হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা

মে জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

ব্রি. জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বাস্তবতায় একটি অস্বস্তিকর সত্য বারবার সামনে আসছে—অবৈধ অস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদ কখনোই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি), ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো আজ একটি জটিল আন্তঃসংযুক্ত নিরাপত্তা বলয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইতিহাস, ভূরাজনীতি এবং দুর্বল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা। আশির দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র আন্দোলনের উত্থান ছিল এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবিন্দু। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এবং তার সশস্ত্র শাখা ‘শান্তিবাহিনী’ ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত গেরিলা বাহিনীতে রূপ নেয়। বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত চলা এই সংঘাতে প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এই দীর্ঘ সংঘাতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তার অভিযোগ বহুবার উঠে এসেছে।

সে সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো-ত্রিপুরা, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড—নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাপক সামরিকীকরণের মধ্যে ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় অস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় মজুত তৈরি হয়। বিভিন্ন গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্ত্রের একটি অংশ বিভিন্ন চোরাচালান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে, যা শান্তিবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সে সময় ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে ৭ দশমিক ৬২ মিমি ক্যালিবারের রাইফেল এবং SLR (Self-Loading Rifle) উল্লেখযোগ্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি অভিযান, বিশেষ করে আশির ও নব্বইয়ের দশকে পরিচালিত বিভিন্ন অপারেশন—এই সশস্ত্র কার্যক্রম দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের পথও উন্মুক্ত হয়। অবশেষে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তি চুক্তি এই সংঘাতের একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে চুক্তি-পরবর্তী সময়ে ২০০টিরও বেশি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার এবং প্রশাসনিক শূন্যতা নতুন কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানের সুযোগ তৈরি করে, যেমন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং সাম্প্রতিককালে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। পার্বত্য চুক্তিটি বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত হয় এবং অনেক কিছু সংবিধানের বিরোধী হওয়ার কারণে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে তা জরুরি ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়ন করা আবশ্যক। বর্তমান পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো কার্যত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই শূন্যতায় গড়ে উঠেছে একটি ‘অস্ত্রের উন্মুক্ত বাজার’, যেখানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী সহজেই অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অঞ্চলে AK-সিরিজ রাইফেল, রকেট লঞ্চার এবং আধুনিক গোলাবারুদের অবাধ প্রবাহ লক্ষ করা যাচ্ছে।

মণিপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়েছে জাতিগত ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে। মণিপুরের কুকি জনগোষ্ঠী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বম, পাংখুয়া ও লুসাই জনগোষ্ঠী বৃহত্তর জো (Zo) জাতিগোষ্ঠীর অংশ। এই সাংস্কৃতিক ও জাতিগত সেতুবন্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সহযোগিতা সহজতর করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক দেশের নিরাপত্তা বাহিনী যখন অভিযান পরিচালনা করে, তখন এসব গোষ্ঠী সহজেই সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে আশ্রয় নেয়। চোরাচালান এই নেটওয়ার্কের একটি প্রধান স্তম্ভ। দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত, দুর্বল নজরদারি এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর আন্তঃসম্পর্কের কারণে একটি শক্তিশালী ‘স্মাগলিং করিডোর’ গড়ে উঠেছে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্র মণিপুর হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে, আবার বিপরীত দিকেও একই প্রবাহ বিদ্যমান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদক অর্থনীতি—বিশেষ করে আফিম চাষ। সাম্প্রতিক অভিযানে বান্দরবানের আলিকদম সীমান্তে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আফিমক্ষেত ধ্বংস করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলের অপরাধ অর্থনীতির বিস্তারকে নির্দেশ করে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আসে, যেকোনো রাষ্ট্র যদি স্বল্পমেয়াদি ভূরাজনৈতিক স্বার্থে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা উসকে দেয় বা তা সহনশীলতার দৃষ্টিতে দেখে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া অবশ্যম্ভাবী। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি সেই ‘বুমেরাং’ প্রভাবের একটি উদাহরণ, যেখানে অতীতে গড়ে ওঠা অস্ত্র সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ নেটওয়ার্ক আজ নিজ নিজ রাষ্ট্রের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রাম, মণিপুর এবং মিয়ানমারকে ঘিরে যে নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা আসলে একটি ‘ট্রান্সন্যাশনাল সিকিউরিটি কমপ্লেক্স’—যেখানে এক দেশের অস্থিরতা খুব দ্রুত অন্য দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় একক রাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বা সীমান্ত কঠোর করা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দাবি করে।

প্রথমত, আঞ্চলিক সহযোগিতা শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কথাবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না—এটি হতে হবে কার্যকর ও অপারেশনাল। বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় জরুরি, যেখানে নিয়মিত বৈঠক, হটলাইন যোগাযোগ এবং রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্যবিনিময়ের ব্যবস্থা থাকবে। অতীতে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে কিছু সীমিত সহযোগিতা দেখা গেলেও বর্তমান জটিল বাস্তবতায় সেটি যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে, সীমান্তবর্তী ‘হটস্পট’ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি বা সমন্বিত টহল ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। শুধু জনবল বাড়িয়ে নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি—যেমন ড্রোন, স্যাটেলাইট ইমেজিং, গ্রাউন্ড সেন্সর এবং স্মার্ট ফেন্সিং—ব্যবহার করে সীমান্তকে কার্যকরভাবে মনিটর করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম ভূপ্রকৃতি ঐতিহ্যগত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে দেয়; ফলে ‘টেকনোলজি-ড্রিভেন বর্ডার ম্যানেজমেন্ট’ ছাড়া এই চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ রোধ করা প্রায় অসম্ভব।

তৃতীয়ত, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়কে আরো গভীর ও বিশ্বাসভিত্তিক করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত দ্রুত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে এবং সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেয়। ফলে শুধু জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সীমাবদ্ধ তথ্য দিয়ে কার্যকর অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি যৌথ গোয়েন্দা সমন্বয় সেল গঠন করা যেতে পারে, যেখানে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্র পাচারের রুট এবং অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে শেয়ার করা হবে।

চতুর্থত, এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী—যারা প্রায়ই উন্নয়ন বঞ্চিত এবং রাষ্ট্রীয় সেবার বাইরে থাকে—তাদের অনেকেই জীবিকার তাগিদে চোরাচালান বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ফলে শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করলেই হবে না; বরং এ অঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে জনগণকে মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। ‘সিকিউরিটি উইথ ডেভেলপমেন্ট’—এই ধারণাটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

পঞ্চমত, মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীলতা এই পুরো সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং প্রশাসনিক ভাঙনের ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো কার্যত ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’-এ রূপ নিয়েছে, যা বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক উদ্যোগ—যেমন ASEAN বা জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা—এ সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে, রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি। ইতিহাস দেখিয়েছে, স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত সুবিধার জন্য যদি কোনো রাষ্ট্র পরোক্ষভাবে অস্থিতিশীলতা সহ্য করে বা উৎসাহিত করে, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত নেতিবাচক হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান বাস্তবতা সেই শিক্ষাকেই আবার স্মরণ করিয়ে দেয়। পারস্পরিক সন্দেহ ও প্রতিযোগিতার পরিবর্তে যদি আস্থা, সহযোগিতা এবং যৌথ নিরাপত্তার ধারণা প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে এই ‘ছায়া যুদ্ধ’ ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে। অতএব, এখনই সময় একটি সমন্বিত, বাস্তবমুখী এবং দূরদর্শী উদ্যোগ নেওয়ার—যেখানে নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করবে। অন্যথায়, সীমান্তের এই অদৃশ্য সংঘাত একদিন দৃশ্যমান অস্থিরতায় রূপ নিয়ে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে গভীরভাবে বিপন্ন করে তুলবে। এ বিষয়টির প্রতি সরকারের অগ্রগণ্যতার ভিত্তিতে নজর দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক

কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি : দাপটের মোহে বিপন্ন ভবিষ্যৎ

শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব

ইসলামী ব্যাংককে বাঁচাতে এখনই যে সিদ্ধান্ত দরকার

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়

অঘোষিত রাজতন্ত্র এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা

নারী নেতৃত্বের বেড়াজাল এবং মোরগ-পোলাও বিতর্ক

সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র, রাজনীতিতে উত্তাপ

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল, ভয়াল সেই রাত

আমেরিকা-পরবর্তী নতুন বিশ্ব

বাংলাদেশে টিটিপি জঙ্গির উদয় হলো কোথা থেকে