আজকের বিশ্বের সব চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কতদিন চলবে। এ যুদ্ধে কোন কোন দেশ জড়িয়ে পড়ছে? একদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বনাম জনগণের নিজে বেঁচে থাকার অর্থনৈতিক যুদ্ধে অস্তিত্ব টিকিয়ে থাকার যুদ্ধে প্রতিটি মানুষই ইরান-ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না হয়েও যুক্ত। লুটেরা মাফিয়াদের সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য বনাম মধ্যপ্রাচ্য ও বিশেষ করে, জ্বালানিসমৃদ্ধ দেশগুলোকে বশে আনা নিয়েই এ যুদ্ধ। লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান ধ্বংসের পর ক্ষয়িষ্ণু পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ নিয়ে একটু দৃষ্টিপাত করাটা জরুরি। কদিন আগে দেখলাম দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে কীভাবে ট্রাম্প প্রশাসন ছিনতাই করে সে দেশ থেকে কমান্ডো ফোর্স দিয়ে উঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে অন্তরীণ করল। গণতন্ত্রের নামে এ যেন স্বৈরতন্ত্র। এর কিছুদিন পর আজকের এই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। দুই সপ্তাহ পার হওয়া এ যুদ্ধে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য যখন লন্ডভন্ড, হরমুজ প্রণালি যখন বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বন্ধ ও নিরাপত্তার হুমকিস্বরূপ, তখন সংবাদমাধ্যমে জানলাম আমাদের সু-প্রতিবেশী ভারতের একটি তেলের ট্যাংকার ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করে দেয়। ভারত-ইরান দুপক্ষেরই বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য চলমান, যা আমাদের আজকের বিষয় নয় বিধায় আমরা মূল আলোচনায় চলে যাই। ভারত ইরানকে আক্রমণের হুমকি দিয়েছে এ রকম একটা সংবাদ বাংলাদেশের প্রথম সারির এক পত্রিকার ডেপুটি এডিটরের ফেসবুক ওয়ালে দেখে কৌতূহল জাগল। তার আগে চলুন না জেনে নিই ভারত ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর কতগুলো যুদ্ধে জড়ায় ও এর পরিণতি। ১৯৬২ ও ১৯৭১ সালে ভারত যুদ্ধে জড়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে। ৭১-এ আসলে যুদ্ধ করেছে পূর্ব পাকিস্তানবাসী, গেরিলা ফোর্স, পূর্ব পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর বিদ্রোহী অফিসার ও জওয়ানরা। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু ভারতীয়রা এ যুদ্ধে আমাদের তথা বাংলার বীরদের বিজয় ছিনতাই করেছে। আমাদের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে সারেন্ডার অনুষ্ঠানে কেন অনুপস্থিত-তা অনুসন্ধান করলে লজ্জা পাবে ভারতীয় জনগণ, যারা আমাদের বন্ধু। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী বিজেপির মোদি সরকার বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারে না। তাদের আমাদের প্রতি অপ্রতিবেশীসুলভ আচরণে বাংলাদেশের বেশির ভাগ জনগণ ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচে ভারতের পরাজয়ে উল্লসিত হয়। আপনারা কারগিল যুদ্ধ, চীনের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধের স্মৃতি কল্পনা করে কি আবিষ্কার করতে পারেন? ভারতীয় বিমানবাহিনীর ফ্রান্সে এয়ার শোতে বিমান দুর্ঘটনা, কারগিলে ভারতীয় বিমানবাহিনীর অফিসার পাকিস্তান থেকে বন্দিবিনিময়, ওদিকে ভারত চীন যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর শোচনীয় পরাজয়। বলিউডে ভারতের যুদ্ধের সিনেমা আর বাস্তবতায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য। রাষ্ট্র বাংলাদেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধের সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকলেও সীমান্তে খোঁচাখুঁচির ঘটনা কম নয়। বিএসএফ যেমন ফেলানীর লাশ ঝুলিয়ে রেখেছে, তেমনি আমাদের গর্বিত বিডিআর রৌমারি পাদুয়ায় দাদাদের ইজ্জতের ফালুদা বাজিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দেয় বাংলাদেশের সঙ্গে লড়তে এলে ধুতির নিচে লোহার অন্তর্বাস পরা শ্রেয়। যদিও ষড়যন্ত্র ও চাণক্যনীতিতে চ্যাম্পিয়ন দাদারা আমাদের স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তায় ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর হত্যা চালিয়ে ৫৭ জন বীর বাংলাদেশি সামরিক অফিসারদের খুন করে। কাপুরুষ লড়ে ষড়যন্ত্রকারীদের সহায়তায়। বাংলাদেশ লড়েছে ও লড়বে বীরত্বের সঙ্গে। আমাদের বিডিআর/বিজিবির অপারেশনের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে যাওয়া কতগুলো বীর, চৌকন, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক অফিসার। এদের প্রশিক্ষণে এক একজন বিজিবির সৈনিক সীমান্ত এক একটা অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠে। এর জন্যই বিজেপি সরকারের টার্গেট কীভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত বা নষ্ট করা যায়। আমাদের কিছু গাদ্দার উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক আমলা, অসৎ ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের কারণে ভারতের সে অভিপ্রায় অনেকাংশে সফল হলেও আমরা ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশে দেশপ্রেমিক প্রশাসন গড়ে তুলব-এটা আমাদের প্রতিজ্ঞা। আওয়াজে মোদিস্থান : ভারতের যুদ্ধের এ গৌরবময়(!) ইতিহাসের পরও ভারত ইরান আক্রমণ কতটা সম্ভব তা বিচার করার প্রজ্ঞা আপনাদের ওপর ছেড়ে দিতে চাই। একটা নোক্তা দিয়ে রাখলাম। সামরিক কৌশল, যুদ্ধাস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও সাহসের বিবেচনায় ভারত কি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা ইরানের ধারেকাছে আছে?
লেখক : কলামিস্ট, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ahmedferdous987@gmail.com