কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এখন আর শুধু বিজ্ঞানের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি ঢুকে পড়েছে কোটি কোটি মানুষের কর্মজীবনে। লেখালেখি থেকে কোডিং, গ্রাফিক ডিজাইন থেকে ডেটা বিশ্লেষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআইয়ের প্রভাব এখন অপ্রতিরোধ্য। বাংলাদেশেও এই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। দেশের প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ফ্রিল্যান্সারের সামনে এই মুহূর্তে যেমন রয়েছে অভূতপূর্ব সুযোগ, তেমনি রয়েছে কিছু কঠিন বাস্তবতাও।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ২০২৫ সালের 'ফিউচার অব জবস রিপোর্ট' অনুযায়ী, এআই ও তথ্য-প্রযুক্তি ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৮৬ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে রূপান্তর করবে। এই পরিবর্তনের ফলে ৯ কোটি ২০ লাখ কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হলেও নতুন ১৭ কোটি কর্মসংস্থান তৈরি হবে অর্থাৎ, বৈশ্বিক কর্মসংস্থানে নেট লাভ হবে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ। রিপোর্টটি ২২টি শিল্প খাত ও ৫৫টি অর্থনীতির ১ হাজারেরও বেশি কোম্পানির জরিপের ভিত্তিতে তৈরি।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা অনুযায়ী, জেনারেটিভ এআই বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটি পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সমতুল্য কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে পারে এবং বিশ্বের জিডিপি ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হতে পারে। ম্যাককিনজি গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই ও অটোমেশন ৭ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ কর্মীকে প্রভাবিত করতে পারে, যা বৈশ্বিক কর্মশক্তির প্রায় ১৪ শতাংশ।
WEF আরও জানিয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যমান ৩৯ শতাংশ কর্মদক্ষতা অচল হয়ে পড়বে। তবে এই হার ২০২৩ সালের ৪৪ শতাংশ এবং ২০২০ সালের ৫৭ শতাংশের তুলনায় কমছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে কর্মীরা আগের চেয়ে দ্রুত নিজেদের দক্ষতা আপডেট করছেন। ৮৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফ্রিল্যান্সিং শক্তি। আইসিটি বিভাগের হিসাবে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। ২০২৩ সালে ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১৮৫ কোটি ডলার, যা ২০২৫ সালে ২৬০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রক্ষেপণ রয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনটাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (BACCO)-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই আউটসোর্সিং আয় ৯০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে, যা পুরো ২০২৪ সালের মোট আয় (৮৫ কোটি ডলার) ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৬ সালের শুরুতে দেশে ১০ লাখেরও বেশি সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এআই টুলের ব্যাপক ব্যবহার এই বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। চ্যাটজিপিটি, গিটহাব কোপাইলট, মিডজার্নি, ক্লডের মতো টুলগুলো ব্যবহার করে কর্মীরা আগের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন। অনলাইন মার্কেটপ্লেসে এআই-সংক্রান্ত দক্ষতার চাহিদা গত এক বছরে প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়েছে।
কনটেন্ট লেখার কাজে এআইয়ের প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত অনুভূত হচ্ছে। বৈশ্বিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জেনারেটিভ এআই আসার পর ফ্রিল্যান্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে লেখালেখি ও কোডিং জাতীয় কাজের পোস্ট ২১ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যেও একই অভিযোগ উঠে আসছে। তবে যারা এআই টুল ব্যবহার করে দ্রুত ও মানসম্পন্ন কনটেন্ট তৈরি করতে পারছেন, তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মিডজার্নি, DALL-E, Adobe Firefly-এর মতো টুলের আগমনে ইমেজ তৈরির কাজে ফ্রিল্যান্স পোস্ট ১৭ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশের একজন ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার মুজাহিদুল ইসলাম বলেছেন, 'ক্রিয়েটিভ ফিল্ডে এআইয়ের হুমকি নতুন নয়। তবে যারা এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করছেন, তারা এখন একই সময়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারছেন এবং ক্লায়েন্টকে অনেক দ্রুত ডেলিভারি দিতে পারছেন।'
গিটহাব কোপাইলট, ক্লড কোডের মতো কোডিং সহকারীর কারণে সফটওয়্যার ডেভেলপারদের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২২-২৫ বছর বয়সি সফটওয়্যার ডেভেলপারদের কর্মসংস্থান ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে মূলত এন্ট্রি-লেভেল কোডিং কাজগুলো এআই দিয়ে করা সম্ভব হওয়ায়। বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পে এই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, কারণ প্রতি বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে হাজার হাজার কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট বের হলেও এন্ট্রি-লেভেল পদের সংখ্যা কমছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে ডেটা এন্ট্রি, সিম্পল ট্রান্সলেশন এবং বেসিক ডিজাইনের কাজ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অনেক নিম্ন-দক্ষতার ফ্রিল্যান্সারের আয় ৫০-৬০ শতাংশ কমে গেছে বলে একটি গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে, কারণ ক্লায়েন্টরা হয় এআই ব্যবহার শুরু করেছেন, নয়তো ধরে নিচ্ছেন যে এআই দিয়ে এই কাজ সহজে করা যাবে, তাই দাম কমাচ্ছেন।
পরিবর্তনটি কেবল ক্ষতির নয়, এআই নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা যেসব উদীয়মান ক্ষেত্রে সুযোগ দেখছেন:
"এআই আমার কাজ নিয়ে নেবে না, বরং যারা এআই ব্যবহার করতে পারে তারাই যারা পারে না তাদের কাজ নিয়ে নেবে।"
— প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
বাংলাদেশ সরকার ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রণয়ন এবং ন্যাশনাল এআই পলিসি ২০২৪ গ্রহণ করেছে। আইসিটি বিভাগ এআই শিক্ষায় বিশেষ বরাদ্দ রেখেছে। লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (LEDP) আওতায় ইতিমধ্যে ১ লাখেরও বেশি ফ্রিল্যান্সারকে ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
মাইক্রোসফট, গুগল ও হুয়াওয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এআই ও ক্লাউড সার্টিফিকেশন দেওয়া হচ্ছে। দেশে বর্তমানে ২ হাজার ৫০০-রও বেশি আইটি স্টার্টআপ রয়েছে, যেগুলোতে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার তরুণ এআই-ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা উৎসাহের পাশাপাশি কিছু কঠিন বাস্তবতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো পেপ্যালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেমের অনুপস্থিতি, যা ফ্রিল্যান্সারদের আয় গ্রহণ করতে বাধার সৃষ্টি করে। এছাড়া এআই সাক্ষরতার ব্যবধান, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগের অভাব এবং ডেটা সুরক্ষা বিলের অস্পষ্টতা এই খাতের অগ্রগতিকে ধীর করছে।
একটি বৈশ্বিক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান আগামী বছরের মধ্যে কর্মীসংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করছে। সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট হবে সার্ভিস অপারেশন, সাপ্লাই চেইন ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। WEF-এর তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে আজকের ৭০ শতাংশ কর্মদক্ষতা পরিবর্তন হয়ে যাবে। বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি মূলত যে বয়সের কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল (২২-২৫ বছর বয়সি), সেই সেগমেন্টেই কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি চাপে আছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা বলছেন, এআই থেকে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই; বরং যত দ্রুত সম্ভব এই টুলগুলো আয়ত্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ:
এআই একটি বিপ্লব, এটি ঠেকানো যাবে না। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার ও আইটি পেশাদারদের সামনে এখন একটাই পথ: পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো এবং নিজেদের দ্রুত প্রস্তুত করা। সংখ্যাগুলো স্পষ্ট বৈশ্বিকভাবে ৭ কোটি ৮০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, আউটসোর্সিং আয় বাড়ছে, এআই দক্ষতার চাহিদা ৪০০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু যারা পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবেন না, তাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হবে। তাই এখনই সময় এআইকে প্রতিপক্ষ নয়, সহকর্মী হিসেবে গ্রহণ করার।