প্রকৃতি সেদিন ছিল বিষণ্ণ। বাতাস ছিল বিমর্ষ! আকাশেরও ছিল ভীষণ মন খারাপ। ভারাক্রান্ত সূর্য লুকিয়েছে তার মুখ। ব্যথার চাদরের মতো কুয়াশায় ঢাকা আর শিশিরের অশ্রুজলে সিক্ত মঙ্গলবারের সকালটি ছিল হারানোর শোকে কাতর! সারা দেশ কাঁদছে। কারণ, তারা এমন একজনকে হারিয়েছে, যিনি দল-মতের ঊর্ধ্বে একজন প্রিয় ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের প্রথম এবং তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী।
বেগম খালেদা জিয়া! এই নামটির মধ্যে রয়েছে মহাবিস্ময়! কয়েক যুগের ইতিহাস। নামটি উচ্চারণ করতেই খেই হারিয়ে ফেলি। ঠিক কোথা থেকে শুরু করব! তার বহুমাত্রিক জীবন বর্ণিল ও কাব্যময়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার মতো বলতে হয়—
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী
আর হাতে রণ তূর্য!’
একদিকে তিনি প্রেমময়ী আদর্শ স্ত্রী, আরেক দিকে তিনি সন্তানের জন্য স্নেহকাতর মা। অন্যদিকে তিনি আপসহীন ও সংগ্রামী জননেত্রী। দেশপ্রেমিক, লড়াকু ও সফল শাসক। তিনবারের নির্বাচিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। রাজনীতির কিংবদন্তি ও ত্যাগের মহাকাব্য বেগম খালেদা জিয়া। তিনি চলে যাওয়ার আট দিন গত হলো। তারপরও তার কবরের পাশে এসে কেউ নীরবে, কেউ অঝোরে কাঁদছেন। পরিচয়, অবস্থান—সবকিছু পেছনে ফেলে দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করছেন। তার কবরের পাশে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষ জড়ো হয়ে দোয়া করছেন। সাধারণ মানুষের এ অশ্রু খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম ও ত্যাগের প্রতি নিখাদ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ।
খালেদা জিয়ার গৃহবধূ থেকে দেশনেত্রী হয়ে ওঠার করুণ ইতিহাস রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাই ভালো বলতে পারবেন। তারপরও কয়েক লাইন না লিখলেই নয়। তিনি ছিলেন একজন ধৈর্যশীল ভালো মানুষ, আদর্শ স্ত্রী ও মমতাময়ী মা। একজন মানুষ যতই ক্ষমতাবান, উচ্চপদস্থ হন না কেন, সবার আগে মানবিক ও ভালো মানুষ হওয়া জরুরি। তা না হলে জীবনের সব অর্জনই বৃথা।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাকে সইতে হয়েছে অনেক লাঞ্ছনা ও নির্যাতন। তবু অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। তবুও দেশ ছাড়েননি। অহর্নিশ প্রতিপক্ষের মুখ থেকে শুনতে হয়েছে অশালীন ও অরুচিকর মন্তব্য! ব্যক্তিগত বিষয়ে শুনতে হয়েছে বিদ্রুপ-উপহাস। তিনি কোনো প্রতিবাদ করেননি। তিনি ভাষার ক্ষেত্রে আর ব্যবহারে ছিলেন সংযমী। সংসদে কিংবা বাইরে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে কোনো প্রত্যুত্তর দেননি। সবকিছু নীরবে সহ্য করেছেন। তার অগাধ ধৈর্য ও সহনশীল আচরণ সবার কাছে প্রিয় করে তোলে। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন সংবেদনশীল, মানবিক ও ভালো মনের মানুষ। তার জীবন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
আদর্শ স্ত্রী
তিনি ছিলেন প্রেমময়ী আদর্শ স্ত্রী; স্বামীর আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর তার দেখানো পথেই চলেছেন। স্বামীর আদর্শ চলার পথের পাথেয় করে দুই সন্তান নিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছেন। সন্তানদের বাবার আদর্শে গড়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, তার স্বামী বিলাসী জীবন পছন্দ করতেন না। তাই সন্তানদের নিয়ে সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। সংসার খরচ বাবদ স্বামী তার হাতে দুই হাজার টাকা তুলে দিতেন। তা দিয়ে তিনি নিজের সংসার চালাতেন। তারা সরকারি রেশনের চালের ভাত খেতেন। এসব কথা থেকেই বোঝা যায় তিনি কতটা স্বামীর কাজ ও সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত আর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
মমতাময়ী মা
খালেদা জিয়া ছিলেন স্নেহময়ী মা। ছোট ছেলে কোকো মারা যাওয়ার পর তিনি বিলাপ করে কেঁদে দেশবাসীর সমবেদনা কুড়াননি, তবে তিনি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যান। তিনি বলেন, ‘আমি কম বয়সে স্বামী হারিয়েছি। কারাগারে থাকতে আমি আমার মাকে হারিয়েছি। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় আমি একটি সন্তান হারিয়েছি। আরেকটি সন্তান নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে দূরদেশে এখনো চিকিৎসাধীন। আমার এই স্বজনহীন জীবনেও দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকব, দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না। প্রিয় দেশবাসীর প্রতি আমার আবেদন—আমাকে আপনাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হলেও বিশ্বাস করবেন আমি আপনাদের সঙ্গেই আছি।’ এমন উজাড় করা দেশপ্রেম আর এত শক্তিশালী কথা কজন বলতে পারেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ছাড়া আমার কোনো দেশ নেই, যাওয়ার জায়গা নেই। এ দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’ তিনি কথা রেখেছেন এবং তা কাজেও প্রমাণ করেছেন। তার শেষ নিঃশ্বাসও এ দেশের মাটিতেই ত্যাগ করেছেন।
গৃহবধূ থেকে সফল শাসক
বেগম খালেদা জিয়া দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন মোড়। সাধারণ গৃহবধূ থেকে সফল শাসক হয়ে ওঠা এত সহজ ছিল না। মুকুট পরা যতটা কঠিন, তা রক্ষা করা বহুগুণ কঠিন। খালেদা জিয়া নির্বাচনে দাঁড়িয়ে কখনো হারেননি। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন জেলার ১৮টি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচন করে সবকটিতেই তিনি জয়লাভ করেন। বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে খালেদা জিয়াই একমাত্র উদাহরণ, যিনি এযাবৎ চারটি সংসদীয় নির্বাচনে ১৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শতভাগ সফলতা অর্জন করেন। এর পেছনে রয়েছে অনেক ত্যাগ, সাধনা, অনেক রক্তক্ষরণ। হারিয়েছেন স্বামী ও সন্তানকে; সহ্য করেছেন স্বামী-সন্তানের অকাল মৃত্যুশোকও।
এই দেশের রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে সারা জীবন তাকে মানসিক নির্যাতন, অশান্তি, নানামুখী বিপর্যয় ও উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। শত ঘাত-প্রতিঘাত, হামলা-মামলা, সবরকম কটূক্তি আর বিদ্রুপ সহ্য করেছেন। কারো অরুচিকর অশালীন কথার কখনো কোনো প্রতিবাদ করেননি। সবকিছু সহ্য করেই তিনি সবার আগে দেশকে প্রাধান্য দিয়েছেন, দেশের মাটি আঁকড়ে থেকেছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব পালন ছিল এক ধারাবাহিক অধ্যায়—উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের অধ্যায়। তিনবার দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়; নেতৃত্ব মানে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতা। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অভিজ্ঞতা আর দৃঢ় ভূমিকা তাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান এবং ব্যক্তিগত জীবনের নির্লোভ অধ্যায় তাকে শুধু রাজনৈতিক নেত্রীই নয়, নৈতিকতার অবিচল প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। ক্ষমতা তার কাছে ছিল দায়িত্ব এবং গণতন্ত্র ছিল মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা কখনো মসৃণ কিংবা স্বস্তির ছিল না। প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কঠোরতা ও প্রতিহিংসার কারণে তিনি বহু বছর জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং কারাবাসের ভেতর দিয়ে গেছেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও তার চিকিৎসার বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্ক এবং শারীরিক জটিলতা তার পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তোলে।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনকথা কেবল একটি নামের ইতিহাসই নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের এক অনন্য উপাখ্যান। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন নারী চাইলে শুধু পরিবার নয়, সমগ্র জাতিকেও পথ দেখাতে পারেন। শুধু নেতৃত্ব নয়, একটি আদর্শের প্রতীকেও রূপ নিতে পারেন। বাংলার ইতিহাসের পাতায় তাই তার নাম থাকবে অবিচল, সংগ্রামের শিখায় উজ্জ্বল, সততার দীপ্তিতে দেদীপ্যমান এবং গণতন্ত্রের যাত্রাপথে এক অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে।
তিনি ছিলেন সেই নারী, যার পদচারণে বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতি, যার চোখের দৃঢ়তায় আমাদের তারুণরা খুঁজে পেয়েছিল মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শিক্ষা। তার রাজনীতি ছিল এক অবিরাম সংগ্রাম—শোক, কষ্ট ও ষড়যন্ত্রে ভরা এক বিস্তীর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র।
বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের এক অবিচল প্রতীক। তিনি দেখিয়েছেন, আপসহীনতা মানে শুধু বিরোধিতা নয়, বরং নীতির প্রতি অবিচল থেকে জনগণের পাশে দাঁড়ানো।
তিনি আজীবন মানুষের কথা, কল্যাণের কথা ভেবেছেন। সর্বশেষ সশস্ত্র বাহিনী দিবসের প্রোগ্রামই এর জীবন্ত উদাহরণ। নিজের শারীরিক অবস্থা এত নাজুক হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ মানুষের কথা ভাবতে কখনো ভুলে যাননি। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে ডেকে ভূমিকম্পে আহত মানুষের কথা জিজ্ঞেস করতে ভোলেননি।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক অনন্য প্রতীক। তিনি ছিলেন আপসহীন সংগ্রাম, সততা আর সাহসের এক বলিষ্ঠ নাম। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ে এই জাতি তার অবদান চিরকাল গভীর শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।
বন্দি জীবন, স্বামী হত্যার শোক, স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন, তিনবার প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং অসংখ্যবার কারাবাস—সবকিছু মিলিয়ে তার জীবন এক লিজেন্ডারি ইতিহাস। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন থাকা এবং গণমানুষের অধিকারের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়াই তাকে সর্বজনস্বীকৃত ‘আপসহীন দেশনেত্রী’তে পরিণত করেছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সমাপ্তি ঘটল নারীর ক্ষমতায়নের এক সফল অধ্যায়ের। পরিসমাপ্তি হলো এক মহাকালের। বাংলাদেশের মানুষ তাকে চিরদিন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করবে। যুগ থেকে শতাব্দী ধরে তিনি থেকে যাবেন মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়। আল্লাহ তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম নসিব করুন।