হোম > ফিচার > নারী

নীরব লুপাস রোগ : জটিলতা ও যত্ন

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

লুপাস (সিস্টেমিক লুপাস এরাইথেমাটোসাস—এসএলই) একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের সুস্থ কোষ ও অঙ্গকে আক্রমণ করে। এই রোগটি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সি নারীদের ক্ষেত্রে। বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ লুপাসে আক্রান্ত, যার প্রায় ৯০ শতাংশ নারী। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ১৫০ জন এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। দক্ষিণ এশীয় নারীদের মধ্যে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।

কেন নারীরা বেশি ঝুঁকিতে?

নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাব, জিনগত কারণ এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভিন্ন আচরণের কারণে লুপাসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যাদের পরিবারে লুপাস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা অন্যান্য অটোইমিউন রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি।

লুপাসের প্রধান কারণ

লুপাসের নির্দিষ্ট একক কারণ নেই। সাধারণত একাধিক কারণ মিলেই রোগটি সৃষ্টি করে—

  • জিনগত কারণ : পরিবারে অটোইমিউন রোগ থাকলে ঝুঁকি বাড়ে
  • হরমোনজনিত প্রভাব : বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন
  • পরিবেশগত কারণ : অতিরিক্ত সূর্যালোক (অতিবেগুনি রশ্মি), ভাইরাস সংক্রমণ ও ধূমপান
  • মানসিক চাপ : দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ
  • কিছু ওষুধ : নির্দিষ্ট রক্তচাপ বা খিঁচুনির ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

লুপাসের প্রকারভেদ

১. সিস্টেমিক লুপাস

এটি সবচেয়ে সাধারণ ও জটিল ধরন। এতে ত্বক, কিডনি, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুসসহ একাধিক অঙ্গ আক্রান্ত হয়।

২. কিউটেনিয়াস লুপাস

শুধু ত্বকে প্রভাব ফেলে। মুখে প্রজাপতি আকৃতির র‍্যাশ দেখা যায়।

৩. ওষুধজনিত লুপাস

কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের কারণে হয়। ওষুধ বন্ধ করলে অনেক সময় উপসর্গ কমে যায়।

৪. নবজাতক লুপাস

গর্ভবতী মায়ের অ্যান্টিবডির কারণে নবজাতকের শরীরে দেখা দিতে পারে।

নারীদের লুপাসের সাধারণ লক্ষণ

লুপাস ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং লক্ষণগুলো অনেক সময় অন্য রোগের মতো মনে হতে পারে—অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা; হালকা বা দীর্ঘমেয়াদি জ্বর; মুখ ও নাকে প্রজাপতি আকৃতির র‍্যাশ; জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা; চুল পড়া; মুখে ঘা; সূর্যের আলোতে ত্বক অতিসংবেদনশীল হওয়া; বুকব্যথা; শ্বাসকষ্ট; পা ফুলে যাওয়া (কিডনি সমস্যার লক্ষণ); এবং স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়া।

জটিলতা

চিকিৎসা না নিলে লুপাস শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে গুরুতর ক্ষতি করতে পারে—

কিডনি : লুপাস নেফ্রাইটিস, কিডনি বিকল

হৃৎপিণ্ড : প্রদাহ, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি

মস্তিষ্ক : খিঁচুনি, স্ট্রোক, মানসিক বিভ্রান্তি

ফুসফুস : ফুসফুসের আবরণে প্রদাহ ও শ্বাসকষ্ট

গর্ভাবস্থা : গর্ভপাত, গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ

রক্ত : রক্তশূন্যতা ও রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা

রোগ নির্ণয় যেভাবে করা হয়

লুপাস নির্ণয় প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। সাধারণত রোগ নিশ্চিত করার জন্য একাধিক পরীক্ষা একসঙ্গে করা হয়—

  • অ্যান্টিনিউক্লিয়ার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা
  • অ্যান্টি-ডিএস ডিএনএ পরীক্ষা
  • সম্পূর্ণ রক্ত গণনা পরীক্ষা
  • ইরাইথ্রোসাইট সেডিমেন্টেশন রেট / সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন
  • প্রস্রাব পরীক্ষা
  • কিডনি কার্যকারিতা পরীক্ষা
  • ত্বক বা কিডনি টিস্যু পরীক্ষা (প্রয়োজনে)

শুধু একটি পরীক্ষার ভিত্তিতে নয়, বরং লক্ষণ, শারীরিক পরীক্ষা ও ল্যাব রিপোর্ট মিলিয়ে রোগ নির্ণয় করা হয়।

হোমিও সমাধান

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির মূলনীতি হলো—‘রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা।’ অর্থাৎ একই রোগে ভুগলেও প্রত্যেক ব্যক্তির শারীরিক গঠন, মানসিক অবস্থা, উপসর্গের ধরন ও ওষুধের প্রতিকার-প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। তাই হোমিওপ্যাথিতে রোগের নামের ওপর নির্ভর না করে রোগীর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ভিত্তিতে ওষুধ নির্বাচন করা হয়।

লুপাস রোগীর ক্ষেত্রে ব্যথা, ক্লান্তি, ত্বকের সমস্যা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা প্রভৃতি বিবেচনায় অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ওষুধ নির্বাচন করে থাকেন। এ ধরনের ক্ষেত্রে আর্সেনিকাম অ্যালবাম, ব্রায়োনিয়া, রাস টক্সিকোডেনড্রন, সালফার, পালসাটিলা, লাইকোপোডিয়াম, নাক্স ভোমিকা, ক্যালকেরিয়া কার্বোনিকা, ফসফরাস, সেপিয়া, থুজা অক্সিডেন্টালিস, মেডোরিনাম, টারেন্টুলা হিস্পানিকা, সিলিসিয়া, বেলাডোনা, এপিস মেলিফিকা, মেরকিউরিয়াস সলুবিলিস, কালি মিউরিয়াটিকাম, কালি কার্বোনিকাম, কালি আরসেনিকাম, অ্যালুমিনা, কস্টিকাম, আর্নিকা মন্টানা, জেলসেমিয়াম, রিউমেক্স ক্রিসপাস, ইগ্নেশিয়া, স্ট্যাফিসাগ্রিয়া, ফাইটোলাক্কা, ক্যালকেরিয়া ফসফোরিকা, অ্যাসিডাম ফসফোরিকামসহ আরো অনেক ওষুধ লক্ষণ অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  • লুপাস একটি জটিল দীর্ঘমেয়াদি রোগ, তাই নিজে নিজে ওষুধ গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
  • শুধু রোগের নাম দেখে ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
  • অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • তীব্র উপসর্গ, যেমন কিডনি সমস্যা, বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

ঘরোয়া যত্ন ও জীবনধারা পরিবর্তন

চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনধারা পরিবর্তন রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।

সূর্য থেকে সুরক্ষা : সূর্য থেকে সুরক্ষার জন্য সূর্যরশ্মি প্রতিরোধকারী ক্রিম ব্যবহার করা, ছাতা ও ফুলহাতা পোশাক পরা এবং দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস : স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ, তাজা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া, কম লবণ ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্রাম ও ব্যায়াম : পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, নিয়মিত হালকা হাঁটা, যোগব্যায়াম বা স্ট্রেচিং করা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, নামাজ ও ধ্যান করা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা এবং মানসিক চাপ কমানোর কার্যক্রমে অংশ নেওয়া উপকারী।

ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার : ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এবং অ্যালকোহল ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এড়িয়ে চলা উচিত।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন

এ লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে—হঠাৎ তীব্র বুকব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত বা প্রস্রাবে সমস্যা, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথা বা গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ।

সচেতনতা ও প্রতিরোধ

লুপাস পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও আগেভাগে শনাক্ত করলে জটিলতা অনেক কমানো যায়। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে নারীদের মধ্যে এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এখনো কম। তাই দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, অজানা জ্বর, জয়েন্ট ব্যথা বা ত্বকের পরিবর্তনকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

পরিশেষে, লুপাস নারীদের জন্য একটি জটিল কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। সময়মতো রোগ নির্ণয়, নিয়মিত চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও মানসিক সহায়তা থাকলে অধিকাংশ নারী স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারেন। শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সচেতন হওয়াই লুপাস ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

কেমন কাটে গৃহিণীদের ঈদ

ঈদে নারীর ব্যস্ততা ও প্রস্তুতি

মাতৃত্ব ও পড়াশোনা

মায়ের স্নেহ, অক্লান্ত শ্রম ও সন্তানের দায়িত্ব

মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণা

দিবস আসে শ্রমিকদের ভাগ্য খোলে না

মে দিবস ও নারীশ্রমের মূল্য

ভার্মি কম্পোস্ট সার নিয়ে সুমির স্বপ্ন…

তীব্র গরমে নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয়

মাসুমার মাংসের আচার যাচ্ছে ১৭ দেশে