হোম > ফিচার > আমার জীবন

পাহাড়ের সান্নিধ্যে

বন্যা নাসরিন

পাহাড় কিংবা সমুদ্র কার না ভালো লাগে। তাই তো সারা বছর মানুষ সুযোগ পেলেই পাহাড়ের কাছে যায়, সমুদ্রের ডাকে ছুটে চলে। প্রকৃতির এই দুটি জিনিস আমাদের বিশালতা শেখায়, গভীরতা শেখায়, জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

প্রথমে পরিকল্পনা ছিল শুধু পাহাড় দেখব। তাই বান্দরবানের লামা উপজেলার টিকিট কাটলাম অনলাইনে। ফেরার টিকিটও যাওয়ার আগেই সংগ্রহ করে নিলাম লামার একজন স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায়। কলাবাগান থেকে রাত ১০টায় বাসে উঠে পড়লাম। লামা পৌঁছালাম সকাল সাড়ে ৭টায়। লামা পৌঁছানোর আগে ইয়াংছা নামের এক জায়গায় সেনাবাহিনীর কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিতে হয়। বাস যখন লামা রোডে প্রবেশ করল, তখন থেকেই যেন চারপাশের প্রকৃতি বদলে যেতে শুরু করল। বড় বড় পাহাড় আর মেঘ স্বাগত জানাল আমাকে। অদ্ভুত ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম।

লামা বাসস্ট্যান্ডে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল সেখানকার বাসিন্দা এক ছোট ভাই। বাসস্ট্যান্ড থেকে তাদের বাড়ি পায়ে হাঁটা দূরত্বে পাঁচ মিনিট। তাই সকালের নাস্তাটা সেখানেই করতে হলো। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম নদী দেখতে। বাড়ির পাশেই মাতামুহুরী নদী। একটা নৌকা ভাড়া করলাম। দুপাশে পাহাড়সারি আর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলছে শান্ত মাতামুহুরী নদী। এ যেন এক অনবদ্য কবিতা। প্রায় প্রতিটা পাহাড় আর নদীর তীরে গড়ে উঠেছে পর্যটকদের জন্য অনেক কটেজ।

সকালের রোদ গায়ে মেখে সেই মুগ্ধ দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা সাদা পাহাড় পর্যন্ত গেলাম। তারপর আবার ফিরে এলাম। ইচ্ছা করছিল—যদি আরো অনেকক্ষণ এভাবেই নদীতে ভেসে চলতে পারতাম! এক ঘণ্টা নৌকায় ঘুরে ঘাটে ফিরে নৌ-চালককে এক হাজার টাকা দিয়ে নেমে পড়লাম। তারপর একটা রিকশা নিয়ে চলে গেলাম মহামুনি বৌদ্ধবিহারে। ভাড়া নিল ৬০ টাকা। বিহার ঘুরে কিছুক্ষণ রিকশায় ঘুরলাম শুধু দুপাশের দৃশ্য দেখার জন্য। তারপর চলে গেলাম লাড়ং নামে এক পাহাড়ি রেস্টুরেন্টে। সেখানে পাহাড়িদের স্পেশাল মুন্ডি আর লেমন মিন্ট খেলাম। এরপর হেঁটে হেঁটে লামা পৌরসভা পার্কে গেলাম। ইচ্ছা ছিল সেখানে লাঞ্চ করব; কিন্তু সংগত কারণে করা হলো না। সেখান থেকে ফিরে লামা বাজারে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। আর বনফুল থেকে নিয়ে নিলাম এক পাউন্ডের একটা জন্মদিনের কেক।

লামা বাজার থেকে সিএনজিতে জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে চলে গেলাম মিরিঞ্জা ভ্যালির পাদদেশে। পাহাড়ি কলা কিনে আর কেকটা ওখানকার স্থানীয় দোকানের এক ফ্রিজে রেখে আমরা বাইক ভাড়া করলাম ২০০ টাকা দিয়ে। গন্তব্য ‘চুংদার বক’ কটেজ। কটেজটা বেশ উঁচুতে আর রাস্তার অবস্থাও জবরজং। তবু অ্যাডভেঞ্চার ফিল নিয়ে বাইকে করে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। আটজনের বড় একটা কটেজে আমি একাই থাকলাম। কটেজভাড়া আড়াই হাজার টাকা। তিন বেলা খাবার ৭০০ টাকা। কটেজ থেকে চারপাশের দৃশ্য একদম আমার মনঃপূত ছিল। সন্ধ্যায় মায়াভরা সূর্যাস্ত দেখলাম কটেজ থেকে। তারপর বেলুন আর গাঁদা ফুল দিয়ে দোলনা সাজালাম। জ্বালিয়ে দিলাম একটা বড় মোমবাতি। ততক্ষণে চাঁদও আলো ছড়াতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে একটা অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হলো। দোলনায় দোল খেতে খেতে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। আমার কটেজটাও সাজানো হলো ফুল আর বেলুন দিয়ে। একটু ক্ষুধা ক্ষুধা পেয়ে গেছে ততক্ষণে। কটেজের বারান্দায় বসে ইস্ট বেকার, কলা আর কফি খেয়ে নিলাম। এদিকে আমাদের বারবিকিউ ডিনারও রেডি।

ডিনারটা একটু দেরিতেই করলাম। কটেজের কর্ণধার যিশুদা রাতদুপুরে অনেকটা পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে আমার কেক নিয়ে এলেন। তাকে নিয়ে কেক কাটলাম। ফানুস ওড়ালাম হইহই করে। কুয়াশায় চারপাশ ভিজে যাচ্ছিল, শীত লাগছিল। সেই শীত-শীত আবেশে রাতের খাবারটা খেয়ে নিলাম কটেজের বারান্দায় বসেই। রাতভর গল্প চলল, চাঁদের জ্যোৎস্না গায়ে মাখলাম, আকাশভরা তারা দেখলাম, দোলনায় দোল খেলাম, জঙ্গল থেকে ভেসে আসা নাম না জানা বিভিন্ন পোকার গান শুনলাম। বোনাস হিসেবে অন্য পাহাড় থেকে একদল পর্যটকের গান শোনারও সৌভাগ্য হলো। দেখলাম, শূকর তার বাচ্চাদের নিয়ে কটেজের বারান্দায় উঠে আসছে, কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে, মোরগ ডাকছে। এসব দৃশ্য দেখে মনে হলো, যেন প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে আছি। সারারাত কটেজের দরজার সামনে ফুলের বিছানায় মোমবাতি জ্বলল। আস্তে আস্তে ভোর নামা দেখলাম।

সূর্য ওঠার আগেই শাড়ি পরে বেরিয়ে পড়লাম পাশের আরেকটা কটেজে, আর খোলা ছাদ থেকে মেঘের দৃশ্য দেখব বলে। চারপাশে তখন মেঘে মেঘে সাদা হয়ে আছে। আবার আমরা খোলা ছাদ আর দোলনা সাজালাম ফুল আর বেলুন দিয়ে। ছবি তুললাম সেখানে। দুচোখ ভরে মেঘ দেখলাম, অবাক হয়ে সূর্যোদয় দেখলাম! পাহাড়ে মেঘের ভেসে বেড়ানোর সৌন্দর্য ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। জীবনে একবার হলেও সবার এমন দৃশ্যের সাক্ষী হওয়া উচিত। রাতেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, পরদিন সকালে কক্সবাজার চলে যাব। তাই সকালে খুব বেশি সময় পাহাড়ে থাকা হলো না। কটেজে ফিরে গিয়ে শাড়ি বদলে ডিমখিচুড়ি দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। সাড়ে ৮টায় বাইক এসে আমাদের নিয়ে গেল মিরিঞ্জার পাদদেশে। রঙবেরঙের বাহারি কটেজ দেখতে দেখতে নিচে নামলাম। পথে মুগ্ধ করল আরো দুটো জিনিস। জিনিয়া ফুলের আড়ালে ভেসে বেড়ানো মেঘ আর পাহাড়ি মেয়েদের পিঠে করে বয়ে নেওয়া কলার কাঁদির দৃশ্য। মিরিঞ্জায় পৌঁছে চকরিয়াগামী একটা বাসে উঠে পড়লাম। তারপর ফাঁসিয়াখালী নেমে উঠে পড়লাম কক্সবাজারগামী আরেকটা বাসে। সেখান থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব মাত্র ৫২ কিলোমিটার।

কক্সবাজার বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালাম সকাল পৌনে ১১টায়। বাস থেকে নেমে একটা রিকশা নিয়ে চলে গেলাম মেরিন ড্রাইভ রোডে। প্যারাসাইক্লিং জোনে নেমে সমুদ্র উপভোগ করলাম। সেখানে পর্যটকের ভিড় কম। কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে সাম্পান হোটেলের সামনে গিয়ে বেড ভাড়া নিলাম এক ঘণ্টার জন্য। সেখানেও পর্যটক কম। তাই সমুদ্রকে ভালোভাবে অনুভব করা যায়। এক ঘণ্টা পর রিকশা নিয়ে গেলাম সুগন্ধা বিচে। সেখানে আমাদের পরিচিত আরো দুজনের সঙ্গে দেখা করলাম। তারাও ঢাকা থেকে এসেছেন সমুদ্র দেখতে। লেবুর শরবত আর আনারকলি খেলাম। আনারকলি ফলটা এই প্রথম খেলাম। খেতে বেশ লেগেছে। সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে আবারও জন্মদিনের কেক কাটলাম। তখনো দুপুরের খাবার খাইনি। ক্ষুধা লেগে গেছে। সুগন্ধা বিচের শুরুতেই ‘কড়াই’ নামে একটা সুন্দর রেস্টুরেন্ট পেয়ে ঢুকে পড়লাম। ডাল, আলুভর্তা আর মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেলাম। খাবার ভালো ছিল, পরিবেশও। তবে খাবারে লবণ কম ছিল। লেমন মিন্ট খেলাম লাঞ্চ শেষ করে। মিন্টটাও ভালো ছিল। তারপর সুগন্ধা বিচ ঘুরে কিছু কেনাকাটা সেরে নিলাম। কেনাকাটা শেষ হলে আবার বেড ভাড়া নিলাম। তখন পড়ন্ত বিকাল। এ সময়টা সমুদ্রতীরে খুব ভালো লাগে। জোয়ার আসে তখন। আমরা সূর্যাস্ত দেখে বিদায় নিলাম কক্সবাজার থেকে। সুগন্ধা বিচ থেকে রিকশা নিয়ে কক্সবাজার বাসস্ট্যান্ডে এলাম। সেখান থেকে চকরিয়াগামী বাসে উঠে পড়লাম। ততক্ষণে লামা বাস কাউন্টারে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমি সংগত কারণে চকরিয়া থেকে উঠব। রাত ৯টায় আমি বাসে উঠলাম। ঢাকা পৌঁছালাম সাড়ে ৫টায়। পেছনে পড়ে রইল মেঘের পাহাড় আর ঢেউয়ের সমুদ্র।

যাতায়াত ব্যবস্থা : ঢাকা থেকে লামায় যেতে পারবেন আলীকদমগামী বাসে। ভাড়া নেবে নন-এসি বাসে ১ হাজার ৫০ টাকা। চকরিয়া থেকে কক্সবাজারের ভাড়া নেবে ৭০-৮০ টাকা।

সতর্কতা : পাহাড় আর সমুদ্রে সতর্ক থাকাটা খুব জরুরি। সমুদ্রে নামলে জোয়ার-ভাটা দেখে নামতে হবে। পাহাড়ে চলাচলের ক্ষেত্রেও খুব সাবধান; না হলে অসাবধানতাবশত পা ফসকে গেলেই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

সন্তানের সার্বিক বিকাশে বাবা-মা ও শিক্ষকের ভূমিকা

বিশ্বের সবচেয়ে বিরল রক্তের গ্রুপ কোনটি ও কেন?

শীতে ত্বকের যত্ন

সুখী মানুষের দেশ ভুটান

এক ছোট্ট দ্বীপের গল্প

শীতে পায়ের যত্নে করণীয় কী

শীতে পায়ের যত্নে করণীয়

অন্দর সাজুক আয়নায়

সন্তানের সার্বিক বিকাশে সাধারণ জ্ঞানের গুরুত্ব

ঢাকা টু জিরো পয়েন্ট: পথে যেতে দেখা…