রোজার ঈদে নারীদের অনেক ব্যস্ততা থাকে। রোজার মাসে সাহরি ও ইফতার তৈরি, ঘর গোছানো, কেনাকাটা এবং ঈদের রান্নার প্রস্তুতির কাজ থাকে। কাজের চাপ থাকা সত্ত্বেও তারা পরিবারের আনন্দের জন্য ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি এই দায়িত্বগুলো পালন করেন। এটা তাদের জন্য একটি ভিন্নমাত্রার আবেগ ও আনন্দের বিষয়।
নারীরা অফিস, বাড়ি, সন্তান—সব এক হাতে সামলান। তারা এক হাতে রাঁধেন, অন্য হাতে চুল বাঁধেন। তাছাড়া শুধু ঘর-বাড়ি সাজালেই হয় না; সব সামলে নিজেদেরও পরিপাটি করে সাজাতে হয়। সবখানেই সুন্দরভাবে নারীরা নিজেদের উপস্থাপন করার চেষ্টা করে থাকেন।
রোজার ঈদে নারীদের প্রধান ব্যস্ততার ক্ষেত্রগুলো নিচে দেওয়া হলো—
ইফতার ও সাহরির প্রস্তুতি : দীর্ঘ এক মাস প্রতিদিন সাহরি ও ইফতারের আয়োজন করা নারীদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এটি রান্নার কাজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি নিশ্চিত করে।
ইবাদত ও আমল : কাজের মাঝেও নারীরা তারাবির নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং বিশেষ দোয়ার অংশগ্রহণ করেন।
ঘর গোছানো ও পরিচ্ছন্নতা : ঈদ উপলক্ষে ঘরবাড়ি পরিষ্কার, পর্দা পরিবর্তন এবং নতুন সাজে ঘর সাজানোর কাজ নারীরাই প্রধানত করেন, যা উৎসবের আমেজ তৈরি করে।
পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর ও বাথরুম
ঈদ উপলক্ষে পুরো ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা ও গোছানোর পাশাপাশি নজর দিতে হয় রান্নাঘর আর বাথরুমের দিকে। সমান গুরুত্ব দিয়েই এ জায়গাগুলো গোছানো উচিত। রান্নার পর রান্নাঘর ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এতে নিজের কাছে যেমন ভালো লাগবে, তেমনই আগত অতিথিরাও মুগ্ধ হবেন। ঠিক সেভাবেই বাথরুমও ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে রাখুন। হাত মোছার পরিষ্কার টাওয়েল ও টিস্যু পেপার বক্স হাতের কাছে রাখুন। লিকুইড হ্যান্ডওয়াশের কন্টেইনার ভরে রাখুন। এর সঙ্গে দু-একটা শোপিস ও ছোট গাছও রাখতে পারেন বাথরুমে। এসব কাজ অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে নারীরা সম্পন্ন করেন।
সার্বিকভাবে পুরো বাড়ির সাজসজ্জার দিকেই এ সময় নজর দিতে হবে। রোদে আপনার বাড়িতে ঢুকে অতিথি যেন স্বস্তির শ্বাস ছাড়তে পারেন, এদিকটায় নজর দিন। নিজের বাসা বা বাড়িটিকে একটু বিশেষ যত্নে সাজিয়ে নিয়ে আমরা সবাই ঈদের আনন্দকে আরো বেশি আনন্দময় করে তুলতে পারি।
কেনাকাটা : ধনী-গরিব সবাই ঈদে কমবেশি কেনাকাটা করেন। পরিবারের সবার জন্য নতুন জামা কেনা, বিশেষ করে চাঁদরাতে কেনাকাটা এবং উপহার কেনা নারীদের ব্যস্ততার বড় অংশ।
ঈদের রান্না ও আপ্যায়ন : ঈদের দিনের বিশেষ খাবারের (সেমাই, পায়েস, কোরমা, পোলাও) প্রস্তুতি শুরু হয় ঈদের আগের রাত থেকেই।
খাবার ঘর ও মানানসই পরিবেশন
ঈদের দিন খাবার ঘর খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ঈদ মানেই ভোজনের বিশাল আয়োজন। এদিন সাধ্যমতো সবার বাড়িতেই মুখরোচক নানা রকমের রান্নার আয়োজন চলে। আর যেখানে এই রান্না পরিবেশন করা হবে, সে জায়গাটাও পরিপাটি রাখা দরকার। সুন্দর বাটি, গ্লাস ও থালা গুছিয়ে রাখুন, যাতে পরিবেশনের সময় ঝামেলা না হয়। টেবিল ম্যাটটাও যেন মানানসই হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। গ্লাসগুলো একটা ট্রেতে গুছিয়ে রাখলে কাজের সুবিধা হয়। ন্যাপকিন, চামচ এসবও একটা ট্রেতে গুছিয়ে রাখুন। টেবিলে ফ্রুট বাস্কেটে কিছু ফল সাজিয়ে রাখা যেতে পারে। ফুলদানিতে রাখা ফুল ও টেবিলের শোভা বাড়াবে।
মেহেদি পরা : ঈদের আগের রাতে (চাঁদরাত) নারীরা নিজেদের ও সন্তানদের মেহেদি পরাতে ব্যস্ত থাকেন। এই সামগ্রিক ব্যস্ততার মাঝেও নারীরা আনন্দ ও সার্থকতা খুঁজে পান।
বাড়ি-ঘর পরিষ্কার, রান্নাবান্না, অতিথি আপ্যায়ন প্রভৃতি কাজই নারীর কাজ বলেই আমরা মনে করি। সমাজ-নির্ধারিত এই শ্রম বিভাজনের চাপে পড়ে আমাদের মা-বোন-ভাবিদের আলাদা করে ঈদ উদ্যাপনের আর কোনো সুযোগ মেলে না। এই আধুনিক সময়ে এসেও এখনো আমরা মনে করি, ঘর-গৃহস্থালির কাজ মেয়েদের আর ঘরের বাইরের কাজ ছেলেদের। সত্যিকার অর্থে নারীর কাজ আর পুরুষের কাজ বলে আলাদা কিছু কি আছে? ঘরের কাজ কি পুরুষেরও কাজ নয়? আমাদের চিন্তা-চেতনায় বহুকাল ধরে যে ভাবনাগুলো খুঁটি গেড়ে বসে আছে, সেগুলো থেকে আমরা এখনো খুব বেশি বেরিয়ে আসতে পারিনি।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ঈদ আসে নারী-পুরুষ সবার জন্যই। নারীদের ওপর সব কাজের দায় না চাপিয়ে যদি পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই মিলে কাজ ভাগ করে নেওয়া যায়, তাহলে ঈদ উদ্যাপন যে আরো আনন্দময় হয়ে উঠবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আমরা ঈদে মায়ের হাতের বা বোনের হাতের রান্না খেতে ভালোবাসি। তবে এ রান্নার যে প্রক্রিয়া তার স্তরে স্তরে নারীর যে শ্রম-ঘাম তার খবর রাখি না। আমরা যদি নারী-পুরুষ ভেদাভেদ না করে একজন আরেকজনের কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই, তাহলে আমাদের ঈদের আনন্দ বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। আমাদের ঘর ভরে উঠবে ঈদের আনন্দে। আমাদের নারীদের জন্য ঈদের দিন আসুন একটু ভালোবাসার হাত বাড়াই; তারা যেন অনুভব করে নারী একা নয়—তার পাশে তার পুরো পরিবার আছে।