রোমান সভ্যতার জীবন্ত ইতিহাস
ইংল্যান্ডের ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায় হলো প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শহর চেস্টার। প্রায় দুই হাজার বছর আগে রোমান সভ্যতার সময়ে গড়ে ওঠা এই শহর একসময় রোমান সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। আজও চেস্টারে সেই প্রাচীন রোমান সভ্যতার অসংখ্য নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের সামনে জীবন্ত ইতিহাসের এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে। এই ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত পর্যটক ভিড় করেন। এককথায় ইংল্যান্ডের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের শহর চেস্টার।
ইংল্যান্ডের প্রাচীন শহরের মধ্যে চেস্টার খুবই জনপ্রিয় একটি শহর। শহরটি এতটাই পরিষ্কার ও সুন্দর যে, যেকোনো আগন্তুক দর্শনার্থীর প্রথম দেখাতেই মন ভরে যায়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে নির্মিত নানা স্থাপত্যশিল্প হাজার হাজার বছর ধরে আগলে রেখেছে শহরটি। এর বেশির ভাগ স্থাপনা দুই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের পুরোনো, যা আজও ইতিহাসের জীবন্ত এক অধ্যায় জুড়ে রোমান সভ্যতার সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। দর্শনার্থীদের কাছে চেস্টার শহর প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিস্ময়ের এক নতুন রাজ্য।
ইংল্যান্ডজুড়ে অসংখ্য স্থান রয়েছে, যা সংস্কৃতি ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়। এগুলোর মধ্যে প্রাচীন ইতিহাস, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আর অসাধারণ স্থাপত্যশিল্পের ভান্ডার রয়েছে এই চেস্টার শহরে। এখানে রয়েছে চেস্টার সিটি ওয়াল, রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার, ডিভা রোমান এক্সপেরিয়েন্স, ইস্টগেট ক্লক, চেস্টার ক্যাথেড্রাল, দ্য রোজ, রিভার ডি-সহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সাম্রাজ্যের ইতিহাস, যা শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
ইংল্যান্ডের মধ্যে চেস্টার শহর জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো রোমান আমলে নির্মিত এখানকার চেস্টার সিটি ওয়াল—যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে প্রাচীন ও অক্ষত দুর্গপ্রাচীর, যার দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটারেরও বেশি। চেস্টার সিটি ওয়াল বা দেয়ালের উপর যে রাস্তাটি রয়েছে, তা দিয়ে পুরো শহরে হেঁটে বেড়ানো যায়। রোমান সামরিক এই দুর্গটি মূলত শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্যই নির্মাণ করা হয়েছিল। ৭৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত রোমান দুর্গের এই স্মৃতিচিহ্ন একসময় ছিল রোমান সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেনাঘাঁটি।
রোমান আমলের সবচেয়ে বড় অ্যাম্ফিথিয়েটার, যার নাম ‘চেস্টার রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার’, সেটিও আরেক প্রাচীনকালের গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই ও সামরিক প্রশিক্ষণের স্মৃতিবিজড়িত এলাকা। রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান প্রতীকী হিসেবে এটি পরিচিত। এখানে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধ হতো। এই রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার নিয়ে লোমহর্ষক অনেক মিথ আজও লোকমুখে রটছে। অনেকেরই ধারণা, এখানে যুদ্ধবন্দি, দণ্ডিত অপরাধী বা ক্রীতদাসদের জোর করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করানো হতো। নির্মম নির্যাতনের এক অনন্য স্থান ছিল রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার। মূলত রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার কেবলই একটি স্থাপত্যের নিদর্শনই নয়, এটি রোমান সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের অনন্য গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রোমান আমলে নির্মিত এই রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটারটি দেখতে প্রতিদিন পর্যটকদের ভিড় লক্ষ করা যায়।
ব্রিটেনের প্রাচীন এই চেস্টার শহরটি এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর শহরের খেতাব অর্জন করেছে। ফলে দিন দিন পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ বাড়ছে। অনেকেই মনে করেন লন্ডন কিংবা ভেনিসের মতোই চেস্টার শহর। পুরোনো রোমান সভ্যতার দুই হাজার বছরের পুরোনো জীবন্ত ইতিহাস দেখার আগ্রহ নিয়ে অনেক পর্যটক আসেন এখানে। এই শহরের আধুনিক নাম চেস্টার হলেও এর ব্রিটনিক নাম ‘কেয়ার লিজিয়ন’, রোমান নাম ছিল ‘দেভা ভিক্ট্রিক্স’। একসময় শহরটির নিজস্ব পতাকাও ছিল।
ইস্টগেট ক্লক বা ঘড়ি যা পুরো শহরকে করেছে আলোকিত। এটির স্থাপত্যশৈলী প্রাচীন ঐতিহ্যের শহরটি আরো জীবন্ত করে তুলেছে। ১৮৯৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার ডায়মন্ড জুবলি উপলক্ষে এই ক্লক টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আজ এটি পুরো শহরের সবচেয়ে আইকনিক ল্যান্ডমার্ক। এই সুন্দর টাওয়ারটি থেকে দাঁড়িয়ে পুরো শহরের পাশাপাশি ওয়েলস পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ উপলব্ধি করা যায়।
চেস্টার ক্যাথেড্রাল শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। বিশাল প্রাচীন এই গির্জাটির ইতিহাসও এক হাজার বছর পুরোনো। ক্যাথেড্রালটি মধ্যযুগীয় কাঠের খোদাই করা কারুকাজের, যে কারণে এই স্থাপত্যের প্রতি বিশ্ব পর্যটকদেরও আকর্ষণ বেশি। এই ক্যাথেড্রাল বা গির্জার স্থাপত্যশৈলী আজও পর্যটকদের প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করছে। ইতিহাস-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এই প্রাচীন অট্টালিকা জুড়ে রয়েছে কয়েক শত বছরের স্মৃতিবিজড়িত অনেক লোকগল্প। শৈল্পিক কারুকার্য আর অতীত দিনের স্মৃতির মিশেলে ভেসে বেড়ান আগত সব দর্শনার্থী। এখানকার হাজার বছরের নির্মাণশৈলীর পাশাপাশি বিনোদন মাধ্যমগুলোর প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনি এবং কিংবদন্তি, রূপকথার গল্প, উপকথা কিংবা লোককাহিনির উপাদানগুলো হতে পারে আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ ইতিহাস।
ডিভা রোমান এক্সপেরিয়েন্স হলো রোমান জীবনের এক জীবন্ত প্রদর্শনী। শহরের গভীরের আসল প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য দেখার জন্য দারুণ একটি স্থান। এছাড়া শহরটির প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে রোমান গার্ডেন। এখানে আজও সংরক্ষিত আছে রোমান আমলের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও স্তম্ভ, যা দুই হাজার বছরের সাক্ষী হিসেবে রয়ে গেছে।
দ্য রোস হলো মধ্যযুগের কাঠের তৈরি দুই তলাবিশিষ্ট একটি ভবন, যা এখনো আধুনিক শপিং গ্যালারি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দ্য রোস ৭০০ বছরের পুরোনো স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। কাঠের তৈরি এই স্থাপনার প্রতিটি স্থানে শৈল্পিক কারুকার্য আর অতীত দিনের স্মৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে। গ্যালারির বারান্দাগুলো এতটাই বিরল, যা বিশ্বের আর কোথাও মেলে না।
রিভার ডি চেস্টারের অবস্থান শহরের প্রাণকেন্দ্রে। ডি নদীর তীর ঘেঁষে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী উদ্যান। নদীর তীরে হাঁটা, বোট রাইডিংসহ নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা ক্যাফে ও রেস্তোরাঁগুলোয় রয়েছে বাহারি ধরনের খাবার। চেস্টার শহরে রয়েছে আধুনিক মানের বিনোদন কেন্দ্র। এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপত্যের পাশেই রয়েছে চমৎকার সব হোটেল, রেস্তোরাঁ, পাবসহ আধুনিক নাইটক্লাব এবং বিভিন্ন নামিদামি শপ।
ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমের ওয়েলসের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থান করছে প্রাচীন শহর চেস্টার। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে নির্মিত নানা স্থাপত্যশিল্প এখনো সেভাবেই রয়ে গেছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৭৯ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট ভেসপাসিয়ানের শাসনামলে রোমানরা ‘দেভা ভিক্ট্রিক্স’ নামের একটি শক্তিশালী দুর্গ স্থাপন করেছিল। শহরটি হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনকেন্দ্র। এককথায় বলতে গেলে মনে হয়, এই শহরে ইতিহাস আর ঐতিহ্য যেন হাত ধরাধরি করে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
আপনিও আপনার প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে এই সামারে ঘুরে আসতে পারেন প্রাচীন রোমান, মধ্যযুগীয় ও আধুনিক ব্রিটিশ সংস্কৃতির এক অনন্য সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা ইংল্যান্ডের অনন্য এই শহর চেস্টারে। শহরটি দুই হাজার বছরের পুরোনো রোমান সভ্যতার সব স্মৃতির পসরা সাজিয়ে অপেক্ষা করে আছে আগত দর্শনার্থীদের জন্য। রোমান যুগে নির্মিত এসব চিত্তাকর্ষক দেয়াল আর সমৃদ্ধে ভরপুর ইতিহাস-ঐতিহ্যের মেলবন্ধন চেস্টার শহর প্রতিটি মুহূর্তে আপনাকে উপহার দেবে দারুণ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
লেখক : সভাপতি, লিভারপুল বাংলা প্রেস ক্লাব, ইউকে