বাংলাদেশে নারীবাদের উন্নতি মাশাআল্লাহ চোখে পড়ার মতো! ১৬ বছর ফ্যাসিবাদের সঙ্গে এ দেশের নারীবাদের একটা ঐতিহাসিক সখ্য গড়ে উঠেছিল! ফ্যাসিবাদের পলায়নের সঙ্গে সঙ্গে বায়তুল মোকাররমের খতিবের সঙ্গে এই নারীবাদীরা হাওয়া হয়ে গিয়েছিল! এতে দেশের পুরুষকুল একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে ছিল। কিন্তু তারা খুব দ্রুতই আবার ফিরে এসেছে। এ দেশের নারীবাদীরা ঐতিহ্যগতভাবেই ইসলামি দল জামায়াতের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা মুসলিম লীগ ঘরানার দল হিসেবে বিএনপিকেও দুচোখে দেখতে পেত না।
এখন হঠাৎ সেই পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। বিএনপির সুহৃদদের মধ্যেও যে এ রকম কট্টর নারীবাদী লুকিয়েছিলেন, তা জানা ছিল না। নারীবাদী এই মহীয়সী প্রশ্ন তুলেছেন—পোলাও রান্না করতে মোরগ এবং মুরগি দুটোই ব্যবহার করা হয়—তবে এই শাহি খাবারের বেলায় কেন শুধু মোরগ-পোলাও নামে ডাকা হয়? আরো হৃদয়বিদারক পর্যবেক্ষণটি হলো—নিত্যদিনের খাবারে আমরা যা খাই তাকে কিন্তু মুরগির মাংস বলেই ডাকা হয়! তার এই তত্ত্ব তাবৎ পুরুষকুলের মাথা খারাপ করে দিয়েছে!
সময়টা ১৯৯৬ সাল। বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে ২১ বছর পর আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ! খালেদা জিয়ার জায়গায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। আমি তখন ইরানি একটি জাহাজে সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেইল করছি! একদিন জাহাজের ডিউটি মেস রুমে সবাই বসে টি-টাইমের আড্ডা চলছে! ইরানি এক ফিটার অভিযোগের সুরে এসে জিজ্ঞেস করে, হাই-সেকেন্ড! তোমাদের আগের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একজন নারী। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যিনি শপথ নিয়েছেন, তিনিও একজন নারী! বলো তো দেখি, তোমাদের দেশে কি কোনো পুরুষ নেই? বললাম, থাকবে কীভাবে? নারীদের সংসার আর দেশ চালানোর দায়িত্ব দিয়ে আমরা পুরুষরা সব জাহাজে চলে আসি! আমার এই কথায় ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি ও ইরানি সবাই হেসে উঠেছিল!
আর সেই আমাদের খোঁটা শুনতে হয় নেতৃত্বে যথেষ্টসংখ্যক নারী না থাকায়। আর এই খোঁটা মারেন আবার তারা, যাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি গত আড়াইশো বছরের মধ্যে একজন নারীকেও প্রেসিডেন্ট বানাতে পারেনি! ট্রাম্প তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে একবার একজন পুরুষ (বাইডেন) ও দুবার দুজন নারী (হিলারি ও কমলা হ্যারিস) তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন! মজার বিষয় হলো, পুরুষ ট্রাম্প অন্য পুরুষ বাইডেনের হাতে পরাজিত হলেও বাকি দুই নারীকে এই পুরুষ ধরাশায়ী করেছেন! অর্থাৎ আমেরিকান ভোটাররা দু-দুজন যোগ্য ও বিদগ্ধ নারীর চেয়ে একজন অর্ধ উন্মাদ পুরুষকে তাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগ্য গণ্য করেছেন!
অথচ আমরা কত পারসেন্ট নারী নেতৃত্বকে কোন জায়গায় রাখব—সেটি ঠিক করে দেয় এই পশ্চিমা সমাজ! বিশালসংখ্যক নারী সমাজকে চরম দুর্ভোগে রেখে গুটিকয় ভাগ্যবানকে ‘সুলতানা রাজিয়া’ বানানোকে বলেন নারীর ক্ষমতায়ন! এখানে আমরা নিজস্ব বিদ্যা-বুদ্ধি বা বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করতে পারি না! সারাক্ষণ একটা হীনম্মন্যতায় ভুগি, পাছে লোকে (পশ্চিম) কিছু বলে!
এই হীনম্মন্যতার বীজ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবিষ্ট করানো হয়েছে! আমরা যখন পলাশীর প্রান্তরে স্বাধীনতা হারাই—তখনো আমাদের এই ভূখণ্ডে ৮০ হাজার মক্তব ছিল। পলাশী যুদ্ধের আগে সামরিক এবং বেসামরিক চাকরি ক্ষেত্রে সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনভার গ্রহণ করার পর পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। লাখ লাখ মুসলমানকে বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। সময়ের প্রেক্ষাপটে মোটামুটি একটা শিক্ষিত জাতিকে কয়েক প্রজন্মের ভেতরেই কপর্দকহীন, মূর্খ জাতিতে পরিণত করে!
অন্যদিকে হিন্দু বেনিয়ারা ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি-বাকরি করে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হয়ে পড়ে। যেসব হিন্দু কর আদায়কারীরা পলাশী যুদ্ধের আগে নিম্নপদের চাকরিতে নিযুক্ত ছিল, নয়া ব্যবস্থার বদৌলতে তারা জমিদার বা এলিট শ্রেণিতে পরিণত হয়!
ব্রিটিশরা বড় প্রভু এবং এই জমিদার ও এলিট শ্রেণি ছোট প্রভু হিসেবে আবির্ভূত হয়। কখনো কখনো বাঁশের চেয়ে কঞ্চি মোটা বনে যেত। এ রবিরাই ঠিক করে দিতেন আমাদের নজরুলরা কবিতায় ‘রক্ত’ লিখবে, নাকি ‘খুন’ লিখবে! নতুন প্রজন্মের প্রতি পরামর্শ—তারা যেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বড়র পীরিতি বালির বাঁধ’ বইটি একটু পড়ে দেখেন।
তখন বিলাত থেকে কেরানি আনতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য অনেক খরচ পড়ত। কাজেই নেটিভদের মধ্য থেকেই কেরানি বানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়! আমাদের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার শুরু হয় সেই প্রয়োজনকে সামনে রেখে।
তখন থেকেই ব্রিটিশদের এই ‘ইউর অবিডিয়েন্ট সার্ভেন্ট’দের অন্তরে একটা ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। যার প্রকাশ ঘটে নিজের বাপ-দাদার বিশ্বাস সংস্কৃতিকে খাটো করে দেখার সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সের মধ্য দিয়ে! গরিব কৃষকের ছেলে সামান্য শিক্ষিত হয়ে এবং ইংরেজ ও হিন্দু বাবুদের সংস্পর্শে এসে নিজের বাবার পরিচয় দিতে ইতস্তত শুরু করে! বাপ-দাদার আচার-আচরণের সঙ্গে তাদের অনুভূতি-বিশ্বাসকেও ঘৃণা করতে শিখে। এদেরই পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এই হীনম্মন্যতা রক্তের মধ্যে মিশে যায়! হীনম্মন্যতা থেকে শুরু হয় বিদ্বেষ! নানা খুদকুঁড়ো ছিটিয়ে এদের বানানো হয় নারিকেল, যাদের রঙটি বাদামি হলেও ভেতরটি পুরোপুরি সাদা। যে সাহিত্য-সংস্কৃতি-নাটক-সিনেমা আমাদের এই মনের রোগ দূর করার কথা—একাত্তরে নতুন চেতনার শরবত পান করে এরা সেই রোগ আরো বাড়িয়ে দেয়!
ইসলামোফোবিক পশ্চিমা সমাজ তাদের এই নারিকেল প্রজন্ম দিয়ে আমাদের বোধ-বিশ্বাস-কৃষ্টি-কালচারকে বিকৃত, তাচ্ছিল্য বা খাটো করার কাজটি নীরবে করে যায়। আমাদের মতো গরিব দেশে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে ভালনারেবল অবস্থায় থাকে। নারী ও শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপটি হলো দারিদ্র্য! মানবতার এই ধ্বজাধারীরা একদিকে আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করে এবং অন্যদিকে তাদের নারিকেল প্রজন্ম দিয়ে এলিট সেটেলমেন্ট বজায় রাখে। ক্ষমতায় যে দলই আসুক না কেন—দেখা যায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একটু-আধটু বদলিয়ে সেই একই মুখ—তাদেরই নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব রাজনীতিতে কিংবা প্রশাসনে বহাল থেকে যায়!
বিশ্বমানবতার এই ধ্বজাধারীরা নিজেদের দেশের পলিটিশিয়ান ও ব্যুরোক্র্যাটদের সত এবং স্বচ্ছ রাখলেও তৃতীয় বিশ্বের পলিটিশিয়ান ও ব্যুরোক্র্যাটদের অসৎ বানাতে একটুও দ্বিধা করে না। এরা কখনোই স্বাধীনচেতা ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতাদের সহ্য করে না। কাজেই বলা যায়, আমাদের দেশের অসহায় নারী ও শিশুদের দুর্ভোগের জন্য মূল দায়ী এরা এবং এদের সৃষ্ট ‘নারিকেল প্রজন্ম’!
ব্রিটিশদের কেরানি বানানোর এই প্রজেক্টের বিজ্ঞাপনে বলা হতো—লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে সে! অবাক করার বিষয় হলো, আমরা এখনো সেই বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যটিই আমাদের শিক্ষাগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছি। আমাদের সেই শিক্ষাব্যবস্থা এখনো কেরানি বানায়, ডাক্তার বানায়, ইঞ্জিনিয়ার বানায়; কিন্তু একটা স্বাধীন জাতির উপযোগী সিটিজেন বানাতে পারে না।
ঔপনিবেশিক শাসকরা অনেক আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও এখনো আগের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা বজায় রেখেছে! এরা কিছু বিশেষ শব্দ বা ভাবধারা প্রয়োগ করে এই নিয়ন্ত্রণের কাজটি করে! এরা যে বিষয়টি নিয়ে মুসলিম মানসকে কাবু করে তা হলো—নারী ও নারী নেতৃত্ব! ওরা একটা ট্র্যাপ আমাদের সামনে রাখে—আর আমরা তাতে পা দিই! একদল ওদের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে ওদের টিয়া পাখি হয়ে পড়ি। অন্যদল ভুলভাবে ওদের মোকাবিলা করে অত্যন্ত জীবনমুখী একটি ধর্মকে জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে ফেলে।
নারী নেতৃত্ব : কোরআন, হাদিস ও আধুনিক বাস্তবতার আলোকে
নারী নেতৃত্ব নিয়ে মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। কেউ একে সরাসরি অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন, আবার কেউ কোরআনের নীতির আলোকে এটিকে বৈধ ও সময়োপযোগী বলে ব্যাখ্যা করেন। বাস্তবে এই প্রশ্নটির উত্তর একমাত্রিক নয়; বরং কোরআন, হাদিস, ফিকহ এবং সমকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রেক্ষাপট একত্রে বিবেচনা করলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র সামনে আসে।
প্রথমত, কোরআনের দিকে তাকালে দেখা যায়—নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কোরআন যে মূলনীতি দিয়েছে, তা হলো ন্যায়বিচার, আমানতদারিতা ও যোগ্যতা। সুরা আন-নিসা (৪:৫৮)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দায়িত্ব সেই ব্যক্তিকেই দিতে হবে, যিনি এর উপযুক্ত। এখানে নারী-পুরুষের কোনো বিভাজন করা হয়নি। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো সাবার রানির (বিলকিস) ঘটনা, যা সুরা আন-নামলে বর্ণিত হয়েছে। একজন নারী শাসক হিসেবে তিনি প্রজ্ঞা, পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন—এবং কোরআন এই কাহিনিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেনি। বরং এটি একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত দেয় যে নেতৃত্বের মাপকাঠি লিঙ্গ নয়, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতা।
তবে হাদিসের একটি বর্ণনা এই আলোচনায় কেন্দ্রীয় বিতর্ক তৈরি করেছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি হাদিসে বলা হয়েছে—‘যে জাতি তাদের নেতৃত্ব নারীর হাতে তুলে দেয়, তারা সফল হবে না।’ এই হাদিসটি সাধারণভাবে উদ্ধৃত হলেও এর প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বলা হয়েছিল পারস্য সাম্রাজ্যের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, যখন দ্বিতীয় খসরুর মৃত্যুর পর তার মেয়ে শাসনভার গ্রহণ করেন। এখানেই আলেমদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। একদল এটিকে সর্বজনীন নির্দেশনা হিসেবে দেখেন, অন্যরা বলেন—এটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা মন্তব্য, যা সবসময় ও সব সমাজের জন্য প্রযোজ্য নয়।
ফিকহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রে এই হাদিসের ভিত্তিতে অনেক ক্ল্যাসিক্যাল আলেম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব (খিলাফত) পুরুষদের জন্যই সংরক্ষিত রাখতে চেয়েছেন! ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক এবং ইমাম শাফির মতো আলেমরা এই মত পোষণ করেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তারা নারীকে সম্পূর্ণভাবে নেতৃত্ব থেকে বাদ দেননি। বিশেষ করে, ইমাম আবু হানিফা নারীদের বিচারক হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে। অন্যদিকে ইবনে জারির আল-তাবারির মতো আলেমরা আরো বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে বলেছেন—যোগ্যতা থাকলে নারী যেকোনো নেতৃত্বেই আসতে পারেন।
ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা দেখি, নারী নেতৃত্ব পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল না। আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.) শুধু একজন মহান ইসলামিক স্কলারই নন, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। তার মাধ্যমে অসংখ্য সাহাবী জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। পরবর্তীকালে মিসরের শাসক সুলতানা শাজার আল-দার ১২৫০ সালের দিকে কিছু সময়ের জন্য বাস্তবে ক্ষমতায় এসেছেন, যা দেখায় যে বাস্তব ইতিহাস অনেক সময় তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার চেয়ে বেশি নমনীয় ছিল।
আধুনিক যুগে এসে এই শিথিলতা আরো নতুন মাত্রা পেয়েছে। আজকের রাষ্ট্রব্যবস্থা আর প্রাচীন খিলাফত কাঠামোর মতো নয়; এখানে ক্ষমতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক, সংবিধান ও জবাবদিহির মাধ্যমে পরিচালিত। এই প্রেক্ষাপটে বহু মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নারী সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বেনজির ভুট্টো মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। আবার বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় মেগাবতি সুকর্ণপুত্রি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও তারা নিজেদের বাবা কিংবা স্বামীর বদৌলতে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের পদ অলংকৃত করেছেন কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশের আলেম সমাজ এটাকে অবৈধ ঘোষণা করেনি। বরং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দুটি প্রধান ধারার ইসলামি দল অংশগ্রহণ করে!
সবকিছু বিবেচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নারী নেতৃত্ব প্রশ্নটি ইসলামে একটি ‘ইজতিহাদি’ বা ব্যাখ্যাভিত্তিক বিষয়। এখানে কোরআনের মৌলিক নীতি হলো ন্যায়বিচার, যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতা; হাদিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা আছে, তবে তার ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে; ফিকহে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা সর্বজনীন নয়; আর আধুনিক বাস্তবতা দেখাচ্ছে—নারী নেতৃত্ব কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
অতএব, নারী নেতৃত্বকে একেবারে হারাম বা নিঃশর্তভাবে বৈধ—এই দুই চরম অবস্থানের যেকোনো একটি গ্রহণ না করে বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। যেখানে বিবেচনা করা হবে—ব্যক্তির যোগ্যতা, সমাজের প্রেক্ষাপট এবং ন্যায়বিচারের নীতিমালা কতটা রক্ষা করা হচ্ছে। ইসলামের মূল চেতনা যেহেতু ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা, তাই নেতৃত্বের প্রশ্নেও সেই চেতনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
লেখক : কলামিস্ট