হুমকির মুখে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত এখন দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার চাপে ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার চিরচেনা রূপ। একসময় সবুজ ঘাসে ঢাকা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, আঁকাবাঁকা খাল আর বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির মিলনে যে সৈকত পর্যটকদের মুগ্ধ করত, আজ সেখানে চোখে পড়ে পলিথিন, প্লাস্টিক, ময়লা-আবর্জনা আর অপরিকল্পিত স্থাপনার ভয়াবহচিত্র। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হুমকির মুখে পড়বে গুলিয়াখালীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গুলিয়াখালী সৈকতের মূল সৌন্দর্য ছিল সবুজ ঘাসে মোড়ানো বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, যেন সাগরের বুকে বিছিয়ে রাখা সবুজের বিশাল গালিচা। কিন্তু বর্তমানে সেই সৌন্দর্যের বুক চিরে গড়ে উঠেছে অবৈধ দোকানপাট, অস্থায়ী স্থাপনা ও বর্জ্যের স্তূপ। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায় প্লাস্টিক বোতল, খাবারের প্যাকেট, পলিথিন ব্যাগসহ নানা ধরনের আবর্জনা।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং অসচেতন পর্যটকদের আচরণে দিন দিন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে গুলিয়াখালীর পরিবেশ। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম হলেও নেই পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। অনেক পর্যটক খাবারের প্যাকেট ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলে চলে যাওয়ায় দূষিত হচ্ছে পুরো এলাকা।
তাদের মতে, সৈকতের বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি করে তৈরি হওয়া গর্তগুলোতেও ফেলা হচ্ছে পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনা। এতে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নষ্ট হচ্ছে না, পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সম্প্রতি পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনার পর প্রশাসন গুলিয়াখালী সৈকতে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। প্রশাসনের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও স্থানীয়দের দাবি, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই দায়িত্ব শেষ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া গুলিয়াখালীর পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, গুলিয়াখালী বিচ সরকারি সম্পত্তি। সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যটন পুলিশের ক্যাম্প, গণশৌচাগার, বসার স্থান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ডিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাফা) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি প্রফেসর মনজুরুল কিবরিয়া আমার দেশকে বলেন, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা গুলিয়াখালী বিচ বাংলাদেশের জন্য একটি চমৎকার ও ইউনিক পর্যটন স্পট। এটিকে সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এসব প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি না। পর্যটকরা যত্রতত্র চলাচল ও অব্যবস্থাপনার মধ্যে বিচ ব্যবহার করছেন। পর্যটন করপোরেশনের উচিত এটি নিয়মিত তদারকি করা এবং এখানে পর্যটন পুলিশ নিয়োগ দেওয়া। পাশাপাশি আশপাশে যেন কোনোভাবেই অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে, সেদিকেও কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কিছু ব্যক্তি সৈকতের সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধভাবে দোকানপাট ও স্থাপনা গড়ে তুলেছিল। একই সঙ্গে বখাটেদের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত পার্কিং ভাড়া আদায় এবং পর্যটকদের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনাও বাড়ছিল। এতে পর্যটকদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছিল।
তবে উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের দাবিও উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করা এসব ব্যবসায়ীর বিকল্প ব্যবস্থা না করলে তারা মানবিক সংকটে পড়বেন।
রোববারের উচ্ছেদ অভিযানের সময় অনেক দোকানদারের কান্নার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ ভাঙা দোকানের টিন সরাচ্ছেন, কেউবা শেষ চেষ্টা করছেন মালামাল রক্ষার। ওই দৃশ্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, গুলিয়াখালীর সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সৈকতে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা, কঠোর নজরদারি এবং পর্যটকদের সচেতন করতে প্রচারণা চালুর দাবি জানিয়েছেন।
তাদের ভাষায়, গুলিয়াখালী শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি সীতাকুণ্ডের পরিচয়, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার প্রতীক। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় হারিয়ে যাবে প্রকৃতির এই অনন্য সৌন্দর্য। গুলিয়াখালীর বিস্তীর্ণ সবুজ অঞ্চল যেন প্রকৃতির তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস, যা রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।