হোম > ফিচার > স্বাস্থ্য

‘নাইট ডিউটিতে থাকায় বাবার লাশ দেখতে যেতে পারিনি’

নার্সেস স্টোরি

এন আই মানিক

শামিমা নাছরিন, সিনিয়র স্টাফ নার্স; জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা

মানুষের সেবা করার প্রবল ইচ্ছা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বাসনা থেকেই পিরোজপুরের মেয়ে শামিমা নাছরিন নার্সিং পেশায় আসেন। বর্তমানে তিনি মহাখালীর জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত । এই পেশায় আসার পেছনে কারো অনুপ্রেরণা ছিল কি না জানতে চাইলে শামিমা বলেন, ‘আমার তো ইচ্ছা ছিলই, পাশাপাশি মেজো ভাইয়ের অনুপ্রেরণাতেই বাগেরহাট নার্সিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি হই। এরপর সেখান থেকে পাস করে বেরিয়ে নার্স হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হয়। দেখতে দেখতে এখন চাকরি জীবনের ৩২ বছর অতিবাহিত হলো।

দীর্ঘ চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা থাকা শামিমার নার্স হিসেবে যাত্রা শুরু হয় বাগেরহাট সদর হাসপাতালে কাজের মধ্য দিয়ে। প্রথম দিনের কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথম দিন আমাকে ওয়ার্ডে ডিউটি দেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখি, বেডের চেয়ে ফ্লোরে তিন গুণ রোগী। তখন অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করছিল মনে। কত অসুস্থ মানুষ কাতরাচ্ছে, আমি তাদের সেবা দিচ্ছিলাম। ওই সময় নবীন নার্স হিসেবে গর্ববোধ হচ্ছিল। বাবা-মা আমাকে নার্সিং পেশায় দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এটাই বারবার মনে হয়েছিল।’

নার্সিং একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা, এটি নতুন কিছু নয়। এ ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করেন জানতে চাইলে শামিমা নাছরিন বলেন, ‘যখন গুরুতর রোগী আসে, বিশেষ করে দুর্ঘটনার রোগীদের অনেক কাটাছেঁড়া থাকে, তখন খুব দ্রুত সেবা দিতে হয়। ইনজেকশন দিতে হয়, ব্যান্ডেজ করতে হয়, রক্ত দিতে হয়। ওই সময় টিমওয়ার্কের মাধ্যমে ঠান্ডা মাথায় আমি পরিস্থিতি মোকাবিলা করি। অনেক সময় রোগীর আত্মীয়স্বজন আমাদের ভুল বোঝেন, তখন খুব খারাপ লাগে। আমরা যখন বলি, এই ওষুধের সরবরাহ নেই, অন্যটি লিখে আনতে বলি, তখন কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে যান।’

এটি যেহেতু মানবিক পেশা, তাই রোগীর সেবা দিতে এসে নার্সদের নিজের পরিবারের চেয়ে দায়িত্বকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। আপনার কাজের অভিজ্ঞতায় এমন কোনো ঘটনা আছে কি, যা আপনাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে এই অভিজ্ঞ নার্স বলেন, ‘এমন অনেক ঘটনাই আছে, তবে দুটি ঘটনা মনে পড়লে আমার খুব কান্না আসে। প্রথমটি হলো, ২০১৬ সালে এক রাতে আমি নাইট ডিউটিতে ছিলাম। রাত ১১টায় বাড়ি থেকে ফোন আসে, জানতে পারি আমার বাবা মারা গেছেন। খবরটা পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ি, অন্যদিকে ওয়ার্ডে অনেক অসুস্থ রোগী ছিল। দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে সকাল পর্যন্ত ডিউটি করি।’

এছাড়া তখন পদ্মা সেতু ছিল না, বাড়িতে দ্রুত সময় যাওয়ার কোনো উপায়ও ছিল না। যখন লঞ্চে করে বাড়ি যাই, ততক্ষণে বাবার দাফন সম্পন্ন হয়ে গেছে। আমার জীবনের বড় আক্ষেপ, নাইট ডিউটিতে থাকায় বাবার লাশ দেখতে যেতে পারিনি।’ বাবার মৃত্যুর ঘটনা বলতে গিয়ে মুহূর্তেই কেঁদে ফেলেন শামিমা।

নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময়কার একটি ঘটনা মনে পড়লেও আমি চোখের জল আটকাতে পারি না। তখন বেলাল নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আসেন। ‘সিস্টার, আমি বাঁচতে চাই, আমাকে একটু পানি দিন’—এ কথাটি বলে তিনি বারবার চিৎকার করছিলেন। আমার তখন কলিজা নড়ে ওঠে তার চিৎকারে, চোখে কান্না চলে আসে। ডাক্তারের নিষেধ থাকায় তাকে একটু পানিও খাওয়াতে পারিনি। তবু তুলা ভিজিয়ে তার ঠোঁটে একটু পানি দেওয়ার চেষ্টা করি, ততক্ষণে বেলাল না ফেরার দেশে চলে যান। এ ঘটনাটি মনে পড়লে আমি খুব কষ্ট পাই।’

একদিকে দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে ফ্যামিলি সামলানো, এভাবেই কাটে নার্সদের জীবন। পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাটা কতটা কঠিন? আপনি কীভাবে সামলান—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি আসলেই কষ্টকর আমাদের জন্য। তবে আমার স্বামীর সহযোগিতায় ফ্যামিলি সামলানো সহজ হয়ে যায়। সে যথেষ্ট হেল্পফুল এবং দায়িত্ববান, সে জন্য তাকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই। আমার দুটি ছেলে, বড় ছেলে মানিকগঞ্জ মেডিকেলে চান্স পেয়েছে, ছোট ছেলে নাইনে পড়ে। আসলে স্বামীর প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর রহমতে ভালো আছি।’

আমাদের দেশে নার্সদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়? যদি না হয়, তাহলে কী পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে নার্সদের সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। করোনা মহামারীর মতো যেকোনো ডিজিজ এলে ঢাল হয়ে দাঁড়ান নার্সরা। সন্তান তার বাবাকে পরিচয় দেয়নি, স্ত্রী স্বামীকে হসপিটালে ফেলে চলে গেছে, কিন্তু আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের পাশে ছিলাম। তখন বাড়িওয়ালারা আমাদের বাসাভাড়া দিতে চাইতেন না। অথচ আমাদের ঝুঁকিভাতা দেওয়া হয় না। আমাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। যারা এখন দেশ পরিচালনা করছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ নার্সদের যেন যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় এবং নার্সিং পেশার উন্নয়নে যেন কাজ করা হয়।’

হাম ও পোস্ট-মিজেল নিউমোনিয়া

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ

আনারস-দুধ একসঙ্গে খেলে কী হয়?

বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুকন্যা হাবিবার নাম এখন ‘জুবাইদা’

থাইরয়েড রোগ বাড়ছে, চিকিৎসার আওতায় নেই ৬০ শতাংশ

হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তায় ‘জরুরি অ্যালার্ম’: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব এখনো নিরাপদ নয়

প্রাপ্তবয়স্কদের ওজন বাড়লে ক্যানসারের ঝুঁকি পাঁচ গুণ

হামে প্রাপ্তবয়স্করাও কেন আক্রান্ত হচ্ছেন

চিকিৎসকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না