আমরা যারা গাড়ির মাধ্যমে চলাফেরা করি, তাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ গাড়ির ড্রাইভিং করতে পারি না। ড্রাইভিংয়ের জন্য আলাদা লোক রাখা হয়। নিয়মিত অফিস-আদালতে এবং নানা কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে গাড়ি চালানো শেখা হয়ে ওঠে না। আর যারা ড্রাইভার আছেন, তাদের নানা সময় নানা কথা শুনতে হয় যাত্রীদের মুখ থেকে। কিন্তু যদি এমন হতো ড্রাইভারবিহীন গাড়ি, তাহলে কেমন হতো? কী অবাক হচ্ছেন? অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে, ভাবছেন এগুলো সব মিথ্যা রটনা; কিন্তু আমরা কি আদৌ জানি এগুলো সব সত্যি এবং বাস্তব?
সম্প্রতি এমন কিছু গাড়ির আনাগোনা দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে ও জাপানে। এটি মূলত AI-এর মাধ্যমে কন্ট্রোল করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, পৃথিবীতে এই গাড়িগুলো যানবাহনের ক্ষেত্রে বিরাট বিপ্লব ঘটাতে পারে। এই গাড়িগুলোয় নানা ধরনের সেন্সর, ক্যামেরা এবং রাডার সিস্টেম লাগানো থাকে, যা রাস্তার চারপাশে খুব নিপুণতার সঙ্গে ভিডিওর মাধ্যমে নিরাপদে চলতে পারে। যারা গাড়ি চালাতে অক্ষম, তাদের জন্য এটি হতে পারে স্বপ্নের মতো। শুধু আরোহণ করবে এবং নিরাপদে আপন গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, কোনো ধরনের কষ্ট বা প্যারার সম্মুখীন হতে হবে না।
চালকবিহীন গাড়ি সঠিকভাবে চালানোর জন্য তাতে জিপিএস এবং অত্যাধুনিক ম্যাপিং চালু করা হয়, যার মাধ্যমে সঠিক তথ্য এবং ঝামেলাবিহীন চলাফেরা করা যায়। বিশ্বের সর্বপ্রথম স্বচালিত (বাষ্পচালিত) যানবাহনের নির্মাণকারী ছিলেন নিকোলাস-জোসেফ কুগনট (১৭৬৯)। এটি ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক লাইট শনাক্ত করে, রাস্তার চিহ্ন, নানা যানবাহন ও পথচারীদের শনাক্ত করে। Lidar (লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) সেন্সর আলো প্রক্ষেপণ করে দূরত্ব মাপে, রাস্তার প্রান্ত ও লেন চিহ্ন শনাক্ত করে। চাকার কাছে থাকা আলট্রাসনিক সেন্সর পার্কিংয়ের সময় কার্ব ও অন্যান্য যান শনাক্ত করে। এরপর উন্নত সফটওয়্যার এই তথ্যবিশ্লেষণ করে পথ নির্ধারণ করে এবং অ্যাকচুয়েটরের মাধ্যমে গাড়ির গতি বৃদ্ধি, ব্রেক ও স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করে। ট্রাফিক আইন মেনে চলা ও বাধা এড়িয়ে চলার জন্য অবস্ট্যাকল এভয়ডেন্স অ্যালগরিদম, অবজেক্ট রিকগনিশন ও প্রেডিক্টিভ মডেলিং ব্যবহৃত হয়। ২০১১-১২ দশকের দিকে এই গাড়ির ব্যবহার শুরু হয় কিছুসংখ্যক রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু শহরে। চালকবিহীন গাড়ির সুবিধা হলো যারা যাত্রী, তাদের ড্রাইভিংয়ের কোনো প্যারা থাকে না, যাত্রীরা চাইলে অনায়াসে এর ভেতর নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন, ঘুমের জন্য আলাদা সময় খরচ হবে না। অনেকেই দূরে যাতায়াতের ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়, তারা চাইলেই সুন্দর একটি বিশ্রাম নিতে পারবেন। যারা বইপ্রেমী, বই পড়তে যাদের ভালো লাগে, তারা খুব মনোযোগ সহকারে বই পড়তে পারবেন, এখানে কারো কোনো হস্তক্ষেপের প্রশ্ন আসে না। এটা এক ধরনের নিজের রাজ্যে নিজেই রাজা। ছাত্রছাত্রীরা কলেজ বা ভার্সিটির পড়াগুলো পড়তে পড়তে গন্তব্য বুঝতে পারবে। এই গাড়ি দূর থেকেই বিপদের সংকেত পেয়ে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়, যেটি সাধারণ যানবাহনে ড্রাইভারদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কোনো শত্রুপক্ষ যদি বোমা ফিট করে রাখে, সেটাকেও শনাক্ত করতে পারে এটি। অনেক সময় আমরা দেখতে পাই নানা রাস্তা মেরামতের কাজ চলে, ড্রাইভাররা তা না জানার কারণে সেখানে ঢুকে পড়েন; কিন্তু পরে আবার ব্যাক করতে হয়। এটা না জানার কারণে গাড়ির বাড়তি তেল খরচ হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রাস্তায় যানজট থাকে কিন্তু ড্রাইভার সেটি আগে থেকে অনুধাবন করতে পারেন না, যার ফলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, কিন্তু স্বচালিত গাড়ি তার শক্তিশালী ক্যামেরার মাধ্যমে দূর থেকে সেটা দেখে বিকল্প হিসেবে অন্য পথ বেছে নেয়। এতে যেমন যানজট থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, তেমনি যাত্রীরাও ভোগান্তিহীন চলাফেরা করতে পারেন।
অনেকেই আছেন প্রতিবন্ধী, তারাও এটিটিতে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবেন। এই গাড়িগুলোর বেশ কিছু ক্ষতিকর দিক আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো হ্যাক করা। যেকোনো মুহূর্তে এই গাড়ি হ্যাকাররা হ্যাক করে নিতে পারে, যার কারণে অনেক বড় দুর্ঘটনার শিকার হওয়া লাগতে পারে। আবার যদি কোনো সফটওয়্যার গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, সে ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটা বেড়ে যায়। সাধারণ গাড়ির চালকের হাতে অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকে; তিনি চাইলে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে যাত্রীকে বাঁচাতে পারেন, আবার তার উল্টোটাও হতে পারে। কিন্তু স্বচালিত গাড়ির কোনো সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। এগুলোকে কীভাবে আরো শক্তিশালী এবং নিরাপদ করা যায়, তা নিয়ে জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোয় চলছে নানা বিশ্লেষণ। সময়ের পালাবদলে ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে হয়তো এই গাড়িগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নিরাপদ হয়ে উঠবে এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।