আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের আকাশে যে অস্ত্রটি ভয়ংকর উপস্থিতি নিয়ে ঘোরে, সেটি হলো ক্ষেপণাস্ত্র। বাইরে থেকে দেখলে এটি যেন আগুনের লেলিহান শিখা নিয়ে ছুটে চলা একটি ধাতব বস্তু, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তা। বলা যায়, একটি ক্ষুদ্রাকৃতির উড়ন্ত কম্পিউটার। এখানে শক্তি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সূক্ষ্ম সমন্বয়ে গড়ে ওঠে, এমন এক প্রযুক্তি, যা কয়েকশ কিংবা হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুকে নির্ভুলভাবে খুঁজে নিতে পারে।
প্রথমেই আসে উৎক্ষেপণের মুহূর্ত, ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে থাকা রকেট ইঞ্জিন যখন জ্বলে ওঠে, তখন জ্বালানি পুড়ে উচ্চচাপের গ্যাস সৃষ্টি করে এবং সেটি বিপরীত দিকে ছুটে বেরিয়ে যায়। এই প্রতিক্রিয়াশক্তিই ক্ষেপণাস্ত্রকে সামনে ঠেলে দেয়। সলিড জ্বালানি ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত প্রস্তুত এবং নির্ভরযোগ্য আর লিকুইড জ্বালানি ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র আরো নিয়ন্ত্রিত শক্তি সরবরাহ করতে পারে।
উৎক্ষেপণের পর শুরু হয় তার যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, পথ খুঁজে নেওয়া। আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র কখনোই অন্ধভাবে এগোয় না। এর ভেতরে থাকা নেভিগেশন ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত হিসাব কষে। জাইরোস্কোপ ও অ্যাক্সিলেরোমিটার ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান এবং গতিপথ নির্ধারণ করে আর অনেক ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রযুক্তি সেটিকে আরো নির্ভুল করে তোলে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই নিজের অবস্থান যাচাই করে নেয়, যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়। আর যখন লক্ষ্যবস্তু কাছে আসে, তখন রাডার, ইনফ্রারেড বা লেজারভিত্তিক সেন্সর সেটিকে শনাক্ত করে এবং একপ্রকার ‘লক’ করে ফেলে। যেন শিকারকে চোখে হারিয়ে না ফেলে কোনো শিকারি পাখি।
এরপর আসে নিয়ন্ত্রণ—
যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র নিজেকে ক্রমাগত ঠিকঠাক করে। এর শরীরের ছোট ছোট পাখনা বা ফিনগুলো বাতাস কেটে দিকপরিবর্তন করে। ভেতরের কম্পিউটার নিরবচ্ছিন্নভাবে হিসাব করে কখন বাঁক নিতে হবে, কতটা উচ্চতা ধরে রাখতে হবে। এ সময় তাকে শুধু নিজের গতিই নয়, বাতাসের প্রবাহ, মাধ্যাকর্ষণ, এমনকি পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রভাবও বিবেচনা করতে হয়।
অবশেষে আসে শেষ মুহূর্ত
লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে মুখোমুখি হওয়া। ক্ষেপণাস্ত্র যখন নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌঁছে যায়, তখন এর ফিউজ সিস্টেম সক্রিয় হয়। কিছু ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাতে বিস্ফোরিত হয়, আবার কিছু নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে বিস্ফোরণ ঘটায়, যাতে বিস্ফোরণের পরিধি আরো বড় হয়। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এই আঘাত এতটাই নির্ভুল হতে পারে যে কয়েক মিটারের ভেতরে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা সম্ভব।
তবে সব ক্ষেপণাস্ত্রের গল্প এক নয়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশের সীমানা ছুঁয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। অন্যদিকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিচু দিয়ে উড়ে, রাডারকে ফাঁকি দিয়ে ধীরে ধীরে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগোয়। আবার ট্যাংক ধ্বংসের জন্য তৈরি অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র বা আকাশযানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত অ্যান্টি-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র— প্রতিটিরই নিজস্ব কৌশল ও প্রযুক্তি রয়েছে।