বাংলাদেশ সীমান্তে একতরফাভাবে কাঁটাতারের বেড়া দিতে যাচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি প্রথমবারের মতো পশ্চিমঙ্গের শাসকের আসনে বসেই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলোচনা না করে সীমান্ত ঘেরাও কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। এজন্য রাজ্য সরকার তার প্রথম কেবিনেট বৈঠকে বিএসএফকে (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) ৪৫ দিনের মধ্যে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এ সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক রাজনীতি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। এদিকে, এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার পদক্ষেপে কড়া বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার কাঁটাতারের বেড়াকে ভয় পায় না বলে হুঁশিয়ার করে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়, এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে ভারতকে বিরত থাকতে হবে। সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা করে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা হবে, তেমন পরিস্থিতি ঢাকা আর হতে দেবে না।
গত শনিবার শপথ নেওয়ার দুদিনের মাথায় গতকাল নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক বসেছিল। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পশ্চিমবঙ্গে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে থাকা আন্তর্জাতিক সীমান্তের যেসব অংশে এখনো কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেসব অংশে বেড়া দেওয়ার জন্য ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের কাছে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর করা হবে।
বৈঠকের পর বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে গণমাধ্যমকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, এটা না করা গেলে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা পরিবর্তন ও সুরক্ষা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সুরক্ষার প্রশ্ন এবং যেভাবে জনবিন্যাস বদলে গেছে, তার জন্য প্রথম দিনেই আমরা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর ও বিএসএফকে সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য জমি ট্রান্সফার প্রক্রিয়ার অনুমোদন দিলাম। ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্য সচিবকে এ দায়িত্ব দেওয়া হলো। ৪৫ দিনের মধ্যে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুই হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৬৪৮ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। বাকি ৫৬৯ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নেই।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একতরফাভাবে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার পদক্ষেপের বিষয়ে দিল্লির সঙ্গে আলোচনা করার কথা জানিয়েছে ঢাকা। শুভেন্দু ‘সরকারের’ কাঁটাতাদের বেড়া দেওয়ার উদ্যোগের বিষয়ে গতকাল গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা অবশ্যই বিষয়টি নিয়ে সঠিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব। আপনি সীমান্তে গুলি করে মানুষ মেরে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখবেন, যা আমরা হাসিনার সময় দেখেছিÑসে পরিস্থিতি আর হতে দেবে না বাংলাদেশ।
পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কড়া বার্তা দিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, কাঁটাতারের বেড়ার ভয় দেখিয়ে এখন আর বাংলাদেশকে কবজায় নেওয়া সম্ভব নয়। এ দেশের জনগণ ও সরকার কাঁটাতারের বেড়াকে কোনোভাবেই ভয় পায় না। বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়Ñএমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে ভারতকে বিরত থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী কোনো দেশই শূন্যরেখা বা জিরোলাইন থেকে ১৫০ গজের (১৩৭ মিটার) মধ্যে কোনো স্থায়ী প্রতিরক্ষা অবকাঠামো বা বেড়া নির্মাণ করতে পারে না। আর কোনো দেশ ১৫০ গজের ভেতরে বেড়া দিতে চাইলে অবশ্যই অপর রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে লিখিত অনুমতি নিতে হয়। ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতেও (বাংলাদেশ-ভারত) এ বিধান রয়েছে।
এদিকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নতুন সরকারের প্রথম বৈঠক ঘিরে পশ্চিমবঙ্গবাসীর আকাশচুম্বী প্রত্যাশা থাকলেও নবান্নের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে উন্নয়নের কোনো দিশা মেলেনি। চেনা ছকেই পথচলা শুরু করছে প্রথমবারের মতো রাজ্য শাসনের দায়িত্ব পাওয়া বিজেপি। বাংলার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন বা কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে সেই পুরোনো মেরূকরণের রাজনীতিকেই প্রাধান্য দেন শুভেন্দু অধিকারী। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ক্যাবিনেট বৈঠক হয়ে গেলেও মন্ত্রিসভার সদস্যদের কার হাতে কোন দপ্তর থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত দলটির পক্ষ থেকে দপ্তর বণ্টনের কোনো তালিকা প্রকাশ না করাতেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, সরকার চালানোর চেয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামলাতেই বেশি ব্যস্ত তারা।
দপ্তর বণ্টন নিয়ে নীরবতা থাকলেও সাংবাদিকদের সামনে মুখ্যমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন বাংলাদেশ সীমান্ত ইস্যুকে। তিনি ঘোষণা করেন, সীমান্ত কাঁটাতার দিয়ে সম্পূর্ণভাবে ঘিরে ফেলার জন্য রাজ্য সরকার দ্রুত বিএসএফকে প্রয়োজনীয় জমি দেবে। বিগত তৃণমূল সরকার যে জমি জট তৈরি করে রেখেছিল, তা তার সরকার অবিলম্বে মিটিয়ে দেবে এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিএসএফকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
শুভেন্দু অধিকারীর এ ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছেÑবাংলাদেশ সীমান্ত কি তবে সত্যিই অরক্ষিত? এতদিন বিএসএফ সেখানে তাহলে কী ভূমিকা পালন করছিল? সীমান্ত পাহারার মূল দায়িত্ব বিএসএফের হলেও তারা বারবার রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার দোহাই দিয়ে এসেছে। এখন বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর জমি প্রদানকে উন্নয়নের সমার্থক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে।
তবে এ যুক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে বড় ধরনের ধোঁয়াশা। যদি সীমান্ত এতটাই অরক্ষিত হয়, তবে নিউ টাউনের মতো অভিজাত এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা কীভাবে দিনের পর দিন আশ্রয় পাচ্ছেন ও থাকছেন। তাদের সুরক্ষা প্রদান ও যাতায়াতের পেছনে কাদের হাত রয়েছে, সে রহস্যের সমাধানও মুখ্যমন্ত্রী করেননি। বিএসএফ এতদিন সীমান্তে নজরদারি চালালেও পাচার ও অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে তারা কতটা সফল হয়েছে, সে প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
উন্নয়নের প্রকৃত ব্লুপ্রিন্ট না দিয়ে বিজেপি কেবল একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইছে, যা রাজ্যের সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে। দপ্তর বণ্টনহীন একটি মন্ত্রিসভা থেকে আপাতত সীমান্ত বিতর্ক ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার নেই রাজ্যের মানুষের।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু এদিন বলেন, পশ্চিমবঙ্গে সুশাসন, সুরক্ষা ও ডাবল ইঞ্জিন সরকারের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে, তা দেশের অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যের উন্নয়নের পথ অনুসরণ করেই এগোবে। অর্থাৎ এখানেও যে বুলডোজার-রাজ চলবে তা তিনি ইঙ্গিতে বলে দিলেন।
বিজেপির দাবি অনুসারে, সীমান্তের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোয় হিন্দু-মুসলিম বাসিন্দাদের অনুপাত বদলানোর অভিযোগ বিস্তর। বাংলায় অনুপ্রবেশকারী রুখতে সীমান্ত সিল করার কথা আগেই বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে বারবার তাদের মুখে উঠে আসে বাংলার সীমান্তলাগোয়া অঞ্চলে জনবিন্যাসের বদলের প্রসঙ্গ। এবার বাংলায় নতুন সরকার গঠনের পরই প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে শুভেন্দুর মুখেও একই কথা।
শুভেন্দু এদিন সাংবাদিকদের আরো জানান, ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’, ‘বিশ্বকর্মা যোজনা’, ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হবে রাজ্য। রাজ্যের আইপিএস, আইএএসরা কেন্দ্রের কোনো ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে পারতেন না। এবার থেকে চাইলে তারা পারবেন। সরকারি চাকরিতে আবেদনকারীর বয়সের ঊর্ধ্বসীমা পাঁচ বছর বাড়ানো হলো। তবে যেসব কেন্দ্রীয় প্রকল্পের কথা তিনি বলছেন, সেগুলো ইউপি, আসামের মতো বিজেপি শাসনাধীন রাজ্যেই আজ পর্যন্ত ঠিকমতো চালু নেই। মুখথুবড়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও কি তেমন কিছু হতে চলেছে? সেদিকেই নজর থাকবে সবার।
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভা নির্বাচনে বিজেপির নির্বাচনি প্রচারের অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যু ছিল তথাকথিত অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো। এর ওপর ভিত্তি করেই তারা এসআইআর করে এবং ৯১ লাখ নাম ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলে জয়ের পথ সুগম করে। বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল সরকারের সময় পশ্চিমবঙ্গের আন্তর্জাতিক সীমান্ত অরক্ষিত ছিল এবং সে সুযোগে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ থেকে বিদেশিরা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে ভোটের বিনিময়ে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। যদিও এসআইআর করে কতজন রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি খুঁজে পেয়েছে বিজেপি সরকার, তা আজ পর্যন্ত জানাতে পারেনি।
এর আগে ক্ষমতায় থাকাকালে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সীমান্তে বেড়া নির্মাণে রাজ্য সরকারের বাধা দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্র ও বিজেপির অভিযোগ জোরগলায় প্রত্যাখ্যান করে এবং দাবি করে, বিএসএফসহ সব কেন্দ্রীয় সংস্থা ও এজেন্সিকে ইতোমধ্যে জমি দেওয়া হয়েছে। জলপাইগুড়ি বিন্নাগুড়ি, মালদার নারায়ণপুর ও নদিয়ার করিমপুরেও জমি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিজেপির তথাকথিত অনুপ্রবেশ জুজু দেখানোর অভ্যাস কখনোই বদলায়নি।