বিভিন্ন দুর্ঘটনার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে দেশে ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে সড়ক দুর্ঘটনা। অনেক পরিবারে ঈদের আনন্দ হয়েছে বিষাদময়। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় কিংবা আহত হয়। আর এ দুর্ঘটনার বড় একটি অংশই ঘটে মানুষের ভুলের কারণে।
অসতর্কতা, ক্লান্তি, অতিরিক্ত গতি, কিংবা সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারায়। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের এই যুগে তাই প্রশ্ন উঠেছে ‘মানুষের এই সীমাবদ্ধতা কি প্রযুক্তি দিয়ে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব?’ এরই উত্তর খুঁজতে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-চালিত চালকবিহীন গাড়ি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে এআইনির্ভর গাড়ি ব্যবহার ও পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি কিংবা চীনের মতো দেশে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে বিনিয়োগ করছে। তাদের লক্ষ্যÑসড়ককে আরো নিরাপদ করা।
মানুষের ভুল বনাম যন্ত্রের নির্ভুলতা
পরিসংখ্যান বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানবিক ত্রুটি। চালকের অসাবধানতা, মোবাইল ব্যবহার, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, কিংবা আবেগের বশে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া। এসবই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। মানুষ ক্লান্ত হয়, বিরক্ত হয়, কখনো মনোযোগ হারায়। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। অন্যদিকে, এআইচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে এ সমস্যাগুলো নেই। একটি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি কখনো ক্লান্ত হয় না, মনোযোগ হারায় না, কিংবা আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেয় না। এটি সম্পূর্ণভাবে তথ্য, গণনা এবং অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করে চলে। ফলে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগে থেকেই বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। এ কারণেই ধারণা করা হচ্ছে, চালকবিহীন গাড়ি চালু হলে সড়ক দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
চালকবিহীন গাড়ি কীভাবে কাজ করে
চালকবিহীন বা এআইচালিত গাড়ি মূলত বিভিন্ন সেন্সর, ক্যামেরা, রাডার এবং লিডার (LiDAR) প্রযুক্তির সমন্বয়ে কাজ করে। এই যন্ত্রগুলো গাড়ির চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। রাস্তার অবস্থা, অন্যান্য গাড়ির অবস্থান, পথচারীর গতিবিধি, ট্রাফিক সিগন্যালÑসবকিছুই তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এই তথ্যগুলো একটি কম্পিউটার সিস্টেমে পাঠানো হয়, যেখানে মেশিন লার্নিং ও ডেটা অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, সামনে কোনো বাধা থাকলে গাড়ি তা শনাক্ত করে গতি কমায় বা দিক পরিবর্তন করে। আবার লেন পরিবর্তন, ব্রেক করা, কিংবা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সর্বোত্তম পথ নির্ধারণÑসবই এআই নিজেই পরিচালনা করে।
উন্নত বিশ্বে বাস্তব প্রয়োগ
গুগল, টেসলা, উবারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তাদের চালকবিহীন গাড়ি পরীক্ষামূলকভাবে রাস্তায় নামিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো সফলভাবে চলাচল করছে এবং মানুষের আস্থা অর্জন করছে। বিশেষ করে, নির্দিষ্ট শহর বা নির্দিষ্ট রুটে এই গাড়িগুলোর ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে এসব পরীক্ষা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হয়েছে। যেখানে রাস্তা উন্নত, ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলে এবং অবকাঠামো প্রযুক্তিবান্ধব। ফলে বাস্তব জীবনের সব ধরনের জটিলতা এখনো পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের মতো দেশে চালকবিহীন গাড়ির বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। তবে আমাদের দেশে অ্যাডভান্সড ড্রাইভার অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেম বা ADAS কার্যকর হতে পারে। যেখানে সম্ভাব্য কোনো বিপদ শনাক্ত হলে সিস্টেমটি চালককে সতর্ক করে অথবা প্রয়োজন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেক বা স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে বিশৃঙ্খল। অপরিকল্পিত যান চলাচল, ট্রাফিক আইন না মানা, হঠাৎ রাস্তা পারাপার এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের সহাবস্থান। এসবই একটি জটিল পরিবেশ তৈরি করে। এছাড়া প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, স্মার্ট রাস্তা, নির্ভরযোগ্য ডেটা সিস্টেমÑএসবেরও ঘাটতি রয়েছে। চালকবিহীন গাড়ি কার্যকর করতে হলে শুধু গাড়ি নয়, পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকেই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। তবে সম্ভাবনাও কম নয়। ধীরে ধীরে যদি স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম, ডিজিটাল সিগন্যালিং এবং সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশেও সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।