হোম > ফিচার > আমার জীবন

নীল দিগন্তে নোনা পানি আর প্রবালের মিতালি

ইমাম ইমু

মাথার ওপরে সুউচ্চ আকাশ। চারদিকে বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি। নির্জন জনমানবহীন দ্বীপ পাখিদের কলকাকলিতে মুখর। সাগরের স্বচ্ছ পানিতে প্রবাল পাথরের ভাঁজ স্পষ্ট বোঝা যায়। ভাগ্য সহায় হলে সামুদ্রিক মাছের লুকোচুরিও চোখে পড়বে। প্রাচীন প্রবাল পাথরের ওপর নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এ দ্বীপ। সাগরের গর্জন আর মৃদু ঢেউ কূলে এসে আছড়ে পড়ার দৃশ্য যে কাউকে ব্যাকুল করবে। বলছিলাম, বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের স্থলভাগ ছেঁড়া দ্বীপের কথা। অসীম নীল দিগন্তে হারিয়ে গেছে নির্জন এ দ্বীপ। দেশের সর্বদক্ষিণের এই এক চিলতে ভূখণ্ড কোনো সাধারণ দ্বীপ নয়; এটি যেন বঙ্গোপসাগরের হৃৎপিণ্ড থেকে ছিঁড়ে আসা এক টুকরো নীল নীলিমার কাব্য।

সেদিন ফজরের আজানের সময় আমরা রিসোর্ট থেকে ছেঁড়া দ্বীপে আসার প্রস্তুতি নিই। আবছা আলোয় সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে। সেন্টমার্টিনের গ্রামীণ সড়ক পেরিয়ে সমুদ্রের বিচে আসার মনোরম দৃশ্য অবলোকন করলাম। তখন সমুদ্রে ভাটা চলছিল। সূর্য ওঠেনি; চারদিকে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। একে একে ২২ জন আমরা সাইকেল চালিয়ে সমুদ্রের পাড় অতিক্রম করছি। একপাশে সমুদ্র, অন্যপাশে দ্বীপ রক্ষাকারী কেয়া গাছের বাগান তথা স্থলভাগ। মাঝে বিচে আমরা প্যাডেল ঘুরিয়ে এগিয়ে চলছি গন্তব্যে। প্রায় ৩০ মিনিট সাইকেল চালিয়ে সেন্টমার্টিনের শেষ সীমানায় এলাম। এরপর আমরা সাইকেল রেখে পায়ে হেঁটে রওনা দিলাম ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশে। ভাটা থাকায় প্রবাল পাথরগুলো ভেসে উঠেছে। ভোরের মৃদু বাতাস আর সুনসান নীরবতা। উত্তাল সাগরও যেন নীরবতা পালন করছে। পায়ে হেঁটে চললাম শেষ সীমানায় পৌঁছার উদ্দেশ্যে। মাঝে অনেকে ফজরের নামাজ আদায় করলেন। এরপর উঁকি দিল সূর্যিমামা। লাল বর্ণের সূর্যের দেখা পেয়ে অনেকেই ফ্রেমবন্দি হলেন সূর্যের সঙ্গে। গ্রুপ ছবিও তোলা হলো। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হলো দ্রুত দ্বীপের শেষ সীমায় পৌঁছানোর।

আলাপচারিতায় এগিয়ে চলতে লাগলাম। মাঝে মনে পড়ল, এ নির্জন ছোট্ট দ্বীপে কুঁড়েঘর বানিয়ে যদি থেকে যেতে পারতাম! সাগরের গর্জন আর আছড়ে পড়া ঢেউয়ে গা ভেজাতাম, আর পাখিদের কলকাকলিতে প্রাণ জুড়াতাম। চলার পথে আমাদের ট্যুর গাইড নানান গাছের সঙ্গে পরিচয় করালেন। দ্বীপ টিকিয়ে রাখার জন্য কেয়া গাছের গুরুত্ব বর্ণনা করলেন। ছেঁড়া দ্বীপে পাশাপাশি ছোট-বড় তিনটি অংশ রয়েছে। ভাটা পড়লে হেঁটে তিনটি দ্বীপেই যাওয়া যায়। আমরা পৌঁছে গেলাম শেষ দ্বীপে। কথা বলতে বলতে দেখা পেয়ে গেলাম এক নাম না জানা পাখির। ডানা ছেড়ে মাটিতে লুটিয়ে আছে পাখিটি। পাখিটি হয়তো কোনো আঘাত পেয়ে আহত হয়েছে, কিংবা দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে দ্বীপে। পাখিটিকে বিরক্ত না করে চলে গেলাম দ্বীপের শেষ মাথায়। তখন সূর্যের প্রখরতা বাড়তে লাগল। সাগরেও জোয়ার শুরু হলো। যে যার মতো ছড়িয়ে পড়ল সবাই। ধুমধাম ক্লিক চলল ততক্ষণ। এরপর ডাক এলো—আমরা একটা প্রতিবাদ করব। কিছু পোস্টার হাতে ধরিয়ে দিল, যার মধ্যে হাদি হত্যার বিচার, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং সেন্টমার্টিনে অবাধে প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টির বার্তা ছিল।

আমাদের ট্যুরটা ছিল মূলত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ২০২৬ সালের গ্র্যান্ড ট্যুর। সমিতির সাবেক-বর্তমান সদস্যদের মিলনমেলা রচিত হয় এই গ্র্যান্ড ট্যুরে এসে। এটি ছিল সাংবাদিক সমিতির সঙ্গে আমার চতুর্থবারের গ্র্যান্ড ট্যুর। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি ২০২৬) রাত ৯টায় আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রওনা করি সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে। হাসি-আনন্দ, আড্ডা, হরেক রকমের খেলাধুলা শেষে ক্যাম্পাসে ফিরি রোববার মধ্যরাতে। তিন দিনের সেন্টমার্টিন ট্যুর ছিল নানা অভিজ্ঞতায় ভরা। সবমিলিয়ে দারুণ সব স্মৃতি নিয়ে আমরা ফিরেছি আপন নীড়ে।

আবার আসি ছেঁড়া দ্বীপের গল্পে। ছেঁড়া দ্বীপ মানেই এক অদ্ভুত নির্জনতা, যেখানে সভ্যতার কোলাহল নেই, নেই যান্ত্রিক জীবনের ধুলোবালি। আছে কেবল প্রবাল পাথরের ওপর আছড়ে পড়া নোনা জলের ছন্দ আর আকাশের সঙ্গে সাগরের অনন্ত আলিঙ্গন। এ দ্বীপের সৈকত সাধারণ বালুকাময় নয়, বরং আদিম প্রবালের নকশা দিয়ে সাজানো। ভাটার সময় যখন সমুদ্রের জল সরে যায়, তখন হাজার বছরের পুরোনো সেই প্রবালগুলো জেগে ওঠে। যখন নীল জলরাশি প্রবল গর্জনে কূলে এসে আছড়ে পড়ে, তখন সেই শুভ্র ফেনার রাশি যেন প্রবাল পাথরগুলোকে পরম মমতায় স্নান করিয়ে দেয়।

ছেঁড়া দ্বীপে দাঁড়ালে আকাশের বিশালতা ঠিক কতটা, তা ভালোই উপলব্ধি করা যায়। দিগন্তরেখায় গিয়ে আকাশ আর জল যেন একে অপরের ঠোঁট ছুঁয়ে আছে। মাথার ওপর মেঘেদের অলস ওড়াউড়ি আর পায়ের নিচে চঞ্চল ঢেউয়ের গর্জন—এ দুয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হয়, আবার একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষও মনে হয়। সবমিলিয়ে প্রকৃতির এক অপরূপ দৃশ্য অবতীর্ণ হয় ছেঁড়া দ্বীপের শেষ সীমানায়। ছেঁড়া দ্বীপ কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি আত্মিক প্রশান্তির এক তীর্থস্থান, যেখানে গেলে মানুষের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায় সাগরের বিশালতায়, আর হৃদয়ে জেগে ওঠে প্রকৃতির প্রতি এক গভীর প্রেম। নীল জলরাশি আর ধূসর পাথরের এই মিতালি বারবার মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীটা যতটা সুন্দর, তার চেয়েও বেশি রহস্যময়। আর বারবার মনে পড়ে—‘আহ! যদি এখানে থেকে যেতে পারতাম!’

সময় গড়াতে গড়াতে জোয়ার বাড়তে থাকল। নির্দেশ এলো জলদি দ্বীপ ছাড়তে হবে। এবার ফেরার পালা। আসার সময় হাঁটার পথে পানি না থাকলেও এবার পানি চলে এলো। হাঁটুপানি হলো। পানি বাড়লে বিপদ হতে পারে, তাই তাড়াতাড়ি চলে আসার নির্দেশ এলো। এপারে এসে আবার সাইকেল নিয়ে রিসোর্টের পথ ধরলাম। পথে ডাব আর তরমুজ খেলাম। সেন্টমার্টিনের তরমুজের আলাদা স্বাদ রয়েছে, যা এখনো মুখে লেগে আছে। আসল গন্তব্যে পা বাড়াচ্ছি, অথচ ছেঁড়া দ্বীপের সেই দৃশ্য এখনো চোখে ভাসছে। মনে হচ্ছে আমি কল্পনায় সেখানেই রয়েছি; সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি, আর ঢেউ এসে আমার পা ভিজিয়ে দিচ্ছে। আর বারবার মনে পড়ছে—‘আহ! যদি থেকে যেতে পারতাম!’

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (চবিসাস)

ঘুণপোকা থেকে কাঠের আসবাব রক্ষায় করণীয়

কর্মক্ষেত্রে একঘেয়েমি দূর করতে...

ভিন্ন স্বাদের খাবার

কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজন মানসিক শক্তি

হাতভরা চুড়ি চাই

চোখে শুধু দেখছি সরষে ফুল…

কর্মজীবনেও থাকুক বই পড়ার অভ্যাস

নবজাতকের বাড়তি যত্ন

পিঠাপুলিতে রসনাতৃপ্তি

পূর্ণিমার আলোয় সেন্টমার্টিন