ক্যারিবীয় সাগরের বুকে ভেসে থাকা ছোট্ট এক দ্বীপ ‘কুরাসাও’। মানচিত্রে যার অবস্থান খুঁজে বের করতে অনেকেরই সময় লাগে, সে দেশটাই আজ ফুটবল বিশ্বের অনুপ্রেরণার নাম। তাদের নেই ব্রাজিলের মতো পাঁচটি বিশ্বকাপ, নেই আর্জেন্টিনার মতো কিংবদন্তির ইতিহাস, নেই ইউরোপের পরাশক্তিদের মতো অঢেল অর্থ বা বিশাল স্টেডিয়াম। তবুও আজ পৃথিবী তাদের গল্প শুনছে। যে গল্পের দৈর্ঘ্য ট্রফি দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। কিছু গল্প লেখা হয় বিশ্বাস, কান্না আর অসম্ভবকে জয় করার সাহস দিয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে কুরাসাও শুধু ফুটবল মঞ্চেই ওঠেনি, তারা প্রমাণ করেছে স্বপ্নের কোনো সীমানা নেই।
কুরাসাও অধিনায়ক লিয়ান্দ্রো বাকুনা যখন ফিফার সামনে বসে কথা বলছিলেন, তার চোখে-মুখে তখন ছিল দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি, গর্ব আর এক অদ্ভুত শান্তি। কারণ, তিনি জানেন এ গল্পটা শুধু ফুটবলের নয়; এটা একটি জাতির আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। ‘এটা খুব সুন্দর একটি গল্প। ছোট্ট একটি দ্বীপের গল্প, কিন্তু আমাদের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। প্রায় ১০ বছর আগে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করি যে, একদিন আমরা বিশ্বকাপে খেলব। তখন সেটা ছিল শুধু স্বপ্ন… আজ সেটা বাস্তব’Ñবলছিলেন বাকুনা। এ বাস্তবতা একদিনে আসেনি। অনেক ব্যর্থতা, হতাশা আর উপহাস পেরিয়ে এখানে পৌঁছেছে কুরাসাও।
২০১৬ সালে বার্বাডোজের কাছে ১-০ গোলে হার। ২০১৭ গোল্ডকাপে টানা তিন পরাজয়। প্রতিবারই যেন পৃথিবী বলছিল—‘তোমরা এখানে মানাও না’। কিন্তু কুরাসাও থামেনি। কারণ, তারা জানত বড় দল হওয়ার আগে বড় বিশ্বাসী হতে হয়। ইউরোপের নানা শহরে বেড়ে ওঠা ফুটবলাররা একে একে ফিরে এসেছিল নিজেদের শিকড়ে। নেদারল্যান্ডসের ক্লাব ফুটবল থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের কঠিন লড়াই—সবকিছু ছেড়ে তারা এসে দাঁড়িয়েছিল নীল জার্সির নিচে। যে জার্সি শুধু একটি দেশের প্রতীকই ছিল না, ছিল মাতৃভূমির ডাকও।
বাকুনা আর তার ভাই জুনিনহোর গল্পটাও যেন সিনেমার মতো। বাকুনা আগে জাতীয় দলে যোগ দিয়েছিলেন। তখন জুনিনহো অপেক্ষা করছিলেন নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলে সুযোগের আশায়। একদিন বড় ভাইয়ের ফোন। ছোট্ট এক কথা। আর তাতেই বদলে গিয়েছিল ছোট ভাইয়ের লক্ষ্য। বদলে দিয়েছিল ইতিহাস। তাদের পরিবারই ফুটবলের আঁতুড়ঘর। বাবা-মা দুজনই ফুটবল খেলতেন। সপ্তাহান্ত মানেই ছিল খেলা, অনুশীলন, স্বপ্ন আর লড়াই। এ স্বপ্নের পেছনে যারা ছুটছিলেন, তাদের ভাষা আলাদা, জন্মস্থান আলাদা, বেড়ে ওঠাও আলাদা; কিন্তু হৃদয়ের ঠিকানাটা ছিল এক। বাকুনার ভাষায়, ‘এ দলে এলে সবাই পরিবার মনে করে। যদি হৃদয় থেকে এমন অনুভূতি না আসে, তাহলে এ দলের অংশ হওয়া সম্ভব নয়।’
তারপর এলেন ডিক অ্যাডভোকাট। অভিজ্ঞ এই ডাচ কোচ এলেন আলোকবর্তিকা হাতে। তিনি খেলোয়াড়দের আনন্দ কেড়ে নেননি। বরং শিখিয়েছিলেন, আনন্দের মাঝেও কীভাবে জয়ের ক্ষুধা ধরে রাখতে হয়। বাকুনার ভাষায়, ‘তিনি বলেছিলেন, ‘হাসো, আনন্দ করো… কিন্তু মাঠে নামলে ফল নিয়ে ফিরতে হবে। তিনি আমাদের বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন যে, আমরা সত্যিই পারব।’
তারপর এলো সেই রাত। যে রাতের কথা কুরাসাও হয়তো কোনোদিন ভুলবে না। জ্যামাইকার বিপক্ষে সে ম্যাচে পুরো একটি দেশ যেন নিঃশ্বাস আটকে বসে ছিল। বল পোস্টে লেগেছে, প্রতিপক্ষ আক্রমণ করেছে, সময় থমকে গেছে বারবার; কিন্তু কুরাসাওর গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গোলরক্ষক যেন শুধু বলই ঠেকাচ্ছিলেন না, ঠেকাচ্ছিলেন একটি জাতির ভেঙে পড়া স্বপ্নও। শেষ বাঁশি বাজতেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ফুটবলাররা। গ্যালারিতেও আনন্দাশ্রু।
সামনে স্বপ্নের মহামঞ্চ। জার্মানি, ইকুয়েডর, আইভরি কোস্টের মতো দলের বিপক্ষে মাঠে নামবে কুরাসাও। অনেকে হয়তো তাদের আন্ডারডগ বলবে। কিন্তু ‘ভয়’ শব্দটা যেন এ দলের অভিধানে নেই। বাকুনা যেমন বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা প্রথমবার যাচ্ছি। কিন্তু আমরা কাউকে ভয় পাই না। আমরা সেখানে গিয়ে শুধু হারতে চাই না। আমরা দেখাতে চাই কেন আমরা বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছি।’
বিশ্বকাপের টানেলে দেশের পতাকা হাতে হাঁটার মুহূর্তটা এখনো কল্পনা করেন কুরাসাও অধিনায়ক। ৩৪ বছর বয়সি এই মিডফিল্ডার জানেন, ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে এরচেয়ে সুন্দর উপহার আর হতে পারে না। হয়তো কুরাসাও বিশ্বকাপ জিতবে না। হয়তো ট্রফি তাদের হাতে উঠবে না; কিন্তু কিছু গল্প ট্রফির জন্য বাঁচে না। কিছু গল্প পৃথিবী মনে রাখে শুধু হৃদয়ের জন্য। কুরাসাওর গল্পটা ঠিক তেমনই। একটি ছোট্ট দ্বীপের গল্প, যারা পৃথিবীকে শিখিয়ে দিয়েছে—স্বপ্ন দেখার জন্য বড় দেশ লাগে না, লাগে সাহস আর বিশ্বজয়ের মনোবল।