হোম > ফিচার > নারী

নারীর বিকাশ, উন্নয়ন ও সম্ভাবনা

সেলিনা শিউলী

‘আমি তোমাদের মধ্যে কোনো কর্মীর কর্মই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক বা নারী। তোমরা একে অপরের পরিপূরক।’ – সুরা আল ইমরান : ১৯৫

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। প্রায় ১ হাজার ৪৫০ বছর আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নারী জাতির মর্যাদা, অধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। নারীর শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু ইসলাম নয়, বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিও নারীর মর্যাদা ও সম্মানকে গুরুত্ব দিয়েছে, যা মানবসমাজে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

নারীকে আমরা দেখি কন্যা, স্ত্রী ও জননী—এই বহুমাত্রিক পরিচয়ে। পরিবার ও সমাজে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। একজন শিক্ষিত মা একটি জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমতার প্রশ্নে এখনো তাদের অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতন, হেনস্তা ও সহিংসতার ঘটনা এখনো আমাদের সমাজে বিদ্যমান। তাই নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করা আজ সময়ের দাবি। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন ছাড়া একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে নারীর শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষার্থীর হার যথাক্রমে প্রায় ৫০ শতাংশ ও ৫৩ শতাংশ। কলেজ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৪৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় নারী শিক্ষায় বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি। গার্মেন্ট শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে নারীর অবদান ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীর বিভিন্নমুখী পেশার মধ্যে বিশেষ করে চিকিৎসা, আইন ও কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও পুরুষদের তুলনায় এখনো তা কম দেখা যাচ্ছে। পুরুষের তুলনায় একজন নারী গৃহকর্ম, সন্তান লালনপালন, রান্নাবান্না, শিক্ষা ও পারিবারিক কাজসহ নানামুখী প্রায় ৪৫ ধরনের কাজে প্রতিদিন গড়ে ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে নারীর কাজের প্রকৃত মূল্য অনেক সময় পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না।

বাস্তবতা হলো, কলেজ পর্যন্ত শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ সন্তোষজনক হলেও কর্মক্ষেত্রে তা সমানভাবে প্রতিফলিত হয় না। বিভিন্ন সামাজিক বাধা, পারিবারিক দায়িত্ব, নিরাপত্তাহীনতা এবং বৈষম্যের কারণে অনেক শিক্ষিত নারী কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়েন। একটি দেশকে উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশের কাতারে নিতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীকে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নারীর অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।

নারীর ক্ষমতায়নের পথে কখনো কখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক মানসিকতা। অনেক ক্ষেত্রে নারী নিজেও নিজের ক্ষমতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন হন না। দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক শিক্ষা এবং প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের অনেক সময় নির্ভরশীল করে তোলে। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’—এই মানসিকতা নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত করে। পরিবারে মা-বাবা, ভাই, স্বামী বা সন্তানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নারীর আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়। পাশাপাশি সম্পত্তির অধিকার, শিক্ষা ও সচেতনতার ঘাটতিও নারীর অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে।

২০২৫ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীর সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি ৪২ লাখ। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে কোনো জাতির অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই নারীর আত্মনির্ভরতা ও ক্ষমতায়নের জন্য শিক্ষা, সচেতনতা এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখের বেশি নারী বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত। ফলে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আরো বাড়ানো বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কারণ নারীর শিক্ষা ও দক্ষতা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, গৃহস্থালি ও পারিবারিক কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হলে জিডিপিতে নারীর অবদান প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এটি জাতীয় উন্নয়নে নারীর প্রকৃত অবদানের একটি শক্তিশালী প্রমাণ।

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—এই তিন স্তরেই নারীর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানেও নারীর সম-অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ২৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সব ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে নারী-পুরুষের সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে।

তবে আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি। অনেক নারী এখনো তাদের অধিকার ও আইন সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হন। শ্রম আইনে নারী ও পুরুষের সমান মজুরির কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতার ঘটনাও ঘটে।

নারীর উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে নারীদের জন্য বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বয়স্ক ভাতা মাসিক ৬৫০ টাকা করা হয়েছে। স্বামী পরিত্যক্ত ও বিধবা নারীদের জন্য মাসিক ভাতা ৬৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। দরিদ্র নারীদের মাতৃত্বকালীন ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৫০ টাকা। এসব উদ্যোগ নারীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে অর্থনৈতিক চক্রের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতির কারণে জীবনমান চলমান রাখতে এ ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগী হলে এ গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

নারীবান্ধব সমাজ গঠনের জন্য কেবল আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়, বরং একটি নিরাপদ ও সচেতন সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। নারী যেন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং কর্মক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করতে পারে—এই পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

এ ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কন্যাশিশু যদি ছোটবেলা থেকেই নিজের অধিকার, আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয়, তাহলে সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বড় হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছেলে-মেয়েদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য কাউন্সেলিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।

সবশেষে কথা, নারীকে প্রথমে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। নারী যখন নিরাপদ পরিবেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাবে, সমাজে মর্যাদা লাভ করবে, তখনই প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই সমাজ তথা দেশকে এগিয়ে নিতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে একটি উন্নয়নশীল ও টেকসই সমাজ গড়তে নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ অপরিহার্য। নারীর শিক্ষা, দক্ষতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারী-পুরুষ উভয়কেই এগিয়ে আসতে হবে।

নারী যখন নিজের সম্ভাবনাকে চিনতে পারবে এবং মতপ্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পাবে, তখনই একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। নারীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক—এই প্রত্যাশায় গড়ে উঠুক এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।

লেখক : সাংবাদিক

কঠোর পরিশ্রমে বদলে গেল তানজিনার জীবন

গাজার নারীরা : যুদ্ধ, সত্য এবং মানবতার সাক্ষ্য

বিশ্ব নারী দিবসে নারী শিক্ষার্থীদের চাওয়া

কথায় আছে, বাস্তবে অদৃশ্য

বৈষম্যহীন বিশ্ব আর কত দূর

ভাষাকন্যাদের সাহসী ভাবনায় অবিনাশী একুশ

কেমন আছেন চীনের মুসলিম নারীরা

রমজানে সুস্থ দেহ ও প্রাণবন্ত মন

মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিলেন যারা

সেলিমার ‘হোমমেড’ থেকে ‘হোমব্র্যান্ড’