারী একইভাবে রোজা রাখতে পারবেন—এমনটি নয়। কেউ হয়তো সুস্থ অবস্থায় রোজা রাখতে পারেন, আবার কারো জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই রোজা রাখার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কখন রোজা রাখা তুলনামূলক নিরাপদ

কিছু পরিস্থিতিতে গর্ভবতী মা চিকিৎসকের পরামর্শে রোজা রাখতে পারেন। যেমন—

* মা শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে।

* রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক থাকলে।

* গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন স্বাভাবিক থাকলে।

* নিয়মিত চেকআপে কোনো জটিলতা না থাকলে।

* অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা বমি না থাকলে।

তবে এসব ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের অনুমতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব ক্ষেত্রে রোজা না রাখাই ভালো

কিছু পরিস্থিতিতে গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যেমন—

* অতিরিক্ত বমি বা শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে।

* রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া) বেশি থাকলে।

* ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে।

* যমজ বা একাধিক সন্তান ধারণ করলে।

* গর্ভের শিশুর ওজন কম হলে।

* শিশুর নড়াচড়ায় অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে।

* অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতা থাকলে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজা থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।

রোজা রাখতে চাইলে যেসব নিয়ম মানা জরুরি

গর্ভবতী মা যদি চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে রোজা রাখতে চান, তাহলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন।

* পর্যাপ্ত পানি পান করুন—ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত ধীরে ধীরে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত।

* সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন—ইফতারে ফল, শাকসবজি, দুধ, খেজুর, ডিম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা ভালো।

* সাহরিতে পুষ্টিকর খাবার খান—ভাত বা রুটি, ডাল, ডিম, দুধ, দই ও সবজি দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।

* অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলুন—তেলযুক্ত খাবার হজমে সমস্যা ও অস্বস্তি বাড়াতে পারে।

* নিয়মিত ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন—আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ফলিক অ্যাসিড চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রহণ করা জরুরি।

* পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন—অতিরিক্ত কাজ বা শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা উচিত।

* অতিরিক্ত রোদ ও গরম এড়িয়ে চলুন—এতে পানিশূন্যতা ও ক্লান্তি বাড়তে পারে।

* হালকা হাঁটা বা চলাফেরা বজায় রাখুন—এতে শরীর সক্রিয় থাকে এবং রক্তসঞ্চালন ভালো থাকে।

* ঘুমের প্রতি গুরুত্ব দিন—রাতে পর্যাপ্ত ঘুম এবং দিনে প্রয়োজনে কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়া উপকারী।

* শিশুর নড়াচড়া লক্ষ করুন—নড়াচড়া কম মনে হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

* অসুস্থ বোধ করলে রোজা ভেঙে ফেলুন—মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা বমি ভাব হলে দেরি না করে পানি বা খাবার গ্রহণ করা উচিত।

* নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপে থাকুন—গর্ভাবস্থায় যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামে মানুষের সক্ষমতা ও সুস্থতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গর্ভবতী নারী যদি মনে করেন রোজা রাখলে নিজের বা গর্ভের সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে তিনি রোজা না রাখার অনুমতি পান। পরে সুস্থ অবস্থায় সেই রোজা কাজা করা যায়। পরিশেষে বলতে চাই, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা একটি সংবেদনশীল বিষয়। তাই সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিয়মিত চিকিৎসা পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের সুস্থতা নিশ্চিত হলেই গর্ভের শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। তাই গর্ভবতী মায়েদের উচিত নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান

জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

কানব্যথায় অবহেলা নয়

গলার সংক্রমণে হৃদরোগের ঝুঁকি

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার প্রতিকার

বেশি ফাইবার মানেই সুস্বাস্থ্য নয়, হতে পারে হিতে বিপরীত

বিএমইউতে ইউরোলজি দিবস পালিত

মস্তিষ্কের যে ‘নীরব ঘাতক’ কেড়ে নিতে পারে স্মৃতিশক্তি

সিরাম ক্রিয়েটিনিন বৃদ্ধি পেলে রোজা রাখা ঠিক হবে না

রমজান মাসে আলসারেটিভ কোলাইটিস

শিশুর জন্য শ্রবণসেবা

রোজায় ডায়াবেটিক রোগীর করণীয়