হোম > ইসলাম ও জীবন

একনজরে কোরবানির জরুরি মাসায়েল

মুফতি আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী

কোরবানি। একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কোরবানি মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্যের এক অনন্য স্মারক। মিল্লাতে ইবরাহিমের পরিচায়ক। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিআর বা নিদর্শন।

কোরবানির পরিচয়

কোরবানি শব্দটি ‘কুরব’ থেকে এসেছে। যার শাব্দিক অর্থÑনৈকট্য অর্জন করা। পরিভাষায় কোরবানি হলো জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সূর্যোদয় থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট জন্তু জবাই করা।

কোরবানির গুরুত্ব

সামর্থ্যবান প্রতিটি ব্যক্তির ওপর কোরবানি অবশ্য পালনীয় একটি ইবাদত। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না, তার ব্যাপারে হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যার কোরবানির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম : ৩৫১৯)

কোরবানির ফজিলত

এক হাদিসে এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ফাতেমা (রা.)-কে তার কোরবানির কাছে উপস্থিত থাকতে বলেন এবং ইরশাদ করেন, এই কোরবানির প্রথম রক্তবিন্দু প্রবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহতায়ালা তোমার গুনাহগুলোকে ক্ষমা করে দেবেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটা কি শুধু আহলে বায়তের (নবী পরিবার), নাকি সব মুসলিমের জন্য? তিনি উত্তরে বললেন, এই ফজিলত সব মুসলিমের জন্য।’ (তারগিব ওয়াত তারহিব : ২/১৫৪)

কার ওপর কোরবানি ওয়াজিব

প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। টাকাপয়সা, সোনারুপা, অলংকার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

আর নিসাব হলো স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে ৭ (৭ দশমিক ৫) ভরি, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে ৫২ (৫২ দশমিক ৫) ভরি, টাকাপয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো এর মূল্য সাড়ে ৫২ তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রুপা কিংবা টাকাপয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে; কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে ৫২ তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাহলেও তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। (আলমুহিতুল বুরহানি : ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ১৭/৪০৫)

নেসাবের মেয়াদ

কোরবানির নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কোরবানির তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দিন থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২)

কোরবানির সময়

মোট তিন দিন কোরবানি করা যায়। জিলহজের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে জিলহজের ১০ তারিখেই কোরবানি করা উত্তম। (মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮)

দরিদ্র ব্যক্তির কোরবানির হুকুম

দরিদ্র ব্যক্তি মানে, যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, এমন ব্যক্তি যদি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু কিনে, তাহলে তা কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২)

কোরবানি কখন থেকে শুরু করা যাবে

যেসব এলাকার লোকদের ওপর জুমা ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব, তাদের জন্য ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা জায়েজ নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামাজ না হয়, তাহলে ঈদের নামাজের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কোরবানি করা জায়েজ। (বুখারি ২/৮৩২, কাজিখান ৩/৩৪৪)

রাতে কোরবানি করা যাবে

১০ ও ১১ তারিখ রাতেও কোরবানি করা জায়েজ। তবে দিনে কোরবানি করাই ভালো। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৪৯২৭; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩)

নির্ধারিত সময়ে কোরবানি করতে না পারলে

কোরবানির দিনগুলোয় যদি জবাই করতে না পারে, তাহলে কেনা পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে, তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায়, তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল, তা-ও সদকা করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১)

কোন কোন পশু দ্বারা কোরবানি করা যাবে

উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ নয়। (কাজিখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫)

নর ও মাদা পশুর কোরবানি

যেসব পশু কোরবানি করা জায়েজ, সেগুলোর নর-মাদা দুটোই কোরবানি করা যায়। (কাজিখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫)

কোরবানির পশুর বয়সসীমা

উট কমপক্ষে পাঁচ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে দুই বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি এক বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে এক বছরের মতো মনে হয়, তাহলে তা দ্বারাও কোরবানি করা জায়েজ। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে ছয় মাস বয়সের হতে হবে।

ছাগলের বয়স এক বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কোরবানি জায়েজ হবে না। (কাজিখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬)

এক পশুতে কতজন শরিক হতে পারবেন

একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কোরবানি দিতে পারবেন। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কোরবানি করলে কারোটাই সহিহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারবে। সাতের অধিক শরিক হলে কারো কোরবানি সহিহ হবে না। (সহিহ মুসলিম ১৩১৮ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮)

সাত শরিকের কোরবানি

সাতজনে মিলে কোরবানি করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরিকের কোরবানিই সহিহ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭)

উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কোরবানি করা জায়েজ। (সহিহ মুসলিম ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭)

অংশীদারি কোরবানিতে যে বিষয়ে লক্ষ রাখা জরুরি

যদি কেউ আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কোরবানি না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি করে, তাহলে তার কোরবানি সহিহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরিকদের কারো কোরবানি হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শরিক নির্বাচন করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাজিখান ৩/৩৪৯)

এমনিভাবে শরিকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয়, তাহলে কারো কোরবানি সহিহ হবে না। (মাবসুতুস সারাখসি-১০/১১৯৬ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী-৫/৩৪২)

খোঁড়া পশুর কোরবানি

যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না, এমন পশুর কোরবানি জায়েজ নয়। (সুনানে আবু দাউদ ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে)

রুগ্ণ ও দুর্বল পশুর কোরবানি

এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না, তা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ নয়। (জামে তিরমিজি ১/২৭৫ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪)

দাঁত নেই এমন পশুর কোরবানি

যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না, এমন পশু দ্বারাও কোরবানি করা জায়েজ নয়। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৫, আলমগীরী ৫/২৯৮)

যে পশুর শিং ভেঙে বা ফেটে গেছে

যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে পশুর কোরবানি জায়েজ নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি, সে পশু কোরবানি করা জায়েজ। (সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪)

কান বা লেজ কাটা পশুর কোরবানি

যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা, সে পশুর কোরবানি জায়েজ নয়। আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে, তাহলে তার কোরবানি জায়েজ। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয়, তাহলে অসুবিধা নেই। (জামে তিরমিজি ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ ১/৬১০)

অন্ধ পশুর কোরবানি

যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট, সে পশু কোরবানি করা জায়েজ নয়। (জামে তিরমিজি ১/২৭৫ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪)

গর্ভবতী পশুর কোরবানি

গর্ভবতী পশু কোরবানি করা জায়েজ। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায়, তাহলে সেটিও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কোরবানি করা মাকরুহ। (কাজিখান ৩/৩৫০)

নিজের কোরবানির পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কোরবানিদাতা পুরুষ হলে জবাই স্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো। (মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩)

জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরিক হলে

অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ জবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে, তবে ওই কোরবানি সহিহ হবে না এবং জবাই করা পশুও হালাল হবে না। (রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪)

কোনো শরিকের মৃত্যু ঘটলে

কয়েকজন মিলে কোরবানি করার ক্ষেত্রে জবাইয়ের আগে কোনো শরিকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানি করার অনুমতি দেন, তবে তা জায়েজ হবে। নতুবা ওই শরিকের টাকা ফেরত দিতে হবে। অবশ্য তার স্থলে অন্যকে শরিক করা যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬)

মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানি

মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানি করা জায়েজ। মৃত ব্যক্তি যদি অসিয়ত না করে থাকেন, তবে সেটি নফল কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে। কোরবানির স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবেন এবং আত্মীয়স্বজনকেও দিতে পারবেন। আর যদি মৃত ব্যক্তি কোরবানির অসিয়ত করে গিয়ে থাকেন, তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবেন না। গরিব-মিসকিনদের মধ্যে সদকা করে দিতে হবে। (মুসনাদে আহমদ ১/১০৭, হাদিস ৮৪৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮)

অন্য কারো ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে চাইলে

অন্যের ওয়াজিব কোরবানি দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কোরবানি আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা বাবা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কোরবানি করে, তাহলে তাদের কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।

যে অবস্থায় বদলি হজের বিধান প্রযোজ্য

আরাফা দিবসের মর্যাদা ও করণীয়

কোরবানি : ইতিহাস থেকে শিক্ষা

বায়তুল মোকাররমে ঈদ জামাতের সময়সূচি ঘোষণা

সৌদি পৌঁছেছেন বাংলাদেশি ৭৩ হাজার ১৮২ হজযাত্রী

হজযাত্রীদের যে পরামর্শ দিল ধর্ম মন্ত্রণালয়

সৌদিতে পৌঁছেছেন বাংলাদেশি ৭৮,৫০০ হজযাত্রী, শেষ ফ্লাইট কাল

জিলহজের প্রথম ১০ দিন যে ১০ আমল

সৌদিতে পৌঁছেছেন বাংলাদেশি ৬৩,২৬১ হজযাত্রী

আলেমদের ওপর অত্যাচার-জুলুম হতে দেবো না: ধর্মমন্ত্রী