হোম > সাহিত্য সাময়িকী > প্রবন্ধ

মুসলিমদের জ্ঞানচর্চার কাঠামোগত প্রতিষ্ঠা

বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়

মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন

জ্ঞানই শক্তি—মানবসভ্যতার এই চিরন্তন সত্যটি সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে। আজকের বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষাগ্রহণের স্থান নয়; এটি জ্ঞান উৎপাদন, চিন্তার বিকাশ ও সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সূচনা কোথায়, কবে এবং কীভাবে এই প্রশ্ন আমাদের ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যায়। সেই অনুসন্ধানে আমরা পৌঁছে যাই উত্তর আফ্রিকার মরক্কোর প্রাচীন শহর ফেজে, যেখানে অবস্থিত জামেয়াতুল কারউয়্যিন—বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান।

নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে, মানবিক প্রেরণা ও ধর্মীয় চেতনা থেকে জামেয়াতুল কারউয়্যিন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ফাতিমা আল-ফিহরি ছিলেন একজন ধনী ও শিক্ষানুরাগী নারী। তিনি বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ ব্যয় করে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি শুধু ইবাদতের স্থান নির্মাণে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি এমন একটি কেন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ একদিকে আল্লাহর ইবাদত করবে, অন্যদিকে জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করবে। এই লক্ষ্য থেকেই মসজিদটি ধীরে ধীরে শিক্ষা কার্যক্রমের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

সময়ের প্রবাহে আল-কারউয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানে কোরআন-হাদিসের পাশাপাশি আরবি ভাষা, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো নানা বিষয়ে পাঠদান হতো। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের এই প্রতিষ্ঠানটি মুসলিম বিশ্ব ও ইউরোপের মধ্যে জ্ঞান এবং সংস্কৃতির আদান-প্রদানের এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবেও ভূমিকা রেখেছিল।

এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইতিহাসের বহু খ্যাতিমান মনীষীর নাম জড়িয়ে আছে। ইবনে খালদুনের মতো সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ, ইবনে রুশদের মতো দার্শনিক, মোহাম্মদ আল-ইদ্রিসির মতো বিশ্ববিখ্যাত ভূগোলবিদ, তারা সবাই এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রসারিত ও সংস্কার হয়েছে। এর স্থাপত্যে যুক্ত হয়েছে বিশাল নামাজকক্ষ, শিক্ষাকক্ষ ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। এখানকার গ্রন্থাগারটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন কার্যকর লাইব্রেরি হিসেবে পরিচিত। এখানে সংরক্ষিত বহু পাণ্ডুলিপি মানবসভ্যতার অমূল্য জ্ঞান-ঐতিহ্য বহন করে।

বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো, ধারাবাহিক কার্যক্রম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইউনেসকো এবং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড আল-কারউয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৬৩ সালে মরক্কো সরকার এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠন করে আধুনিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেয়। তবে এর ঐতিহ্য ও ধর্মীয় শিক্ষার ধারা এখনো অব্যাহত আছে এবং অতীত ও বর্তমানের এক সুন্দর সমন্বয় গড়ে তুলেছে।

আল-কারউয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস ও হাজার বছরেরও বেশি সময়ের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারাবাহিক বাহক।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

খালেদ ইবনে ওয়ালিদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা

মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থাপনা

জুলাই ও ইকবাল

বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নির্মাণে মুস্তাফা জামান আব্বাসী

পশ্চিমের সংকীর্ণতা ও দ্বিধা

নতুন যুগের আলোয় খুঁজি (শেষ পর্ব)

বাংলার বৈশাখের গান

বাঙালি জাতিসত্তার উপাদান: রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব, প্রগতি ও ইসলাম

খেলাফতে রাশেদার শাম অভিযান

গালির মনস্তত্ত্ব ও জেন-জির ভাষা-বিদ্রোহ-সংস্কৃতি