ঈদ আয়োজন মানেই নারীদের হাজারো রকমের কাজ, বিশেষ করে গৃহিণীদের। আর কোরবানির ঈদে সে কাজ আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। গৃহিণীদের ঈদের দিনের বেশি সময় রান্নাঘরেই ব্যয় হয়। মাংস কাটা ও সংরক্ষণসহ অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা, রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার রাখা—সব মিলিয়ে ঈদের দিন যেন দম ফেলারই ফুরসত নেই। তাই আগে থেকেই পরিকল্পনা করে কিছু কাজ গুছিয়ে রাখলে ঈদের প্রস্তুতি নেওয়া অনেক সহজ হয়; এতে সময়ও বাঁচে, সারা দিনের চাপও কমে। এর ফলে ঈদের সব কাজ করা সহজে সম্পন্ন করা যায় আর ঈদের রান্নাও ঝটপট সেরে ফেলা সম্ভব হয়। কোরবানির ঈদে রান্নাঘরের প্রস্তুতি নিয়ে আজকের বিশেষ আয়োজন।
কোরবানির আগে কেনাকাটা
ঈদের ঝামেলাহীন আয়োজনে ঠিক কী কী জিনিস আপনার প্রয়োজন, প্রথমেই তা দেখে নিন। যেসব প্রয়োজনীয় জিনিস নেই, তা ভালোভাবে দেখে নিন। এবার তালিকা তৈরি করে ফেলুন। পছন্দের খাবার রান্নার জন্য যেসব উপকরণ দরকার, সেগুলো সব আছে কি না মিলিয়ে নিন। যেসব জিনিস নেই, সেগুলো তালিকা অনুযায়ী আগেই কিনে রাখুন।
কোরবানির মাংসের বিভিন্ন পদ রান্নার জন্য আগেভাগেই মসলার ভান্ডার সমৃদ্ধ রাখুন। অত্যাবশ্যকীয় মসলা, যেমন কাবাব মসলা এবং আস্ত অথবা গুঁড়া গরমমসলা কিনে রেখে দিন। হলুদ, মরিচ, তেজপাতা, গরমমসলা, গোলমরিচ, জায়ফল, শাহি জিরা, জয়ত্রী, পোস্তদানা, সয়া সস, তেল, টকদই এবং প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখুন। গুঁড়া মসলাগুলো আলাদা আলাদা কৌটায় নাম লিখে গুছিয়ে রাখুন।
বিভিন্ন ধরনের মিক্স মসলা, যেমন বিরিয়ানির জন্য মসলা বা চটপটির মসলা আগেই গুঁড়া করে নিয়ে আলাদা আলাদা কৌটায় রেখে দিন। গোটা গরমমসলা, যেমন এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা প্রভৃতি সংগ্রহ করে আলাদা কৌটায় রেখে দিন। তালিকা অনুযায়ী এসব মসলা বাজার থেকে কিনে রোদে শুকিয়ে কৌটায় তুলে রাখুন।
ঈদের বেশ কয়েক দিন আগেই পোলাওয়ের চাল, মাংসের মসলা, টকদই, সেমাই ইত্যাদি শুকনা বাজার করে রাখুন।
তাছাড়া বাসার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ তো আছেই। কোরবানি-পরবর্তী দিনগুলোয় বাসা পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্লিচিং পাউডারসহ পরিষ্কারক ও জীবাণুনাশক দ্রব্য কিনে রাখুন।
আগে গুছিয়ে রাখবেন যেসব কাজ
পশু জবাইয়ের পর বণ্টন ও সংরক্ষণের জন্য মাংস কাটা, প্যাকেট করাসহ রান্নার আয়োজন—সব কাজের প্রায় পুরোটাই হয় রান্নাঘরে। এ কারণে রান্নাঘর আগে থেকেই গুছিয়ে রাখতে হবে, যেন ঈদের দিন কাজ করার সময় কোনো ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে না হয়। সবকিছু এমনভাবে গুছিয়ে রাখতে হবে, যেন কাজের সময় প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম হাতের নাগালেই পাওয়া যায়।
মাংস রাখার জন্য পর্যাপ্ত পলিথিন বা অন্যান্য সামগ্রীর জোগান রাখুন। পলিব্যাগ জোগাড় করে নিন। কোরবানির মাংস বিলাতে পলিব্যাগের প্রয়োজন হবে। মাংস সংরক্ষণের জন্য পলিব্যাগ ও জিপলক ব্যাগ আগে থেকেই সংগ্রহ করে হাতের কাছে রাখুন। আত্মীয়স্বজন ও গরিব-দুঃখীকে দেওয়ার পর ফ্রিজে মাংস সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হবে। তাই ফ্রিজ যতটা সম্ভব খালি করে রাখতে হবে। আগের জমানো খাবারগুলো রান্না করে ফেলুন। ফ্রিজ পরিষ্কারের কাজটাও সেরে নিন।
যেসব কাজ এগিয়ে রাখবেন
কোরবানির সময় মাংস রান্নার জন্য বড় পাতিলের প্রয়োজন হয়। বড় পাতিলগুলো পুরো বছর আর তেমন প্রয়োজন পড়ে না। তাই ময়লা হয়ে থাকতে পারে। ঈদের আগেই পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখুন।
রান্নার কাজে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ওভেন, রাইস কুকার, ব্লেন্ডার ও ফুড প্রসেসর—এসব পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখুন। রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় হাঁড়িপাতিলগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করে রাখুন।
মাংস কাটার জন্য যেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে, যেমন দা, বঁটি, ছুরি—এসব পরিষ্কার করে রাখুন আগেই। এগুলোর ধার পরীক্ষা করে প্রয়োজনে আগে থেকেই কাউকে দিয়ে ধার করিয়ে নিন, যাতে ঈদের দিন কোনো রকম ঝামেলা না হয়। এসব বাচ্চাদের নাগালের বাইরে নিরাপদ স্থানে রেখে দিন।
তৈরি থাক মসলাপাতি
ঈদের দিনের অন্যতম অংশ হলো রান্না। কোরবানিতে মাংসের বিভিন্ন পদ তৈরি হয়। তার জন্য দরকার মসলাপাতি। রান্নার কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়, যদি আগে থেকে কিছু কাজ সেরে রাখা হয়। যেমন—রান্নার জন্য যেসব মসলাপাতি দরকার, তা আগে থেকে গুছিয়ে বা তৈরি করে রাখতে পারেন। যেসব মসলা গুঁড়া করা দরকার, সেগুলো গুঁড়া করে, যেগুলো বেটে রাখা দরকার, সেগুলো বেটে কিংবা ব্লেন্ড করে রাখতে পারেন। এতে প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে সব মসলা পেয়ে যাবেন। রান্না অনেকটাই সহজ ও স্বস্তিদায়ক হবে।
* ঈদের আগেই মাংসের জন্য পেঁয়াজ-রসুন কেটে রাখুন। আদা, পেঁয়াজ, রসুন ও জিরা আগে থেকেই বেটে বা ব্লেন্ড করে নিন। একসঙ্গে অনেক বাটা মসলা রাখলে পরে পরিমাণমতো নেওয়া মুশকিল হতে পারে। তাই ব্লেন্ড করা ভেজা মসলা ছোট ছোট বক্সে বা আইস বক্সে রেখে বরফ করে নিন। এরপর সেগুলো জিপলক ব্যাগ বা পলিব্যাগে রেখে দিতে পারেন। এতে প্রয়োজনের সময় দু-একটি মসলার কিউব দিয়ে সহজেই রান্না করা যায়। গরমমসলাও কিনে হাতের কাছে রাখুন।
* কোরবানির গোশত দিয়ে অনেকেই চালের আটার রুটি খেতে পছন্দ করেন। আবার অনেকে মাংস দিয়ে পিঠা তৈরি করে খেতে ভালোবাসেন। সে ক্ষেত্রে আতপ চাল কিনে মেশিনে গুঁড়া করে নিন। এরপর প্যাকেট করে ডিপ ফ্রিজে রাখুন।
* গরু বা খাসির পা দিয়ে নেহারি কিংবা স্যুপ খেতে অনেকেই পছন্দ করেন। তাই এটা তৈরির মসলা, যেমন শাহি জিরা, পোস্তদানা, জায়ফল, জয়ত্রী ও সাদা গোলমরিচ লাগবে। স্যুপ রান্নার সময় এসব মসলা পাটায় বেটে কেবল মিশিয়ে দিলেই হবে।
* আগেই ডিপ ফ্রিজ পরিষ্কার করে নিন। আত্মীয়স্বজন ও গরিব-দুঃখীকে দেওয়ার পর আপনার ভাগের মাংসগুলো অনায়াসেই ফ্রিজে রাখতে পারেন। এসব কাজ কোরবানির ঈদের বেশ আগে থেকেই একটু একটু করে গুছিয়ে নিলে ঈদের দিনে ঝামেলা কম হয়।
আগাম রান্নাবান্না
কোরবানির আগেই নিজেরা খাওয়ার জন্য বা অতিথি আপ্যায়নের জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা আগেই করে ফেলতে পারেন। ঈদের আগের দিনই কিছু মিষ্টি খাবার রান্না করে ফেলতে পারেন। বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন যেমন—পায়েস, সেমাই, শাহি টুকরা ইত্যাদি আগের দিন রাতেই বানিয়ে নরমাল ফ্রিজে রাখতে পারেন। ফ্রিজে রেখে দিলে ঈদের দিন খেতে খুব ভালো লাগবে। সেই সঙ্গে রান্নার ঝামেলাও কমে যাবে।
বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের জন্য চা পরিবেশন করার রীতি রয়েছে। বারবার চা তৈরি করতে গেলে অন্য কাজে দেরি হতে পারে। সেজন্য চাইলে আগেই বেশি করে চায়ের লিকার তৈরি করে ফ্লাস্কে রেখে দিতে পারেন। তাহলে ঈদের দিন সকালে কাজ কম থাকবে। কোরবানির মাংস রান্নার বড় কাজ তো রয়েছেই। তাই অন্যান্য রান্না যতটা সম্ভব আগের রাতেই কমিয়ে রাখবেন।
আরো কিছু টিপস
১. ঈদের রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় মসলাগুলো আগেই প্রস্তুত করে রাখুন। মসলাগুলো হাতের কাছেই সাজিয়ে রাখুন। মাংসের মসলা, বিরিয়ানির মসলা, চটপটির মসলা—এভাবে আলাদাভাবে মিশিয়ে রাখতে পারলে আরো ভালো হয়। তাহলে কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
২. ঈদে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যেমন ছুরি, বঁটি, দা, কাঁচি, চপার বোর্ড, হাঁড়িপাতিল—সব গুছিয়ে রাখুন।
৩. ঈদে মেহমানের জন্য অনেকগুলো কাপ-পিরিচ, প্লেট ও বাটি প্রয়োজন হয়। এগুলো এক দিন আগেই ধুয়ে-মুছে প্রস্তুত করে রাখুন। এতে ঈদের দিন বাড়তি ঝামেলা কম হবে।
৪. ঈদের দিন যে মাংসগুলো রাঁধবেন, সেগুলো আগেই ধুয়ে পানি ঝরিয়ে টুকরা করে ফ্রিজে রেখে দিন। প্রয়োজনে আগের দিন রাতে মেরিনেট করে রাখতে পারেন। এতে ঈদের দিন রান্না হতে সময় কম লাগবে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
কোরবানির সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এ সময় কোরবানিকৃত পশুর রক্ত ও বর্জ্য জমে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে ছড়াতে পারে বিভিন্ন রোগজীবাণুও। তাই আগে থেকেই এসব বর্জ্য পরিষ্কারের ব্যবস্থা করে রাখুন। পশু জবাইয়ের পর যেন বর্জ্য জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন ও সতর্ক থাকুন।