শুরুর দিকের চ্যালেঞ্জ
ইসরা মাহমুদ সাবা অরগানিক ও আয়ুর্বেদিক স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করেন। তার ব্র্যান্ডের প্রতিটি পণ্য সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত এবং প্রাকৃতিক ও আয়ুর্বেদিক উপাদানে তৈরি। তিনি শুধু বাজারে পণ্য আনতে চাননি, তিনি চেয়েছেন নিরাপদ বিকল্প তৈরি করতে। সে কারণেই প্রতিটি প্রোডাক্টের pH ব্যালেন্স পরীক্ষা করা হয়, যাতে তা ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। মান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা তার কাছে কেবল ব্যবসায়িক কৌশল নয়, নৈতিক দায়বদ্ধতা। তার লক্ষ্য স্পষ্ট— মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসম্মত ও ভরসাযোগ্য স্কিন কেয়ার সমাধান পৌঁছে দেওয়া।
পরিবার, বাধা ও মায়ের নীরব বিপ্লব
তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। পরিবারের অধিকাংশ সদস্য উচ্চপদে চাকরির সঙ্গে যুক্ত। তাদের দৃষ্টিতে ব্যবসা ছিল অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। তাই একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় যখন সাবা ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাকে নানা প্রশ্ন, সন্দেহ ও আপত্তির মুখোমুখি হতে হয়। তাকে বোঝানো হয়েছিল—‘ব্যবসা আমাদের পরিবারের জন্য নয়। এতে ঝুঁকি বেশি, স্থিরতা নেই, নিয়মতান্ত্রিক জীবন থাকে না, আর ক্ষতির আশঙ্কা সবসময় থাকে।’ শুরুর দিনগুলোয় তিনি নিজেই অরগানিক হেয়ার অয়েল তৈরি করতেন। পড়ালেখার পাশাপাশি প্রোডাক্ট তৈরি, পরীক্ষা, প্যাকেজিং—সব সামলাতে গিয়ে সময়ের চাপ তৈরি হতো। পরিবার এটিকেই বড় যুক্তি হিসেবে তুলে ধরত। অনেক সময় তার মনে হয়েছে, তার স্বপ্ন কেউ বুঝতে চাইছে না। কিন্তু নিজের প্রতি তার বিশ্বাস ছিল দৃঢ়। তিনি চেয়েছিলেন, নিজের সিদ্ধান্তে জীবন গড়তে, কারো অধীনে নয়।
এই কঠিন সময়ে তার পাশে দাঁড়ান একমাত্র তার মা। মা শুধু মানসিক সমর্থনই দেননি, নিজেই আয়ুর্বেদিক ও অরগানিক স্কিন কেয়ার নিয়ে বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করেন, যাতে প্রোডাক্ট তৈরির প্রক্রিয়া হয় বৈজ্ঞানিক ও নিরাপদ। বিনিয়োগ থেকে শুরু করে কাঁচামাল সংগ্রহ, ফর্মুলেশন, মান নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতে তিনি ছিলেন সক্রিয়। এক অর্থে ‘Mohini’ শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়, মা ও মেয়ের যৌথ স্বপ্নের নাম।
শুরুতে অনলাইনে পেজ খোলার অনুমতি না পেয়ে সাবা পরিচিত একটি পার্লারের মাধ্যমে প্রোডাক্ট সরবরাহ শুরু করেন। সেখানে ব্যবহারকারীরা ইতিবাচক ফল পেতে থাকেন। ধীরে ধীরে তৈরি হয় নিয়মিত গ্রাহক। এই বাস্তব ফলাফলই ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। পরে তার বাবা যখন দেখলেন প্রোডাক্টগুলো সত্যিই কার্যকর, তখন পার্লারে সরবরাহ দেওয়ার অনুমতি দেন; কিন্তু সাবার স্বপ্ন ছিল নিজের ব্র্যান্ড।
এইচএসসি সম্পন্ন করার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভাইয়ের সহযোগিতায় তিনি ফেসবুকে ‘Mohini’ নামে একটি বিজনেস পেজ চালু করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার অনলাইন যাত্রা।
উদ্যোক্তা হওয়ার উপলব্ধি
সাবার উদ্যোক্তা হওয়ার মূল কারণ ছিল স্বাধীনভাবে কাজ করার ইচ্ছা। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন চাকরির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অধীনে কাজ করতে হয়, যেখানে অনেক সময় নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ সীমিত থাকে। অন্যায় বা অনিয়ম দেখেও অনেক কর্মচারী নীরব থাকতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতা তাকে ভাবিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের ব্যক্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য নিজের সিদ্ধান্তে কাজ করার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি ভালো চাকরি পেতে দীর্ঘ শিক্ষাজীবন অতিক্রম করতে হয়। অনেকের বয়স ২৮ বা ২৯ হয়ে যায় স্থায়ী আয়ের সুযোগ পেতে। এই দীর্ঘ নির্ভরশীলতা তাকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। তাই ২০২৩ সালে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি সিদ্ধান্ত নেন উদ্যোক্তা হবেন।
অরগানিক পণ্য নিয়ে কাজ করার কারণ
অরগানিক ও আয়ুর্বেদিক স্কিন কেয়ার বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কেমিক্যালযুক্ত কিছু প্রোডাক্ট ব্যবহার করে তিনি নিজেই ত্বকের সমস্যায় পড়েছিলেন। চিকিৎসা নিয়েও প্রত্যাশিত ফল পাননি। পরে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু সচেতন করেনি, দায়িত্বশীলও করেছে। তিনি উপলব্ধি করেন, দেশের বহু নারী অজান্তেই ক্ষতিকর উপাদানের শিকার হচ্ছেন। তাই নিরাপদ বিকল্প তৈরি করা তার কাছে ব্যবসার চেয়ে বেশি সামাজিক দায়।
সিগনেচার প্রোডাক্ট ও আস্থার জায়গা
Mohini-র প্রতিটি প্রোডাক্ট হাতে তৈরি এবং মান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এর মধ্যে দুটি পণ্য বিশেষভাবে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেছে। অরগানিক হেয়ার অয়েল ৩৫টি প্রাকৃতিক উপাদান এবং ছয় ধরনের তেলের সংমিশ্রণে তৈরি। এর নিয়মিত ব্যবহার চুল পড়া কমিয়ে চুলের গোড়া মজবুত করতে সাহায্য করে। আয়ুর্বেদিক পেইনকিলার অয়েল সম্পূর্ণ আয়ুর্বেদিক উপাদানে তৈরি, যা বাতের ব্যথা, কোমরের ব্যথা ও অস্থিসংক্রান্ত অস্বস্তি কমাতে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে বয়স্ক গ্রাহকদের কাছ থেকে এটি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। এই দুটি পণ্যই ব্র্যান্ডটির আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
সাবার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্পষ্ট। বাংলাদেশের প্রত্যেক নারীর কাছে নিরাপদ, কেমিক্যালমুক্ত ও প্রাকৃতিক স্কিন কেয়ার পৌঁছে দেওয়া। তিনি চান নারীরা যেন সচেতনভাবে প্রাকৃতিক উপাদানে নিজেদের রূপচর্চা করতে পারেন এমন উপাদান দিয়ে, যা ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ ও পরীক্ষিত। তার দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন Mohini-কে বাংলাদেশের এক নম্বর নির্ভরযোগ্য অরগানিক ও আয়ুর্বেদিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।