এবার বিশাল ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেল উপকূল
বিশ্ব জলবায়ু মডেলগুলোর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের উপকূলে বড় আকারের ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) আর্থ, অ্যাটমোসফিয়ারিক এবং প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগের গবেষক সম্প্রতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু নিয়ে নতুন শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন। গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী আগে যে ধরনের বড় ঝড় শত বছরে একবার হতো, এখন তা ১০ বছরেই হতে পারে। এই ঝুঁকি অঞ্চলভেদে ভিন্ন ধরনের হতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।
বিগত কয়েক যুগের ইতিহাস বিশ্লেষণেও দেখা যায়, অতীতে বড় বড় যত ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়েছে তা বেশির ভাগ মে মাস বা এর কাছাকাছি সময়েই হয়েছে। তাই বছরের মে মাস হলো সবচেয়ে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ মাস।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু করে ২০০৭ সাল থেকে। এর আগে একটা সময় ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের নামকরণ হতো না। বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুসারে, ১৯৬০-২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩টি বড় সাইক্লোনের ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬০ সাল থেকে ২০০৭ সালে সিডরের পর্যন্ত বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়গুলোকে ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০০৭ সালে প্রথম স্পষ্ট নামকরণ করা হয়। ২২৩ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা এবং ১৫-২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে নিয়ে আসা সেই ঘূর্ণিঝড় ছিল সিডর যাকে সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম উইথ কোর অব হারিকেন উইন্ডস (সিডর) নাম দেয়া হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বিবেচনা করা হয় ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়কে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ছিল ১৯৭০ এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়। এরপরে সাইক্লোন সিডরের কথা উল্লেখ করেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, ৭০ এর সাইক্লোন থেকেই মূলত মোটামুটিভাবে মনিটর করা শুরু হয়। সেই ঘূর্ণিঝড়টা সরাসরি বরিশালের মাঝখান দিয়ে উঠে আসে। ভোলাসহ অনেক এলাকা পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
এরপর ১৯৮৫ সালের ঘূর্ণিঝড়, উরিরচরের ঘূর্ণিঝড় নামে পরিচিত এই সাইক্লোনটি যার বাতাসের গতিবেগ ছিল ১৫৪ কিলোমিটার। এটা অল্প জায়গায় হয়েছে ফলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি ছিল না।
এরপর ১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড়, এই ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ১২-২২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ঘূর্ণিঝড়টিতে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ২২৫ কিলোমিটার। ১৯৯১ সালের ২৯-৩০শে এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়কে আখ্যা দেয়া হয় ‘শতাব্দীর প্রচণ্ডতম ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবে যাতে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যায় বলে জানা যায়। যদিও বেসরকারি সংগঠনের দাবি অনেক মাছধরার ট্রলার সাগরে ডুবে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন আরও অনেকে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এক কোটি মানুষ।
এর আগে ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর সর্বোচ্চ ২২৪ কিলোমিটার বেগে চট্টগ্রামে আঘাত হানা এই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ১০-৩৩ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। যে হিসেব পাওয়া যায় তাতে ১৯৭০ এর সালের প্রবলতম ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ মানুষ নিহত হয়। সেসময় ১০-৩৩ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল এবং অসংখ্য গবাদি পশু এবং ঘরবাড়ি ডুবে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, ওই ঘূর্ণিঝড়ে অনেকে মনে করেন মৃতের সংখ্যা আসলে ৫ লাখেরও বেশি ছিল।
সাধারণত ২/৩ ঘণ্টার বেশি সাইক্লোন থাকে না। কিন্তু এটি ছয়-ঘণ্টার বেশি সময় বাতাস বইতে থাকে। ২২৪ কিলোমিটার বেগে আসা এই ঘূর্ণিঝড়ে তেলের ট্যাংকার পর্যন্ত ওপরে উঠে গিয়েছিল।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর খুলনা-বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় ১৫-২০ ফুট উচ্চতার প্রবল ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে যার বাতাসের গতিবেগ ছিল ২২৩ কিলোমিটার। জোয়ারের সময় হয়নি বলে প্লাবন কম হয়েছে, ফলে তুলনামূলক মানুষ কম মারা গেছে, কিন্তু অবকাঠামোগত অনেক ক্ষতি হয়েছে, বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সিডরে রেডক্রসে হিসেবে ১০ হাজার মারা গেছে বলা হলেও সরকারিভাবে ৬ ছয় হাজার বলা হয়েছিল।
২০০৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড় আইলা, যার বাতাসের গতিবেগ ছিল ৭০-৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ৭০ এবং ৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ুর মডেল ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা সত্ত্বেও এবারের গভীর নিম্নচাপটি কেন ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিল না, এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে।
অতীতের রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৭ থেকে ২০২৫ মে মাসে ১২ বার ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। এর আঘাত পড়েছে উপকূলে। এ মাসের শুরুতে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছিল, মাসের একেবারে শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরে একটি সিস্টেম তৈরি হতে পারে। তবে সেটি ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেওয়ার আশঙ্কা খুবই ক্ষীণ। তা একটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়াবিদদের সেই কথাই যেন আজ বাস্তবেও সত্যি হলো।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, গত মঙ্গলবার বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। বুধবার তা সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়। বৃহস্পতিবার ভোরে এটি নিম্নচাপে পরিণত হয়। পরে তা গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম শুরু করেছে বেলা ৩টার দিকে।
বৃহস্পতিবার আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, নিম্নচাপটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে উপকূল অতিক্রম করে এটি স্থলভাগের দিকে উঠে আসায় এ থেকে ঘূর্ণিঝড় হওয়ার আশঙ্কা কেটে গেছে।
ফলে রাতে অমাবস্যা ও গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় অন্তত ১৪ জেলার বিভিন্ন স্থানে ১ থেকে ৩ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের যে শঙ্কা ছিল তাও কেটে গেছে।
সাগরে প্রথম লঘুচাপ, তারপর সুষ্পষ্ট লঘুচাপ, পরে নিম্নচাপ থেকে গভীর নিম্নচাপ এবং শেষে তা ঘূর্ণিঝড় হয়। এবার শুরুর প্রক্রিয়াগুলো একই রকম হলেও শেষ সময়ে আর ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারেনি। এর কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদেরা কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেন। এর প্রথম কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারেনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ু এবার সময়ের আগেই দেশে প্রবেশ এবং তা অনেকটাই সক্রিয় থাকায় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে দেয়নি।
২৪ মে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা টেকনাফ দিয়ে মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ ঘটে। ওই দিন ভারতের কেরালা উপকূলেও মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় ছিল। সাধারণত মৌসুমি বায়ু ভারতের কেরালা উপকূল স্পর্শ করলে প্রায় একই সময় বাংলাদেশের উপকূলেও তা এসে পড়ে।
মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল দিয়ে সাধারণত প্রবেশ করে ৩১ মে থেকে ১ জুনের মধ্যে। সাম্প্রতিক সময়ে এর অবশ্য ব্যত্যয় হচ্ছিল। স্বাভাবিক সময় থেকে গত প্রায় দেড় দশকে মৌসুমি বায়ু দেরিতে প্রবেশ করত। এবার ১৬ বছর পর এর ব্যতিক্রম হলো।
আবহাওয়ার বার্তা বলছে, মৌসুমি বায়ু বৃহস্পতিবার ঢাকা বিভাগের পূর্বাঞ্চলসহ বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে। যখন মৌসুমি বায়ুর প্রাবল্য থাকে, তখন ঘূর্ণিঝড়ের শক্তির সঞ্চয় কমে যায়। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য প্রবল গরম হাওয়ার সঞ্চয় দরকার। মৌসুমি বায়ু এতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। এর শক্তি ক্ষয় হয়। বায়ুর প্রাবল্যে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে না। এবারও তা–ই হয়েছে। এখন মৌসুমি বায়ু অনেকটাই সক্রিয়।
মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার পাশাপাশি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার এলাকা এবার ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি না হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, সাগরের যেখানে লঘুচাপটি সৃষ্টি হয়েছে, সেটা বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলের একেবারে কাছাকাছি। সেখান থেকে উপকূলমুখী হতে বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার জন্য যে সময় দরকার, সেটি তা পায়নি।
বৃহস্পতিবার সকালে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, বঙ্গোপসাগরের সুস্পষ্ট লঘুচাপটি আজ ভোরের দিকেই নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। নিম্নচাপটি ওই সময় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৪০৫ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ–পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৯৫ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ–পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ২৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ২৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে অবস্থান করছিল। পরে এটি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার বেগে উত্তর দিকে এগিয়ে আরও ঘনীভূত হওয়ার কথাও বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, উপকূল থেকে এত কাছে নিম্নচাপে পরিণত হয়ে তা দ্রুত সময়ের মধ্যে শক্তি সঞ্চয়ের সময় পায়নি। ফলে এটি আর ঘূর্ণিঝড়েই রূপ নিতে পারেনি।
এদিকে গত দেড় দশকে দেখা গেছে মে মাসে ঘূর্ণিঝড় হতে।গত বছরের ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ আঘাত করেছিল বাংলাদেশের উপকূলে। ২০২৩ সালের ১৪ মে ‘মোখা’, ২০২১ সালের ২৭ মে ‘ইয়াস’, ২০২০ সালের ২১ মে ‘আম্পান’, ২০১৯ সালের ৪ মে ‘ফণি’, ২০১৭ সালের ৩১ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’, ২০১৬ সালের ২২ মে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানা’, ২০১৩ সালের ১৬ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’, ২০১০ সালের ২১ মে ঘূর্ণিঝড় ‘লায়লা’, ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’, ২০০৮ সালের ৩ মে ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’, ২০০৭ সালের ১৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আকাশ’ উপকূলে আঘাত করেছিল।
ঘূর্ণিঝড়গুলো দেশের উপকূলে আঘাত হানে এবং তাতে প্রাণহানি হয়েছে অনেকের। সম্পদ নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার। কিন্তু এবার নানা কারণেই শ্রীলংকার নাম দেওয়া ‘শক্তি’ নামে ঘূর্ণিঝড়টি দাপট দেখানো তো দূরের কথা, রূপ নেওয়ার আগেই হাওয়ায় বিলীন হয়ে গেছে। এতে সম্ভাব্য প্রাণহানি ও সম্পদের বিশাল ক্ষয়ক্ষতি থেকেও রক্ষা পেল বাংলাদেশ। অনেক কারণ থাকার পরও বলা যায়- এটা একমাত্র মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় বাংলাদেশ সম্ভাব্য অনেক ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেল।