যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু পরিবর্তন ঘটে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর আমেরিকাকেন্দ্রিক একমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থা থেকে বের হয়ে বহুমুখী শক্তির ভারসাম্যপূর্ণ এক বহুমাত্রিক বিশ্বের পথে অগ্রসর হওয়া। এটিকে ইউরোপের কৌশলগত হেজিংয়ের (Strategic Hedging) শুরু হিসেবে দেখা যায়। কৌশলগত হেজিং ধারণাটি এখন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বিশ্লেষণে সমাধিক পরিচিতি লাভ করেছে।
তাত্ত্বিকভাবে, কৌশলগত হেজিং হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রগুলো কোনো একক পরাশক্তির সঙ্গে কঠোরভাবে জোটবদ্ধ হওয়া এড়িয়ে চলে। এটি মূলত ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা, রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী বা মিশ্র নীতি অনুসরণের একটি প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য হলো অংশীদারত্বের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে নিজস্ব কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সুযোগগুলো অক্ষুণ্ণ রাখা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ না করেও নিজেদের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy) নিশ্চিত করতে চাইছে। ইউরোপের এই গতিধারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অনুসৃত হেজিং কৌশলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। আসিয়ান দেশগুলোর মতো ইউরোপও এখন ‘চীন হুমকি’র মার্কিন বয়ান সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করছে না, আবার বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকেও উপেক্ষা করছে না। বরং তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বেছে নিয়েছে—যেখানে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে, আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তার পথটিও খোলা রাখা হয়েছে।
কয়েক দশক ধরে ইউরোপের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি ছিল ন্যাটোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও সামরিক সমন্বয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সামরিক পদক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক চাপ এই আস্থার ভিত্তিকে ক্ষুণ্ণ করেছে। যদিও এই ক্ষয়ের শুরু হয়েছিল ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময়, তবে ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ একে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে। জনমতেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট; সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, প্রায় ২০ শতাংশ ইউরোপীয় এখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রকেই তাদের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে, যা প্রথাগত ট্রান্স-আটলান্টিক ঐক্যের ধারণায় এক বিরাট ফাটল।
ইউরোপের এই হেজিং কৌশল মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব সৃষ্টি (Institutional Distancing)। ইউরোপ এখন ওয়াশিংটনের সামরিক অগ্রাধিকারগুলো থেকে নিজেদের স্পষ্টত আলাদা করছে। ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিঃশর্ত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছিল, ইউরোপীয় নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে এটি ‘ইউরোপের যুদ্ধ নয়’। এ কথাটির মাধ্যমেই ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে একটি মৌলিক বিভাজন উন্মোচিত হয়। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে, ওয়াশিংটন যখন ইসরাইলের স্বার্থে ইরানের ক্ষমতার পরিবর্তন বা নিরস্ত্রীকরণকে গুরুত্ব দিচ্ছে, ইউরোপের অগ্রাধিকার তখন নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। এর বড় প্রমাণ মেলে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে, যখন ইউরোপীয় মন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন সেন্টিনেল’-এর বিকল্প হিসেবে নিজেদের সামুদ্রিক মিশন ‘অপারেশন আগেনুর’ (Operation Agenor) সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। এর মাধ্যমে বার্তা পরিষ্কার যে, তারা তাদের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সঙ্গে আবদ্ধ রাখতে আগ্রহী নয়। এছাড়া, এপ্রিল মাসে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের বেইজিং সফর এবং সেখানে চীনের সক্রিয় বৈশ্বিক ভূমিকার আহ্বান ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের একটি বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠন (Economic Rebalancing)। ইরান যুদ্ধ যখন বৈশ্বিক বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে, ইউরোপ তখন চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক হেজিং জোরদার করছে। বছরের শুরুতেই যুক্তরাজ্য, ফিনল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীদের বেইজিং সফর অর্থনৈতিক ‘কৌশলগত পারস্পরিক নির্ভরশীলতা’র ইঙ্গিত দেয়। লন্ডনের পক্ষ থেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং সবুজ প্রযুক্তিতে অংশীদারত্বের প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করে যে তারা চীনের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে উপেক্ষা করতে রাজি নয়। একইভাবে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মেৎসের চীন সফর, যেখানে একটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল তার সঙ্গে ছিল—এই ইঙ্গিত দেয় যে, জার্মানি তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থকে বহুমুখীকরণের দিকে আগাচ্ছে এবং বার্লিন ওয়াশিংটনের চাপের মুখে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নয়।
তৃতীয়ত, বহুমুখী কূটনীতি (Multi-vector Diplomacy)। ইরান যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় ইউরোপ ক্রমেই আঞ্চলিক বা মধ্যম শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যেমন তুরস্ক, সৌদি আরব এবং ভারতের দিকে ঝুঁকছে। এটির মাধ্যমে তারা ঐতিহ্যগত আটলান্টিকপন্থি ঐকমত্যকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প কূটনৈতিক পথ খোলা রাখছে, যা হেজিং ধারণার অন্যতম। সাম্প্রতিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কালাস ইস্তাম্বুলে একটি কূটনৈতিক সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছেন—যেখানে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তাকারী হিসেবে চীন এবং ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে একটি স্থিতিশীল জোট গঠন করা, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হবে না। এর কারণ বর্তমানে ইউরোপের অনেক দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে নিরাপত্তার চেয়ে উত্তেজনার উৎস হিসেবেই বেশি দেখছে।
সার্বিকভাবে, এই ঘটনাপ্রবাহ ১৯৪৫ সালের পর পশ্চিমা জোটব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তা অংশীদার এবং চীনকে অপরিহার্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে ইউরোপ কার্যত সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের মতো হেজিং কৌশলের পথে হাঁটছে।
এসব ঘটনা এক করলে এবং সাম্প্রতিক নানা কার্যক্রমে এটি পরিষ্কার যে ইউরোপ পররাষ্ট্র নীতি প্রণয়নে এক যুগসন্ধিক্ষণের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে; যাকে ১৯৪৫ সালের পর পশ্চিমা জোটব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তা অংশীদার এবং চীনকে অপরিহার্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে ইউরোপ কার্যত সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের মতো হেজিং কৌশলের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ এই পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে; এর ফলে ইউরোপ এখন নিজেকে আর যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন কোনো কৌশলগত অভিযানের অধীন অংশীদার হিসেবে নয়, বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় একটি সার্বভৌম মেরু (sovereign pole) হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এখন ঝুঁকিনির্ভর সম্পৃক্ততা (Risk-Contingent Engagement ) নীতির মাধ্যমে ইউরোপীয় শান্তি এবং স্থিতিশীলতাকে ট্রান্সআটলান্টিক ঐক্যের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে এ কথাও মনে রাখা জরুরি, ইউরোপ ট্রান্সআটলান্টিক অংশীদারত্ব পরিত্যাগ করছে না; বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এখানে ইউরোপ আর একক কোনো রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ মিত্র না; বরং অধিক স্বায়ত্তশাসিত কৌশলগত এক খেলোয়াড়, যার চোখ এক ক্রমবর্ধমান বহুমেরুকেন্দিক বিশ্বব্যবস্থায়।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব কম্বোডিয়া, কম্বোডিয়া