শহীদ ওসমান হাদির আত্মজীবনী
‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ শিরোনামে শহীদ ওসমান হাদি তার ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন আত্মজীবনী সিরিজ। দুটি পর্ব আপলোড করা হয়েছিল। ভিডিও থেকে পর্ব দুটির অনুলিখন করেছেন মাহদি হাসান। আজ ছাপা হলো পঞ্চম পর্ব
সংগ্রামী জীবনের শুরু
নেসারাবাদের জার্নি শেষে এখন যে গল্পটা বলা দরকার—তখন ২০০৭-০৮ সাল, দেশে ওয়ান-ইলেভেন বা জরুরি অবস্থা চলছে। সব ধরনের মিছিল-মিটিং দেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হঠাৎ করে নিয়ম করল, মাদরাসার শিক্ষার্থীরা পাঁচটি ডিপার্টমেন্টে (সম্ভবত ল, ইংলিশ, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, জার্নালিজম এবং আইআর) ভর্তি হতে পারবে না। আমি তখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।
এখানে একটু বলে রাখা দরকার, আব্বার ইচ্ছা ছিল আমাকে মিসরের আল-আজহার ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর। যেহেতু আমার পরিবার একটি আলেম পরিবার এবং বড় ভাই বাংলাদেশের একজন নামকরা আলেম, তাই একটা সময় আমারও তেমন ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ঢাকায় কোচিং করতে আসার পর আমার চিন্তা বদলে যায়; আমি সিদ্ধান্ত নিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ব।
এমনিতে আমাদের মাদরাসা ছিল ভীষণ কড়া; যেকোনো ছোটখাটো অনিয়মেই ছাত্রদের নাম কেটে দেওয়া হতো। তবে আমার একটা সুযোগ ছিল, কারণ আমাকে সবাই খুব ভালোবাসত। ওখানকার নামকরা একজন শিক্ষক আমার বড় ভাই (যিনি এখন অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল) এবং আমার আব্বাকে মাদরাসার সবাই তার স্বতন্ত্র চিন্তাধারার জন্য খুব শ্রদ্ধা করতেন। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডিসি অফিসে স্মারকলিপি দেব।
কিন্তু তখন দেশে ইমারজেন্সি চলছে, মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ; আর মাদরাসা থেকে ঝালকাঠি শহরের ডিসি অফিস প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার দূরে। প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়া এমন কিছু করলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ভীষণ বিপদে পড়বে। তাই আমি কোনো শিক্ষককে কিছু না জানিয়ে আমার বন্ধুদের নিয়ে এক রাতের সিদ্ধান্তে ঝালকাঠি শহরে গেলাম। মনে আছে, ‘বাদল আর্ট’-এর কথা; তখন তো ডিজিটাল প্রিন্টিং ছিল না। রাত ১১টায় তার বাসায় গিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে আমি একটা বিরাট ব্যানার লেখালাম।
অন্য বন্ধুদের নিয়ে হোস্টেলের আশপাশ থেকে বাঁশ কেটে প্ল্যাকার্ড বানালাম এবং রাতভর গোপনে ব্যানার-ফেস্টুন তৈরি করলাম। সবাইকে সংগঠিত করলাম যে—বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক জলসা অনুষ্ঠানের পর ক্লাস ছুটি হলে আমরা মসজিদের সামনে থেকে মিছিল শুরু করে দেব। একবার মিছিল বের করে ফেললে তো আর আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না! এরপর যা হওয়ার হবে, সব দায়িত্ব আমার।
আগে জানলে তো শিক্ষকরা আমাদের আটকে দিতেন, তাই আমি গোপনে অন্য ক্লাসের ছাত্রদেরও এই পরিকল্পনায় কানেক্ট করলাম। আমি জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানের সুবাদে ঢাকার অনেক বড় ভাইদের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম; তাই ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় দিগন্ত টেলিভিশনের এক সাংবাদিক ভাইকে ফোন করে কাভারেজের জন্য অনুরোধ জানালাম। তারাও ইমারজেন্সির মধ্যে এমন প্রোগ্রামের কথা শুনে বেশ আগ্রহী হলেন।
পরদিন হঠাৎ আমাদের মাদরাসায় দিগন্ত টিভি আর অনেক সাংবাদিক চলে এলেন। শিক্ষকদের তো অবাক হওয়ার দশা—ক্যাম্পাসে ক্যামেরা কেন! কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়েই আমি প্রায় এক হাজার স্টুডেন্ট জড়ো করে ফেললাম। সামনে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে আমরা শহর অভিমুখে রওনা হলাম। আমরা সফলভাবে মিছিল শেষ করে ডিসি অফিসে স্মারকলিপি দিলাম। সবাই যখন প্রতিষ্ঠানে ফিরে গেল, আমি তখন আর সরাসরি বাসায় ফিরলাম না।
কারণ ওইটার প্রেস রিলিজ নিজ হাতে লিখে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ঝালকাঠি শহরের সাংবাদিকদের খুঁজে বেড়িয়েছি। যাদের প্রেস ক্লাবে পাইনি, তাদের বাসায় গিয়ে ফটোকপি পৌঁছে দিয়ে এলাম। এরপর নলসিটিতে নিজের বাসায় চলে এলাম। আমি খুবই টায়ার্ড ছিলাম, তাই ‘যা আছে কপালে’ ভেবে ঘুমিয়ে গেলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম, এবার আমার নাম মাদরাসা থেকে কাটা যাবেই।
আমি যখন ঘুমাচ্ছিলাম, তখন আমার বড় ভাই (যিনি ওই মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন) আব্বাকে ফোন করে বললেন, ‘আব্বা, এবার মনে হয় ওর নাম কাটা যাবে, এবার আর ওকে আটকানো যাবে না।’ পরে আমার বোনের কাছে শুনেছি, আব্বা বড় ভাইকে উত্তর দিয়েছিলেন—‘ও তো একটু আমার মতোই হয়েছে, কী আর করবা বলো!’ অন্য পরিবার হলে যেখানে স্বাভাবিকভাবেই বকাঝকা করত, আমার পরিবার সেখানে ছিল একদমই আলাদা।
পরদিন সকালে আমি যখন ঘুমে, আব্বা তখন লঞ্চঘাটে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বরিশাল থেকে আসা সংবাদপত্রের অপেক্ষায়। আব্বা প্রত্যেকটা পত্রিকা খুলে দেখলেন, আমাদের প্রোগ্রামের নিউজ হয়েছে কি না। তিন-চারটা পত্রিকায় আমাদের সেই আন্দোলনের খবর আর ছবি ছাপা হয়েছিল। আব্বা সেই পত্রিকাগুলো কিনে বাসায় এনে আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেন, ‘এই যে দেখো, তোমাদের কালকের প্রোগ্রাম এই এই পত্রিকায় আসছে।’ আমার এই কথাগুলো আজ খুব মনে পড়ে। যাই হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আমরা ঝালকাঠিতে বসে আন্দোলন করলাম এবং সেটা জাতীয় পত্রিকায় এলো—এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের ছিল। এরপর ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে আমি ঢাকায় ফিরলাম।