হোম > ফিচার > নারী

কেমন কাটে তাদের জীবন ও ঈদ

বিউটি হাসু

পথ চলতে গিয়ে তাদের দেখে একটু থামতে হয়। কী নিষ্পাপ মায়াবী চেহারা! বলছি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা। যে বয়সে তাদের কাঁধে ব্যাগে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে তারা কাঁধে তুলে নিয়েছে সংসারের জোয়াল, রোজগার করার গুরুদায়িত্ব। এদের মধ্যে কেউ বিক্রি করছে হাওয়াই মিঠাই, কেউ রঙবেরঙের বেলুন, আবার কেউ ফুলের মালা। ঈদ নিয়ে আমাদের এত আনন্দ-উচ্ছ্বাস! এর ছিটেফোঁটাও আনন্দ কি তাদের স্পর্শ করে? কেমন কাটে তাদের জীবন ও ঈদ।

রাজধানী ঢাকা শহরের পরতে পরতে উন্নয়ন ও প্রগতির ছোঁয়া! অথচ সেই শহরের রাজপথে, অলিগলিতে লুকিয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতা। বিভিন্ন উদ্যান, পার্ক ও ফুটপাতগুলোই অনেক দরিদ্র শিশুর জন্য ঘর, আশ্রয়স্থল এবং জীবনে টিকে থাকার লড়াইয়ের মঞ্চ।

যে বয়সে তাদের পরিবার আর বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সে বয়সে তারা পথে পথে আর খোলা আকাশের নিচে প্রতিনিয়ত বাঁচার লড়াই করে যায়। তারা বেড়ে ওঠে নানা অবহেলা আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। এদের মধ্যে অধিকাংশ শিশুর নিজস্ব কোনো পরিবার নেই।

পরিবারের স্নেহবঞ্চিত এসব শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। খাবারের জন্য লড়াই করা, ফুটপাতে ঘুমানো আর বৃষ্টি হলে দোকানের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া—এসবই তাদের নিত্যদিনের ঘটনা। ঢাকার ফুটপাত ও বস্তিতে বসবাসকারী বেশিরভাগ শিশুই সারা দিন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকে। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ বেলুন বিক্রি করে, কেউ বিক্রি করে হাওয়াই-মিঠাই। আবার কেউ গাড়ির কাচ পরিষ্কার করে, কেউ বোতল বা কাগজ কুড়ায় এবং কেউবা ভিক্ষার আশ্রয় নেয়।

তারা পরিবার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের জীবনযাত্রা নিরাপত্তাহীন ও অনিশ্চিত। অনেক পথশিশুই নানা ধরনের শোষণ, নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়। এসব শিশুর বেশির ভাগের জন্ম হয়েছে দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে। তার ওপর এদের কেউ বাবাহারা, কেউ মা-হারা, আবার কেউ বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছে।

এমনই কয়েকজন শিশুর সঙ্গে কথা হয় জিয়া উদ্যান ও মিরপুর ১০ নম্বরে। আমির হামজা, বয়স আট বা ১০ হবে। শেওড়াপাড়ায় থাকে। বাবা নেই, মা হাওয়াই মিঠাই বানায়। সে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে, স্কুলে যায় না। তারা দুই ভাই, দুই বোন। ভাই তার বড় এবং বোন দুটি ছোট। বড় ভাই কখনো অটোরিকশা চালায়, কখনো হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে। ছোট বোন দুটি স্কুল ও মাদরাসায় পড়ে বলে আমির হামজা জানায়। বড় ভাই দেশে গেছে। আজ তার বিক্রি ভালো হয়নি। সে চাল কিনে দেওয়ার আবদার করে। তা না হলে তাদের রাতে না খেয়ে থাকতে হবে বলে সে জানায়।

কথা হয় আজাদের সঙ্গে। সে বেলুন বিক্রি করে। মায়ের সঙ্গে সে আদাবর শেখেরটেক এলাকায় থাকে। তার বাবা নেই, মা অন্যের বাসায় কাজ করেন। ছোট ভাই স্কুলে যায়। তার পড়ার ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ নেই বলে জানায়। আসন্ন কুরবানির ঈদ ঢাকায় করবে। রোজার ঈদে সেমাই আর নুডলস খেয়েছিল। কোরবানি ঈদ সম্পর্কে বলে, ‘আল্লাহ যেমনভাবে করাবেন, সেভাবেই ঈদের দিন কাটবে।’

আলীর বাবা নেই। মা কোথায় আছেন সে জানে না। আলীর মা তাকে আর ছোট ভাইটিকে রেখে চলে গেছেন। আলী আর তার ছোট ভাই বৃদ্ধ নানির সঙ্গে মহাখালী থাকে। সেখান থেকে বাসে করে জিয়া উদ্যানে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করতে এসেছে। কোনো বিক্রি হয়নি। একজন এমনিই ১০ টাকা দিয়েছেন; এটাই তার সেদিনের উপার্জন।

রোজার ঈদ আলীর রাস্তায় কেটেছে বলে জানায়, ভালো খাবার কপালে জোটেনি। তার সঙ্গে ফুলের মালা হাতে পাশে এসে দাঁড়ায় মিরাজ। সে ফুলের মালা বিক্রি করে। কেউ তার মালা কেনেনি বলে সে জানায়। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা।

ফেরদৌসের বাড়ি হবিগঞ্জ। বেশ হাসিখুশি স্বভাবের। সে আগারগাঁওয়ে থাকে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তার স্কুলের নাম ’মজার স্কুল’। সে স্কুল শেষে বিকালে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে। রোজার ঈদ কেমন কেটেছে—জানতে চাইলে সে বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ কী খেয়েছিল, তা জানতে চাইলে বলে, ‘গরিব মানুষ, আর কী খামু! মা সেমাই রানছিল, তাই খাইছি। কোরবানি ঈদ, আল্লাহ যা ভাগ্যে রাখছে, সেভাবে হবে।’

আলামিন শেওড়াপাড়ায় থাকে। বাবা অসুস্থ। মা অন্যের বাসায় কাজ করেন। তার একটি ছোট বোন রয়েছে। সে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে। কয়েক দিন ধরে বিক্রি খুব খারাপ বলে জানায়। তার গ্রামের বাড়ি ভোলা।

প্রিয়া থাকে মিরপুর ১৪ নম্বরে। তার মা অসুস্থ, বাবা নেই। সে তার দুই বান্ধবী সোনিয়া ও তানিয়াসহ ভিক্ষা করতে এসেছে। ভিক্ষা করা ভালো নয় বলায় সে জানায়, দুপুরে কিছু খায়নি। এক দোকানদার একটি পাউরুটি দিয়েছেন। সন্ধ্যার দিকে সেটাই বন্ধুদের সঙ্গে বসে খেতে দেখা যায়।

পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এই করুণ বাস্তবতা শুধু তাদের জীবনের গল্প নয়, বরং আমাদের সমাজের এক গভীর ক্ষত। ঈদ বা যেকোনো উৎসবে যখন আমরা আনন্দের জোয়ারে ভাসি, তখন এই নিষ্পাপ মুখগুলোর যন্ত্রণাকাতর মলিন হাসি আমাদের মানবিকতাকে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। ঈদের আনন্দ সবার জীবনে সমানভাবে ধরা দেয় না। যেখানে একদল মানুষ নতুন পোশাক, ভালো খাবার আর পরিবারের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে, সেখানে অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশু প্রতিদিনের মতোই টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত থাকে।

অনেক পথশিশু নানা ধরনের শোষণ, নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়। তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত, পাচারের শিকার কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এ সবকিছুই তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শিক্ষার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। এসব দেখার কেউ নেই। এদের সহায়তায় সাধ্যমতো সবার এগিয়ে আসা উচিত।

আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। সমাজের একটি অংশ অবহেলিত ও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই সরকারিভাবে এদের দিকে সুদৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। এসব শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা আবশ্যক। তারা যেন সমাজের অন্য শিশুদের মতো সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

তাদের চোখেও স্বপ্ন আছে, আছে সুন্দর জীবনের আকাঙ্ক্ষা। দারিদ্র্য, অবহেলা আর নিরাপত্তাহীনতা সেই স্বপ্নগুলো প্রতিনিয়ত ম্লান করে দেয়। অটুট থাকুক তাদের মুখের নির্ভেজাল হাসি। তাদের মৌলিক অধিকার ও সুস্থ শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া কেবল দয়া বা সহানুভূতির বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং নাগরিক হিসেবে আমাদের অন্যতম কর্তব্য।

শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ। আগামীর বাংলাদেশকে একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন রূপ দিতে হলে এই অবহেলিত শিশুদের পুনর্বাসন ও শিক্ষার আলো নিশ্চিত করে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।

ত্যাগের মহিমায় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা

কেমন কাটে গৃহিণীদের ঈদ

ঈদে নারীর ব্যস্ততা ও প্রস্তুতি

নীরব লুপাস রোগ : জটিলতা ও যত্ন

মাতৃত্ব ও পড়াশোনা

মায়ের স্নেহ, অক্লান্ত শ্রম ও সন্তানের দায়িত্ব

মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণা

দিবস আসে শ্রমিকদের ভাগ্য খোলে না

মে দিবস ও নারীশ্রমের মূল্য

ভার্মি কম্পোস্ট সার নিয়ে সুমির স্বপ্ন…