এক হাতে পাঠ্যবই, অন্য হাতে সন্তানের ভবিষ্যৎ—এমন দ্বৈত দায়িত্ব সামলানোর গল্পগুলো একই সঙ্গে কঠিন এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রচলিত ধারণায় মাতৃত্বকে অনেক সময় নারীর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তবতায় একদল অদম্য শিক্ষার্থী-মা প্রতিনিয়ত সেই ধারণাকে বদলে দিচ্ছেন। বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে এমনই কিছু লড়াকু নারীর গল্প সামনে আসে, যারা পড়াশোনা এবং মাতৃত্বকে এক সুতোয় বেঁধে এগিয়ে চলেছেন। সন্তানকে লালন-পালন করার পাশাপাশি তারা নিজেদের শিক্ষাজীবনও সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এই অদম্য যাত্রায় মাতৃত্ব কি শুধুই একটি বাধা, নাকি এগিয়ে যাওয়ার নতুন অনুপ্রেরণা?
অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও রাতের শেষ প্রহরের পড়াশোনা
‘মা’ শব্দটি শুধু একটি অনুভূতি নয়; এটি অবিশ্বাস্য সুন্দর, নিঃস্বার্থ ও পবিত্র ভালোবাসার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। একজন নারীর সন্তান লালনপালনের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ। মাতৃত্ব এবং পড়াশোনার সমন্বয় করা খুব সহজ বিষয় নয়। সন্তানের জন্মের পর মায়ের নিজের পড়াশোনার জন্য সময় বের করাও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। সারাদিনের সংসার সামলানোর পর দিনের বেলায় পড়াশোনার সুযোগ প্রায়ই থাকে না বললেই চলে। তাই অনেক সময় নবজাতক সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে রাতের শেষ প্রহরে পড়ার জন্য সময় বের করতে হয়।
আমি যখন মাতৃত্বের স্বাদ পাই, তখন শুধু মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়েছি। এরপর উচ্চমাধ্যমিকের যাত্রা আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। রাতের শেষ প্রহরে সন্তান ঘুমানোর পর পড়াশোনার জন্য সময় বের করেছি। নবজাতক শিশুকে তার নানা-নানির কাছে রেখে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।
আমার এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আবার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাও ছিল দৃঢ় মনোবল এবং আত্মবিশ্বাস। সবসময় মনে হয়েছে—আমি পারব, আমাকে পারতেই হবে। এই মনোবলই আমাকে শক্তি দিয়েছে এবং সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
যারা ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো নিজের মনকে শক্ত করা এবং নিজেকে প্রাধান্য দেওয়া। মনে রাখতে হবে, আপনি পারবেন এবং আপনাকে পারতেই হবে। মাতৃত্ব যেন কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়; বরং এটি হতে পারে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সন্তানের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।
—তানজিলা আক্তার তানু
শিক্ষার্থী, পল্লবী সরকারি কলেজ, ঢাকা
সময় ব্যবস্থাপনা ও স্বপ্নের প্রতি অবিচল আস্থা
একজন নারীর জন্য সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ উপাধি হলো ‘মা’। কিন্তু এই মাতৃত্বের অধ্যায় যখন একজন তরুণী শিক্ষার্থীর জীবনে আসে, তখন সেটি প্রথমে ভীতিকর মনে হলেও পরিবারের সবার সহযোগিতায় তা মধুর হয়ে ওঠে। এই প্রতিকূল অবস্থা পাড়ি দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এ ক্ষেত্রে একজন মাকে সন্তান পালন ও পড়াশোনার মধ্যে ভারসাম্য রাখার আসল উপায় হলো সময় ভাগ করে নেওয়া। সন্তানের ঘুমের সময়টুকু বই নিয়ে বসা, সময় ব্যবস্থাপনা শেখা, সাহায্য নিতে সংকোচ না করা এবং নিজের প্রতি ধৈর্য রাখা জরুরি। এই ব্যালান্স নিখুঁত না হলেও চেষ্টা এবং ধারাবাহিকতাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষাজীবন ও মাতৃত্বের এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে শারীরিক ও মানসিক চাপ। ঘুমের অভাব, ক্লান্তি, সময়ের সংকট, সবকিছু মিলিয়ে অনেক সময় ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে অনেক মায়ের একটাই ভাবনা থাকে, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যই নিজেদের শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এই ভাবনাই তাদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। যারা ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, তাদের জন্য প্রথম পরামর্শ হলো নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখুন। মাতৃত্ব কোনো বাধা নয়, বরং এটি আপনাকে আরো দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী করে তুলবে। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের স্বপ্নকে কখনো ছোট করে দেখবেন না।
মারজিয়া তাবাসসুম
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
পরিবারের নিঃশর্ত সমর্থন আর অসীম ত্যাগ
আমার কাছে মাতৃত্ব মানে অসীম ত্যাগ। একটি প্রাণ পৃথিবীতে নিয়ে আসা এবং সেই ছোট্ট অসহায় শিশুটিকে একটু একটু করে বড় করে তোলা—এটি অনেক বেশি ধৈর্য ও পরিশ্রমের কাজ। হঠাৎ করে এত বড় একটি দায়িত্ব এসে পড়লে সম্পূর্ণ জীবনযাপনই পরিবর্তিত হয়ে যায়। শারীরিক ও মানসিক চাপের পাশাপাশি নানা অসুবিধারও সম্মুখীন হতে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে সফল হতে হলে দুটি বিষয় জরুরি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা। আরেকটি হলো পরিবার তথা প্রিয়জনদের ভরসা ও সহযোগিতা, যা ছাড়া একজন মায়ের পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার গড়া কখনোই সহজ নয়। আমার পড়ালেখা এবং সন্তান লালনপালন একসঙ্গে চালিয়ে যেতে পারার পেছনে আমার মায়ের অবদান ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সত্যি বলতে, আমার মা একজন মহীয়সী নারী, যিনি আমার চলার পথ সহজ করে দিয়েছেন। যখনই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, তিনি আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আমার স্বামীও কখনো আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি; বরং আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন। তারা যেভাবে আমাকে ও আমার সন্তানের যত্ন এবং সহযোগিতা করেছেন, তার জন্য আমি আজীবন তাদের কাছে ঋণী থাকব। মা হওয়ার মতো এত সুন্দর ও স্বর্গীয় অনুভূতি আর হয় না। সৃষ্টিকর্তা সব মাকে এবং তাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানদের ভালো রাখুন। মাতৃত্ব যেন পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার গড়ার পথে বাধা না হয়ে বরং নতুন অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
—সুরাইয়া আফরিন হিয়া
শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া