ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে খারাপ সময় বয়ে এনেছে ট্রাম্পের জন্য। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ এবং বিদেশে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার স্লোগান দিয়ে তিনি এবার বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর থেকেই তিনি একটির পর একটি দেশে হামলা চালাচ্ছেন। সর্বশেষ তিনি ইরানকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধ চান না এবং তারা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি সামরিক হুমকি হিসেবেও দেখেন না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নির্বিচার হামলার পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের হামলায় তছনছ হয়ে গেছে। হতাহত হয়েছেন অনেক মার্কিন সেনা। এই যুদ্ধে ভেনেজুয়েলার মতো দ্রুত সাফল্য পাওয়ার যে আশা ট্রাম্পের ছিল, তা পূরণ হয়নি। ফলে ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির ভোটের বাক্সে এই যুদ্ধের যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে রিপাবলিকানদের দখলে ২১৮টি আসন এবং ডেমোক্র্যাটদের দখলে রয়েছে ২১৩টি আসন। মৃত্যু ও পদত্যাগজনিত কারণে শূন্য রয়েছে চারটি আসন। অন্যদিকে উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে রিপাবলিকান দলের বর্তমান আসন ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের আসন ৪৭টি। দুজন স্বতন্ত্র সদস্য ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গেই জোট বেঁধেছেন। দুই কক্ষেই রিপাবলিকানরা স্বল্প ব্যবধানে তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে গেলে ট্রাম্পের অনেক কর্মসূচিই বাধাগ্রস্ত হবে এবং তার লক্ষ্য অর্জনে তাকে লড়াই করতে হবে।
এমনকি ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি বা ক্ষমতার অবসানও ঘটাতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির আসন কমে গেলে তখন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ বা অভিশংসন করতে পারে। তবে এজন্য ডেমোক্র্যাটদের সিনেটে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে আরো আসন কেড়ে নেওয়ার প্রয়োজন হবে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে, যা মোট আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই ৩৫টির মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা কতটি আসন পায়, তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের নীতির প্রতি বেশিরভাগ মার্কিনির আর আস্থা নেই। ২০২৪ সালের নির্বাচনে চরম বামপন্থিদের নিয়ন্ত্রিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বিপরীতে ট্রাম্প হয়তো ভোটারদের কাছে ভালো পছন্দ ছিলেন। কিন্তু অনেক ডেমোক্র্যাট বিশেষ করে দলটির রক্ষণশীল বা ডানপন্থি সদস্যরা এখন দলীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসছেন।
২০২৫ সালের নভেম্বরে পরিচালিত এক গ্যালাপ জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থনের হার ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোয় এই পরিবর্তন প্রভাব ফেলবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। এখন স্বাভাবিকভাবেই যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তা হলো—রিপাবলিকান পার্টি কি প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এবং ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের জন্য ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে পারবে?
গত সপ্তাহের জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ক্রমাগতভাবে কমার পাশাপাশি রিপাবলিকান দলের প্রতিও জনসমর্থন ক্রমেই কমছে। জনগণ ইরান যুদ্ধের দিকে মনোনিবেশ করছে, তবে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জয়ের দিকেই নয়; বরং তারা মার্কিন অর্থনীতি ও তাদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব এবং যুদ্ধের ব্যয় নিয়েও উদ্বিগ্ন।
এনবিসির এক জরিপ অনুসারে, ৫৪ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের গৃহীত পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, অন্যদিকে সমর্থন করেছেন ৪১ শতাংশ ভোটার। একইভাবে ৫২ শতাংশ ভোটার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল না, ৪১ শতাংশ হামলা সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে সিএনএনের পর্যবেক্ষণ করা এক ডজন সংস্থার জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের পদক্ষেপ সমর্থন করা লোকের সংখ্যা আরো কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অতি-বামপন্থিরা কখনোই ট্রাম্পের সমস্যা ছিল না। তার ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে রিপাবলিকান ও রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনের ওপর ভর করে। কিন্তু মার্কিন অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জনসাধারণের উদ্বেগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যাপারে রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাটদের মনোভাবও পরিবর্তিত হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে এই পরিবর্তন ট্রাম্পের জন্য নাটকীয় হতে পারে।
রিপাবলিকান পার্টি বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট দুই কক্ষেই সীমিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে, যা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের রোধ করার জন্য যথেষ্ট। তবে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নিঃসন্দেহে এটি পরিবর্তিত হবে। ১৯৩৮ সাল থেকে অনুষ্ঠিত ২২টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ২০টিতেই রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে। গত ৮০ বছরে আসন হারানোর এই হার ৯০ শতাংশ। মাত্র দুবার (১৯৯৮ ও ২০০২ সালে) ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা হাউসে আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের গড় ২৮টি আসন। অন্যদিকে এই সময়ে রিপাবলিকান পার্টি সিনেটে আসন হারায় ৭০ শতাংশ।
গত সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে বা দলীয় নির্বাচনেও পরিবর্তনের একটা হাওয়া লক্ষ করা গেছে, যা টেক্সাস থেকে শুরু হয়েছে। এই রাজ্য ঐতিহ্যগতভাবেই রিপাবলিকান পার্টি এবং ট্রাম্পের জন্য শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এখানেও ভোটারদের মনোভাবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। সেখানে ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে একজন অতি-মধ্যপন্থি প্রার্থী সহজেই একজন অতি-বাম উদারপন্থিকে পরাজিত করেছেন।
এ ধরনের পরিবর্তন কেবল তখনই ঘটতে পারে, যখন রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাটরা তাদের দলের মধ্যে আরো শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। এই নির্বাচনে জেমস ট্যালারিকো ৫২ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে জেসমিন ক্রোকেটকে পরাজিত করেছেন। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মার্কিন সিনেটে প্রার্থী মনোনীত করার জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই নির্বাচন রিপাবলিকান দলীয় নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি ভোটারকে আকৃষ্ট করেছে।
ট্যালারিকোর প্রচারণার বার্তাগুলোর মধ্যে ছিল অসন্তুষ্ট রিপাবলিকানদের সঙ্গে অভিন্ন বিষয় ও চিন্তাধারার ওপর জোর দেওয়া এবং ট্রাম্পপন্থি ইভানজেলিকাল আন্দোলন থেকে দূরে থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা। ট্যালারিকো ও ক্রোকেটের এই প্রতিযোগিতায় ২৩ লাখেরও বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে গত বছর ২৬ মে অনুষ্ঠিত রিপাবলিকান প্রাইমারিতে ভোট দিয়েছেন ১৭ লাখ ভোটার।
কেবল শক্তিশালী ধর্মীয় মূল্যবোধের অধিকারী রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাট ট্যালারিকো টেক্সাস সিনেটের আসন দখল করতে দাঁড়াচ্ছেন তা নয়, বরং অতীতে রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দেওয়া ডেমোক্র্যাটরা স্পষ্টতই আরো রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে ফিরে যাচ্ছেন। গত সপ্তাহে যেসব রাজ্যে তাদের প্রাথমিক নির্বাচন বা প্রাইমারি অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে টেক্সাস একটি। বাকিগুলো বসন্ত এবং গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিত হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ভোটারদের মনোভাবে এই পরিবর্তনের কারণ কী? নিঃসন্দেহে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা গাজা ও ইউক্রেনের অন্তহীন যুদ্ধের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকা এর মূল কারণ নয়। বরং এর মূল কারণ এই যুদ্ধগুলোর বিপুল ব্যয় এবং আমেরিকান অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাবই ভোটারদের মনোভাবে পরিবর্তন আনছে।
গত সপ্তাহে তেলের দাম ৩৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ১৯৮৩ সালের পর থেকে সাপ্তাহিকভাবে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি। এর ফলে পেট্রোলের দাম বেড়ে যায়। গ্যাসের দাম বৃদ্ধিও ট্রাম্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ তিনি তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে এ বিষয়টিকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছিলেন এবং গর্ব করে বলেছিলেন, তার প্রেসিডেন্সির সময় তেলের দাম কমেছে।
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হচ্ছে এবং তিনি আমেরিকানদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির আশাও করতে বলেছেন। কিন্তু গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার কথার ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। গত বছর জানুয়ারিতে তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে লক্ষাধিক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।
ইরান যুদ্ধ এরই মধ্যে গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধের খরচের সঙ্গে প্রতিদিন আনুমানিক এক বিলিয়ন ডলারের বেশি যোগ করছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যুদ্ধ যদি চার সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তাহলে মার্কিন করদাতাদের খরচ সহজেই ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে এবং অর্থনীতি আরো মন্দার দিকে যাবে।
তবে এটি কেবল পেট্রোল বা চাকরির মধ্যেই সীমিত নেই, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বাড়ছে। অন্যদিকে মজুরির পতন অব্যাহত রয়েছে। আয়ের স্তর মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। মার্কিনিরা এক বছর আগের তুলনায় বর্তমানে ডলার দিয়ে অনেক কম পণ্য কিনতে পারছেন। ফলে ইরান যুদ্ধ আমেরিকার রাজনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আনবে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বড় ধরনের বিপাকে ফেলে দিতে পারে।
আরব নিউজ অবলম্বনে মোতালেব জামালী