যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবের জবাব দিতে ১০ দিন সময় নিয়েছিল ইরান। গত রোববার তেহরানের পক্ষ থেকে সেই দাবিদাওয়া পাঠানো হয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আত্মসমনর্পণের চাপ সত্ত্বেও ইরান যে এই যুদ্ধে নিজেদের জয়ী ভাবছে এবং সে অনুযায়ী সুবিধা আদায় করতে চায়, তাদের এই জবাবে সেই ইঙ্গিতই মিলেছে।
চলমান আলোচনার সঠিক শর্তগুলো কোনো পক্ষই জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরান তাদের জবাবে যুদ্ধ সম্পূর্ণ অবসান, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
ইরানের এই পাল্টা প্রস্তাবকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তিনি একে ‘এক টুকরো আবর্জনা’ বলে অভিহিত করেছেন।
১০ সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই তেহরান কোনো ধরনের নতি স্বীকার না করার কৌশল অবলম্বন করে আসছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তারা ভাবছে আমি ক্লান্ত বা বিরক্ত হয়ে যাব কিংবা চাপে পড়ব। কিন্তু এখানে কোনো চাপই নেই। আমরা পূর্ণাঙ্গ বিজয় অর্জন করতে যাচ্ছি।’
তিনি আরো অভিযোগ করেন, দুই পক্ষ কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর কাছাকাছি গেলেও ইরানের নেতারা ‘মন পরিবর্তন’ করে ফেলেন। মূলত মার্কিন দাবি পূরণে ইরানি সামরিক বাহিনীর অসম্মতির কারণেই এমনটা ঘটছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থার মূল কারণ দুই পক্ষের ভিন্ন অগ্রাধিকার। ট্রাম্প যেখানে একটি ‘দ্রুত ও সহজ’ বিজয় চান, যার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অবিলম্বে বন্ধের শর্ত রয়েছে; সেখানে তেহরান আগে নিজেদের সুবিধা আদায় করতে চায়। ইরান ধাপে ধাপে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে, যার শুরুতে থাকবে যুদ্ধের অবসান ও অবরোধ প্রত্যাহার এবং পরের ধাপে থাকবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা। পক্ষান্তরে, ট্রাম্প চান ইরান অন্তত ১০ বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করুক এবং তাদের কাছে থাকা আনুমানিক ৪৪০ কেজি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করুক।
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘এখানে দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বুঝতে পারছেন না কেন এই লোকেরা নিজেদের বাঁচাতে চুক্তিতে আসছে না। তারা চুক্তির শুরুতে ট্রাম্পকে কোনো ছাড় দেবে না, কারণ তারা তাকে বিশ্বাস করে না।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ‘ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই দ্বিমত মূলত এক পক্ষের মৌলিক অধিকারের দাবি এবং অন্য পক্ষের অধিকার লঙ্ঘনের জিদের কারণে।’
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইরান সরকারের এই জবাব এমন এক নেতৃত্বের মানসিকতা প্রকাশ করে, যারা বিশ্বাস করে তারা যুদ্ধে টিকে গেছে এবং জয়ী হয়েছে, হেরে যায়নি। ফলে তাদের দাবি এখনো অনেক উঁচুতে।’
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যেন নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে না পারে, সে জন্য শক্ত গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা চাইছে ইরান। এ লক্ষ্যে তেহরান বেইজিংকে এই চুক্তির জামিনদার করার প্রস্তাব দিয়েছে। গত সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বেইজিং সফর করেছেন।
বেইজিংয়ে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত আবদোলরেজা রহমান ফাজলি এক পোস্টে বলেন, ‘যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই পরাশক্তিদের গ্যারান্টি থাকতে হবে এবং এটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও উত্থাপন করতে হবে।’
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ‘অনন্তকাল ধরে চলা যুদ্ধ’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার প্রচার চালালেও ইরান তাকে একটি ব্যয়বহুল ফাঁদে ফেলেছে। এক মাসেরও বেশি সময় আগে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকটি নৌ সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কয়েক সপ্তাহের শান্ত পরিস্থিতির পর এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর ইরান আবারও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
এই আলোচনার অচলাবস্থার মধ্যে ট্রাম্প সোমবার মন্তব্য করেছেন, যুদ্ধবিরতিটি এখন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি বলব যুদ্ধবিরতিটি এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে।’
অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই অসন্তুষ্টিতে ইরানের সামরিক বাহিনী মোটেও চিন্তিত নয় বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি এক্স-এ লিখেছেন, ‘ইরানে কেউই ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য পরিকল্পনা করছে না। আলোচনাকারী দলকে এমন পরিকল্পনা করতে হবে যা কেবল ইরানের অধিকারকে সম্মান জানায়, আর ট্রাম্প এতে অসন্তুষ্ট হলেই স্বাভাবিকভাবে তা বেশি ভালো হবে।’
সূত্র: সিএনএন
এএম