আল মুজাহিদীর শেষ সাক্ষাৎকার
গত ১৯ জুন ২০২৬, শুক্রবার, কবি আল মুজাহিদী ইন্তেকাল করেছেন। এর প্রায় এক বছর আগে, ৩০ জুলাই ২০২৬, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কবির এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিল। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ আজ ছাপা হলো। সবটুকু পড়া যাবে আমার দেশ অনলাইনে সাহিত্য সাময়িকী বিভাগে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাকির আবু জাফর
দেশ কোন দিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে আপনার এবং কোন পথে যাবে বলে মনে করেন? (তখন ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট ক্ষমতায়)
আল মুজাহিদী : দেশ কোন দিকে যাবে, এটি নির্ভর করছে দেশে ঘষেটি বেগমেরা কেমন আছে তার ওপর! ঘষেটি বেগমেরা যদি যত্রতত্র জেঁকে থাকে, তবে চিন্তার বিষয় আছে! জুলাই বিপ্লবের পরও যদি ঘষেটি বেগমেরা অক্ষত থাকে বা তাদের দৌরাত্ম্য আগের মতোই থাকে, তবে তা দেশের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
জুলাই বিপ্লবের কথা বললেন, কোনো স্মৃতি কি মনে আছে জুলাই বিপ্লবের?
আল মুজাহিদী : জুলাই বিপ্লবের স্মৃতির মধ্যে আমি নিয়ত নিমগ্ন হই, মিশে যাই। আমি উত্তরায় থাকি, ছিলাম। উত্তরায়ও আন্দোলন তুমুল বেগে হয়েছিল। মিছিলে মুহূর্মুহু গুলির শব্দ শুনেছি। প্রতিবাদীদের নির্ভীকতা আমাকে আপ্লুত করেছে। একদিন অবস্থা এমন হলো আমার মেয়ে বাসায় ফিরতে পারছিল না। আমার ছেলে এলো খুব বিধ্বস্ত অবস্থায়। পরে শুনলাম আমাদের পাশে চার নম্বরে ডাকাতি হয়েছে। অনেক অফিস ভাঙচুর হয়েছে। আমাদের আশেপাশে এবং আমাদের বাসার দিকে ঢুকতে চেয়েছে দুর্বৃত্তরা।
জুলাই বিপ্লবের গুরুত্ব জাতির কাছে কেমন হওয়া উচিত?
আল মুজাহিদী : যে রক্তস্মৃতির মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লব সাধিত হয়েছে, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা। এই বিপ্লবের মাধ্যমে সমগ্র জাতি অস্তিত্বমান হয়ে উঠেছে। জুলাই বিপ্লব খুব মোটাদাগে বাংলাদেশের একটি ভাষ্যরেখা, যা অর্জন করেছে আমাদের তারুণ্য।
জুলাই বিপ্লবের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ তার পথ ফিরে পেয়েছে বলে মনে করেন?
আল মুজাহিদী : ইতিহাসের নতুন নতুন বাঁক বদল হয় জাতীয় জীবনে। জুলাই বিপ্লবও এ জাতির জীবনে একটি ঐতিহাসিক বাঁকবদল। জুলাই বিপ্লব একটি অনন্যতম ভাষ্যরূপ!
একজন কবি হিসেবে জুলাই বিপ্লবকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আল মুজাহিদী : এটি আমাদের ইতিহাসের একটি অনন্যসাধারণ রক্তাক্ত ঘটনা! জাতীয় জীবনে কখনো-সখনো এ ধরনের মুহূর্ত আসে। যখন এ ধরনের মুহূর্ত আসে, তখন জাতি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। আমি আশা করি, আমাদের দেশ জাতিও এগিয়ে যাবে আগামীর দিকে।
কেউ বলছেন, জুলাই আন্দোলন; কেউ বলছেন, জুলাই বিপ্লব; আবার কেউ বলছেন, দ্বিতীয় স্বাধীনতা। আপনি কী মনে করেন?
আল মুজাহিদী : এই বিষয়টি ইতিহাসের একটি মাতৃগর্ভে ছিল। এটির উদ্গম ঘটেছে। এটি যে রূপ নিয়েছে, তাতে সবকিছু আছে। এখানে আন্দোলন আছে, সংগ্রাম আছে, বিপ্লব আছে—সবই আছে। স্ব-লিবার্টি এবং সভরেন্টি খুব কাছাকাছি। বিদেশি আগ্রাসনে সভরেন্টি আক্রান্ত হলে সমগ্র জাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। আমি মনে করি জুলাই বিপ্লব আমাদের সভরেন্টির পক্ষে কাজ করবে।
বিদেশি আগ্রাসনের কালো থাবা বাংলাদেশে বরাবরই ছিল! আজও আছে, এ আগ্রাসন থেকে মুক্তির পথ কী?
আল মুজাহিদী : বাংলাদেশ মানে বাংলাদেশ। একটি শাশ্বত আবহমান পাললিক অববাহিকার দেশ। এখানে স্বতঃস্ফূর্ত সাবলীল শান্তি কাম্য। বিদেশি আগ্রাসন অনিবার্য হয়ে উঠলে তার মোকাবিলায় সমগ্র জাতিকে একাট্টা এবং ইস্পাতকঠিন থাকতে হবে।
দেশপ্রেমিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। এদেশের প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের মূল্যায়ন করতে হবে। নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত হতে হবে।
আপনি একাত্তরে রণাঙ্গনে ছিলেন, নব্বইয়ে গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা পালন করেছেন এবং চব্বিশে ছিলেন একজন বিপ্লবী, আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই!
আল মুজাহিদী : একাত্তরে আমি সরাসরি যুদ্ধ করেছি। একাত্তরের বিষয়ে আমার ন্যারেশন একটু ভিন্ন হবে। জওহরলাল নেহরুর ডকট্রিন ছিল। তিনি বলেছেন, ‘পাকিস্তান জন্মাবে কিন্তু পঞ্চাশ বছরও টিকবে না।’ কৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন, ‘আসমান ভেঙে পড়তে পারে, কিন্তু পাকিস্তান হবে না কখনো।’
কেন বলেছেন? বলেছেন, ভারত অখণ্ড থাকবে, এমন চিন্তা থেকে। কিন্তু ভারত নানাভাবে ভেঙেছে এবং আরো ভাঙবে। তবে আমাদের মতন এলিমেন্টকে বরদাশত করবে না ভারত। কারণ আইএসআই এবং কেজিবির চেয়ে ‘র’ পাওয়ারফুল, কিন্তু তারা মানববিধ্বংসী এবং সেটি বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য।
মুক্তিযুদ্ধকালে সবসময়ের চার খলিফা এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা ছিলেন সরকারি ডরমিটরিতে। আমি ছিলাম পার্কসার্কাসে, ওখানে একটি বাসায় চৌদ্দ টাকা ভাড়ায় থাকতাম। সেটি ছিল একরকম খোপ করা। কবি আল মাহমুদও ছিলেন কাছাকাছি।
গড়ের মাঠে একটি জনসভা। সেখানে ইন্দিরা গান্ধী বললেন, ‘আমরা শান্তি চাই, যুদ্ধবিগ্রহ চাই না।’ সেখানে আরো ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শান্তি লাহিড়ী।
জনসভা শেষে সবাই আমার ঘরে আড্ডা দিয়েছিলেন। রাত গভীর থেকে গভীর হতে লাগল। একসময় ফজরের নামাজের আজান হচ্ছিল। তখন বাইরে ভয়ংকর আওয়াজ শুনতে পেলাম। কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি কীসের আওয়াজ। শক্তি-সুনীলেরা চলে গেল। আমি নিচে নেমে এলাম। সামান্য কিছু খেয়ে কমরেড অমিত রায় চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করলাম, হয়েছে কী?
বললেন, দেখুন না পণ্ডিত নেহরু যেটা পারেননি, ইন্দিরা সেটাই পারলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, মুসলমান এবং মানুষকে শেষ করে দেবে! তাহলে জয় বাংলা করবেন কোথায়?
হঠাৎ তার হুঁশ হলো। তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘না না, আমি তা বলতে চাইনি।’
আমি বললাম, ‘আপনি কী বলতে চেয়েছিলেন, আমি সেটা পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি। এটি শুনে তিনি আর কোনো কথা বলেননি।’
এ কথাটির সবচেয়ে বড় সত্য দিক হলো এই—একজন শেখ মুজিবের কারণে বাঙালিদের সামগ্রিক ঐক্যরূপ সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু মুজিবকে এভাবে ইতিহাসের একটি মুহূর্তে দাঁড় করিয়ে হিন্দুস্তান সব ধরনের রাজনৈতিক ফায়দা লুট করেছে।
সুতরাং নব্বই ও চব্বিশ—এসবই ইতিহাসের যৌগিক মিশ্রফল। চব্বিশের বিপ্লব না ঘটলে জাতি খুব অসহায় অবস্থায় পতিত হতো। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমাদের সহায় হয়েছে। তিনি চব্বিশের বিপ্লব আমাদের দান করেছেন।
এই বিপ্লবকে এখন কীভাবে কাজে লাগিয়ে উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে?
আল মুজাহিদী : এই বিপ্লবকে এখন দেশ গঠনের কাজে লাগাতে হবে। গভীর একাগ্রতায় ও সমৃদ্ধ চেতনায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিতে হবে বিপ্লবকে। নিজেদের মধ্যকার ভেদাভেদ এবং ভাগাভাগি ভুলতে হবে। হিংসা-বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে উঠে আসতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে খুনখারাবি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং পরস্পর ট্যাগিংয়ের রাজনীতিও পরিহার করতে হবে।
বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেখা যাচ্ছে বিপ্লবের পক্ষগুলো ভীষণ রকম বিভাজিত, এটি বিপ্লবের জন্য নিশ্চয়ই শঙ্কার!
আল মুজাহিদী : সবার অবস্থান থেকে বিপ্লবকে গভীর সম্যক সচেতনতায় বিনীতভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যেকোনো মূল্যে ঐক্য ধরে রাখতে হবে। বিপ্লবের পক্ষগুলোর মধ্যে অনৈক্যের ফাটল যেন দেখা না যায়। দেখা গেলে এটি হবে বিপর্যয়ের কারণ।
বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশকে কেমন দেখছেন?
আল মুজাহিদী : ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে দেশ। গুম-খুন থেকে বেরিয়ে এসেছে। আরো আসতে হবে। রাজনীতিতে কোনো রকম গাফিলতি, অস্বচ্ছতা ও অপরিণামদর্শিতা বাঞ্ছনীয় নয়। শাসকগোষ্ঠীকে বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোতে হবে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক লড়াইটি যত বড়, তার চেয়ে বেশি বড় সাংস্কৃতিক লড়াই। এ সাংস্কৃতিক লড়াই মোকাবিলায় আমাদের কী করা উচিত? কীভাবে এগোনো দরকার?
আল মুজাহিদী : রাজনৈতিক লড়াইয়ের চেয়েও কখনো কখনো সাংস্কৃতিক লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভালো করে বুঝতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে এটি সবকিছুর ভেতর বিদ্যমান।
এ বিষয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লোকদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদেরও সচেতন হতে হবে। রাজনীতির মোটাদাগে সাংস্কৃতিক লড়াই চলে না।
সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক দূরদর্শী কৌশল।
রাঢ়-বঙ্গ-কলিঙ্গ-সমতট-হরিকেল—এই উপমহাদেশীয় সাংস্কৃতিক অবস্থানটিকে সত্য এবং শুদ্ধজ্ঞান করতে হবে। সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে আমাদের বিজয়ী হতেই হবে। এর বিকল্প কিছু নেই। সাংস্কৃতিকভাবে পরাস্ত হওয়া মানে সবকিছুতে পরাজিত হওয়ার শামিল।
বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ করছেন?
আল মুজাহিদী : যেভাবে ওরা সাংস্কৃতিক ব্লকেড সৃষ্টি করে রেখেছে—সেটাকে খণ্ডন করতে হবে, ভেঙে দিতে হবে, ধ্বংস করে দিতে হবে। সব দরজা তারা যে অবরুদ্ধ করে রেখেছে, সে আগল ভাঙতে হবে। যেমন বাংলা একাডেমির কথা বলি, সেখানে হাসিনার প্রেতাত্মা এখনো বিকট হাসছে। এই সাংস্কৃতিক উগ্র আগ্রাসন নস্যাৎ করে দিতে হবে।
ভাষাগত আগ্রাসন এবং শব্দগত আগ্রাসন নিরসনে কী ভূমিকা নেওয়া উচিত?
আল মুজাহিদী : এটি নিরসনে লম্বা সময়ের দরকার। অনেক সময় লাগবে। এতে তাড়াহুড়ো করা যাবে না। তাই বলে বসে থাকলেও চলবে না। এসব আগ্রাসন বন্ধে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। আর পদক্ষেপ নিতে হবে যথাযোগ্য আয়োজনের মাধ্যমে।
আপনি কবি ও রাজনৈতিক নেতাও ছিলেন। আপনার এই দীর্ঘ কবিজীবন এবং রাজনৈতিক জীবনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?
আল মুজাহিদী : বাংলাদেশ অসংখ্য অসংখ্য অলি-আল্লাহর দোয়ার মহিমায় স্নাত, প্লাবিত। এই মাটিতে অনেক নখর দাগ বসিয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে। তবু বাংলাদেশ উঠে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহ তায়ালার রহম ও করমে বাংলাদেশ দণ্ডায়মান থাকবে। বাংলাদেশ জেগে থাকবে, জেগে থাকবে এবং জেগে থাকবে।
দেশের একজন অন্যতম কবি হিসেবে কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?
আল মুজাহিদী : স্বজনপ্রীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং সব মানুষের জন্য সম্প্রীতিময়, সৌহার্দ্যময় ও সর্বমানবিক একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই।