রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন
গেল মার্চ মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৭৬টি। নিহত ৫৩২ জন এবং আহত ২২২১ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৬৬, শিশু ৯৮। ২১৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২০৪ জন, যা মোট নিহতের ৩৮.৩৪ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৮.০২ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ৭৯ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ১৪.৮৪ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৬ জন, অর্থাৎ ১২.৪০ শতাংশ।
এই সময়ে ১৪টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ২৭ জন আহত এবং ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ৪৮টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত এবং ২২৪ জন আহত হয়েছেন।
শনিবার সকালে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদপোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্র:
দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়- মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ২০৪ জন (৩৮.৩৪%), বাসের যাত্রী ৪৫ জন (৮.৪৫%), ট্রাক-পিকআপ-ট্রাক্টর আরোহী ২৮ জন (৫.২৬%), প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস আরোহী ৪৬ জন (৮.৬৪%), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা) ৯৪ জন (১৭.৬৬%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-পাখিভ্যান-ভটভটি-টমটম-মাহিন্দ্র) ২৩ জন (৪.৩২%) এবং বাইসাইকেল আরোহী ১৩ জন (২.৪৪%) নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন:
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৭১টি (২৯.৬৮%) জাতীয় মহাসড়কে, ২৬৪টি (৪৫.৮৩%) আঞ্চলিক সড়কে, ৭০টি (১২.১৫%) গ্রামীণ সড়কে এবং ৬২টি (১০.৭৬%) শহরের সড়কে এবং ৯টি (১.৫৬%) অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন:
দুর্ঘটনাসমূহের ১৬৬টি (২৮.৮১%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৩১টি (৪০.১০%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৮৬টি (১৪.৯৩%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৮২টি (১৪.২৩%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১১টি (১.৯০%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহন:
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-ড্রাম ট্রাক-হ্যান্ড ট্রলি-টুরিস্ট জীপ ২৪.৬০%, যাত্রীবাহী বাস ১৩.১৯%, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-পাজেরো জীপ ৭.০৪%, মোটরসাইকেল ২৪.২০%, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা) ১৯.৮৪%, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-পাখিভ্যান-ভটভটি-টমটম-মাহিন্দ্র) ৬.৪৪%, বাইসাইকেল ১.৪৮% এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৩.১৭%।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা:
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ১০০৮টি। (বাস ১৩৩, ট্রাক ১২০, কাভার্ডভ্যান ৩৭, পিকআপ ৪১, ট্রাক্টর ১৬, ট্রলি ৬, লরি ৭, ড্রাম ট্রাক ১৬, হ্যান্ড ট্রলি ৩, টুরিস্ট জীপ ২, মাইক্রোবাস ১৯, প্রাইভেটকার ৪২, অ্যাম্বুলেন্স ২, পাজেরো জীপ ৮, মোটরসাইকেল ২৪৪, থ্রি-হুইলার ২০০ (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৬৫ (নসিমন-পাখিভ্যান-ভটভটি-টমটম-মাহিন্দ্র), বাইসাইকেল ১৫ এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৩২টি।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ:
সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৬.৪২%, সকালে ২৩.২৬%, দুপুরে ২২.৯২%, বিকালে ১৭%, সন্ধ্যায় ৯.৩৮% এবং রাতে ২১%।
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান:
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২১.৮৭%, প্রাণহানি ২৫.৭৫%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৩.১৯%, প্রাণহানি ১২.৪০%, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ২১.৭০%, প্রাণহানি ১৯.১৭%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১৩.৫৪%, প্রাণহানি ১৩.৫৩%, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৬.৭৭%, প্রাণহানি ৬%, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৪.৬৮%, প্রাণহানি ৪.৮৮%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ১০.৭৬%, প্রাণহানি ৯.৯৬% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.৬৩%, প্রাণহানি ৬.৫৭% ঘটেছে।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১২৬টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২৭টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৪৬টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পেশাগত পরিচয়:
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, সেনা সদস্য ১ জন, পুলিশ সদস্য ২ জন, শিক্ষক ১৪ জন, সাংবাদিক ৫ জন, চিকিৎসক ২ জন, প্রকৌশলী ১ জন, আইনজীবী ৩ জন, বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা ও কর্মচারী ১৭ জন, এনজিও কর্মী ১২ জন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ৩১ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ২৭ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৩ জন, মসজিদের ইমাম/খাদেম ৪ জন, পোশাক শ্রমিক ৯ জন, বিদ্যুৎকর্মী ২ জন, নির্মাণ শ্রমিক ৭ জন, নৈশ প্রহরী ২ জন, প্রতিবন্ধী ৩ জন, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন ছাত্র-সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭৯ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
দুর্ঘটনা পর্যালোচনা ও মন্তব্য:
গত ফেব্রুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিল ১৫.৪২ জন। মার্চ মাসে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছে ১৭.১৬ জন। এই হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়েছে ১১.২৮%। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এই গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারী এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ দরকার।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ:
১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. ত্রুটিপূর্ণ সড়ক; ৩. বেপরোয়া গতি; ৪. চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৫. বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৬. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৭. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৮. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৯. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ১০. বিআরটিএ-র সক্ষমতার ঘাটতি; এবং ১১. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।