হোম > ফিচার > নারী

কঠোর পরিশ্রমে বদলে গেল তানজিনার জীবন

মো. মাসুদ হোসেন

আমাদের দেশের নারীদের গল্প যেন একেকটি সংগ্রামের আখ্যান। কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে হয়েছেন সফল, কেউ টেনে তুলেছেন বিপর্যস্ত পরিবারকে। আবার কেউ কেউ ঝুঁকি জেনেও বিনিয়োগ করে পেয়েছেন সাফল্য। তেমনি একজন নারী তানজিনা হক। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌরশহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এ নারী নিজের জমানো দুই হাজার টাকা নিয়ে শুরু করেন শখের ব্যবসা। নিজের স্বপ্ন ও স্বাধীনতা বাস্তবে রূপ দিতেই নেমে পড়েন চ্যালেঞ্জে। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে তানজিনা। এসএসসির আগেই তার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের কয়েক বছর পরে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নেমে পড়েন মাঠে। নারীদের পোশাক দিয়ে শুরু করা ব্যবসার প্রথমে পরিবারসহ আশপাশের মানুষের অসহযোগিতা ও সমালোচনায় বন্ধ হয়ে যায় তার উদ্যোগ। কিন্তু তিনি হাল না ছেড়ে আবারও দুই হাজার টাকায় শুরু করেন হোমমেড খাবারের ব্যবসা। তিন সন্তানের এ জননী নিজের হাতে তৈরি সমুসা, শিঙাড়া, মাষকলাইয়ের ডাল ও আলুর চিপস বিক্রি করা শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি একটি পেজ খোলেন। ‘Tanjina’s UnonGhor’ নামে এই পেজের মাধ্যমে আসতে থাকে খাবারের অর্ডার। একসময় এ খাবারগুলো হয়ে ওঠে তার সিগনেচার পণ্য।

পারিবারিকভাবে হোঁচট খাওয়া এ নারী উদ্যোক্তার পক্ষে তার খাবারের ব্যবসাটিও চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে তিনি মনোবল হারাননি, নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে থেমে থাকেননি। একসময় তার এসব হোমমেড পণ্য নিজ জেলার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছাতে থাকে। একপর্যায়ে প্রবাসীরা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে তানজিনার হাতে তৈরি এসব পণ্য বিদেশেও নিয়ে যান। খুব অল্প সময়ে ক্রেতাদের ভালো সাড়া পান তানজিনা। এর মধ্যে পোশাক নিয়ে কাজ করা তার আগের ব্যবসাটিও আবার চালু করেন। এ ব্যবসাটি পরিচালনা করার জন্য ‘Trendy Butterfly Fashion House’ নামে ফেসবুকে আরেকটি পেজ খোলেন তিনি। তানজিনার ধারণামতে, উদ্যোক্তা হওয়া শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, বরং নিজের পরিচয় তৈরি করা ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখারও একটি কারণ। তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুটা আমার জন্য সহজ ছিল না। পারিবারিকভাবে প্রথম দিকে তেমন কোনো উৎসাহ বা সমর্থন পাইনি। তখন পথচলাটা একাই শুরু করতে হয়েছিল। তবে সেই সময়টাতে সফল নারী উদ্যোক্তা মুসকান নূর, নাসরিন আক্তার ও বৃষ্টি আমাকে মানসিকভাবে এবং বিভিন্ন দিক থেকে অনেক সাহস ও সাপোর্ট দিয়েছে। তাদের অনুপ্রেরণা, ভরসা আর পাশে থাকার মানসিকতা আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়। তাদের পাশাপাশি যাদের হাত ধরে আমার পথচলা শুরু হয়েছিল—WE Reloaded (Women and e-Commerce Trust) এবং Ladies Smile (Chandpur Girls’ Group)। ধীরে ধীরে যখন আমার কাজ এগোতে শুরু করল এবং সবাই আমার চেষ্টা ও আন্তরিকতা দেখতে পেল, তখন আমার পরিবার ও বন্ধুবান্ধব আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন তারা আমাকে সমর্থন করে এবং উৎসাহ দেয়। তারা আমার স্বপ্নপূরণে পাশে আছে।’

তানজিনা হক তার প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর শারীরিক শ্রমকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন তার নিজ গতিতে। প্রথমদিকে তিনি তার অর্ডারগুলো নিজেই গিয়ে কাস্টমারের কাছে ডেলিভারি দিয়ে আসতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি স্থানীয়ভাবে অর্ডারগুলো পৌঁছানোর জন্য একজন ডেলিভারি ম্যান নিয়োগ দেন। আর দূরের অর্ডারগুলো কুরিয়ারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মাত্র দুই হাজার টাকা মূলধনে এখন তার পুঁজি ১৫ লাখের মতো। তার আয় দিয়ে চলছে সাত সদস্যের পরিবার। এমনকি নিজের সকল খরচও ব্যয় হচ্ছে এই আয় দিয়ে। তার এই উদ্যোগ নিয়ে দেশের নামিদামি মেলায় অংশগ্রহণ করার পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় ‘উই হাটবাজার’ নামে দুটি নারী উদ্যোক্তা মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া এই নারী উদ্যোক্তা অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও ভূমিকা রাখতে পাঁচ মাস আগে কুমিল্লার প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করেন, যা তিনি নিজেই পরিচালনা করে আসছেন। উদ্যোক্তা লাইফে তার এমন চেষ্টা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তিনি দেখিয়েছেন চেষ্টা থাকলে নারীদেরও সমাজে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। চলতি বছরে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ‘অদম্য নারী (জয়িতা)’ পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। তার এই উদ্যোগটি এখন Ministry of Commerce, Bangladesh-এ নিবন্ধনপ্রাপ্ত।

নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া নারী উদ্যোক্তা তানজিনা হক বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শেষ করে নিজের কিছু করা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। কিন্তু পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে আমার পড়ালেখা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও নিজের ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে ভরসা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প করি। ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনভাবে চলা এবং নিজের মত প্রকাশ করার প্রবল ইচ্ছা ছিল, আর সেই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়েই আমার উদ্যোক্তা জীবনের পথচলা শুরু। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নিজেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং স্বনির্ভরতা অর্জন করা, যাতে ভবিষ্যতের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারি। পাশাপাশি উদ্যোক্তা হলে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, যা সমাজ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। তাই উদ্যোক্তা হওয়া শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, বরং নিজের পরিচয় তৈরি করা ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখারও একটি কারণ।’

তিনি আরো বলেন, ‘গত ছয় বছর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সবার দোয়া-ভালোবাসায় ব্যবসা করে যাচ্ছি। যদিও শুরুতে অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। অনেকেই বলত, ‘অমুকের মেয়ে বা বউ ফেসবুকে খাবার বিক্রি করছে।’ পরিবারের ভেতর থেকেও তখন অনেক কথা শুনতে হয়েছে এবং নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সেই কথাগুলো আমাকে কষ্ট দিলেও আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মানুষের কথায় থেমে থাকব না। আমি জানতাম, জীবনে এগিয়ে যেতে হলে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। উদ্যোক্তা হিসেবে ছয় বছর কাটানো আমার জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ওই সময়টা আমার জন্য একদম সহজ ছিল না, অনেক চ্যালেঞ্জ এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে আমাকে পড়তে হয়েছে। সেই থেকে শুরু হয় নিজের ক্ষমতা পরীক্ষা করার এক যাত্রা।

শুরুতে নানা বাধা, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করতে হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং সঠিক সমর্থনের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। একটা জেদ সবসময় মাথায় কাজ করত—‘আমরা নারী আমরাই পারি’ এবং আমাকে পারতে হবে। তবে প্রথম বড় অর্ডারটি সফলভাবে ডেলিভারি করতে পেরে খুব আনন্দিত হয়েছিলাম। তখনই নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। আমি নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছি, তেমনি অন্যদেরও উৎসাহ দিচ্ছি। ভবিষ্যতে ব্যবসাকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই। আমার সঙ্গে আরো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। আর মেয়েদের বলব, ‘কোনো কাজই ছোট নয়, ভয় পেয়ে বসে থাকলে চলবে না; পরিশ্রম করতে হবে, লেগে থাকতে হবে—তবেই সফলতা আসবে।’

গাজার নারীরা : যুদ্ধ, সত্য এবং মানবতার সাক্ষ্য

নারীর বিকাশ, উন্নয়ন ও সম্ভাবনা

বিশ্ব নারী দিবসে নারী শিক্ষার্থীদের চাওয়া

কথায় আছে, বাস্তবে অদৃশ্য

বৈষম্যহীন বিশ্ব আর কত দূর

ভাষাকন্যাদের সাহসী ভাবনায় অবিনাশী একুশ

কেমন আছেন চীনের মুসলিম নারীরা

রমজানে সুস্থ দেহ ও প্রাণবন্ত মন

মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিলেন যারা

সেলিমার ‘হোমমেড’ থেকে ‘হোমব্র্যান্ড’