হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

ইয়াবা করিডোর ও তামাকের জনপদ কক্সবাজার

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের জেলা কক্সবাজার। প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ জেলার সঙ্গে প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে জল ও স্থলপথে সীমান্ত রয়েছে। এ সীমান্ত দিয়েই বছরের পর বছর মিয়ানমার থেকে মাদক আসছে দেশে। মাদক ব্যবসা ঘিরে গড়ে উঠেছে আলাদা সাম্রাজ্য, যা জেলার প্রধান সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও কোটি কোটি টাকার ইয়াবা জব্দের পরও মাদকের প্রবাহ থামছে না। ফলে কক্সবাজার ইয়াবা পাচারের অন্যতম প্রধান করিডোর ও তামাক চাষের বিস্তৃত জনপদে পরিণত হয়েছে।

একদিকে মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা টেকনাফ-উখিয়া রুট দিয়ে অব্যাহত রয়েছে ইয়াবা পাচার, অন্যদিকে জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে তামাক চাষ। ফলে পর্যটনের জন্য পরিচিত কক্সবাজার ক্রমেই মাদক ও তামাকনির্ভর ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আজ রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে জেলার মানুষের দাবি, মাদক নির্মূলে প্রধানমন্ত্রী যেন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

জানা গেছে, গত এক বছরে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার পরিসংখ্যান রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। শুধু গত ৪ জুন রাতে উখিয়ার পালংখালী এলাকায় বিজিবির অভিযানে উদ্ধার হয় পাঁচ লাখ ১২ হাজার পিস ইয়াবা। মালিকবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ মাদক সীমান্তের ছিদ্রপথ কতটা বড় তা স্পষ্ট করে দেয়। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে মাত্র চার দিনের অভিযানে উদ্ধার হয় ১৫ লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বরেই দুটি পৃথক অভিযানে উখিয়া থেকে উদ্ধার হয় আরো সাড়ে চার লাখ পিস ইয়াবা।

এপ্রিলে টেকনাফের অরক্ষিত সীমান্তে মাত্র দুই দিনে উদ্ধার হয় ১৩ লাখ পিস। এছাড়া গত মাসে উখিয়া থেকে ২০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) এক কনস্টেবল, যা এ সংকটের গভীরতা সম্পর্কে একটি ভিন্ন বার্তা দেয়।

গত বছরের নভেম্বরে জেলা ও দায়রা জজ আদালত মাদক মামলার একটি ঐতিহাসিক রায় দেয়। ২০২০ সালে রামু থেকে এক লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক পাঁচ আসামির মধ্যে এক রোহিঙ্গাসহ দুজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুই রোহিঙ্গাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু রায় ঘোষণার সময় সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে মাত্র একজন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকিরা পলাতক। সাম্প্রতিক সাজাপ্রাপ্ত একাধিক পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে মামলার সংখ্যা বাড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পর্যটনের শহর, মাদকের করিডোর

বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দীন আহমেদ সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে মাদক চোরাচালানের প্রধান রুট কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত। এর ৮০ শতাংশই আসছে সাগরপথে।

টেকনাফ-২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, স্থলপথে কড়াকড়ি বাড়ায় কারবারিরা এখন বিকল্প রুট ব্যবহার করছে। নাফ নদ ও সমুদ্রপথে ট্রলারে করে মাদক আনা হচ্ছে। এছাড়া টেকনাফ-সেন্টমার্টিনকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। গত বছরের আগস্টে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মোহনায় নৌপথে আনার সময় র‌্যাব-১৫-এর অভিযানে চার লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবাসহ ৯ জনকে আটক করা হয়।

টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালী এলাকা থেকে প্রাইভেট কারে পাচার করার সময় একাধিকবার মাদক কারবারিরা ধরা পড়েছে। ইতোমধ্যে টেকনাফে সীমান্ত চোরাচালানের নেপথ্যে ‘সেভেন স্টার’ নামে একটি নেটওয়ার্কের কথাও উঠে এসেছে গণমাধ্যমে, যার সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কিছু অংশের যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে।

উখিয়ার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাতের বেলা ট্রলারের শব্দ, মোটরসাইকেলে মাল বহনÑএসব আমরা দেখি। কিন্তু কাউকে কিছু বলার সাহস নেই। টেকনাফের এক জেলে জানান, সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে মাঝে মাঝে সন্দেহজনক ট্রলারের মুখোমুখি হতে হয়, যারা জোরপূর্বক সরে যেতে বলে। স্থানীয়দের বড় অংশ একটি মনে করে, মূল হোতারা এতটা প্রভাবশালী যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সোচ্চার হওয়া সম্ভব নয়।

রামু এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, আমাদের ছেলেরা মাদকে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশের বাড়িতে ইয়াবা বিক্রি হয় তা আমরা জানি, থানায় গেলে কী হবে তাও জানি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কক্সবাজারের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল জেলার সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, ২০২২-২৫ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ১৪৪টি ইয়াবা মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ১০৩ জন আসামির সাজা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে ২৪ মামলায় ৩০ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, শুধু আইন দিয়ে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা না বদলালে সীমান্তে যতই অভিযান পরিচালনা করা হোক না কেন, তাতে বড় পরিবর্তন আসবে না।

তিনি জানান, উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজার শহরের প্রায় ২৮ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আর্থিক সংকটে ভোগে। বেকারদের কাছে ইয়াবা নেটওয়ার্ক সহজে পৌঁছে যায়। পরিবার চালানোর চাপ তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিয়ে যায়। ইয়াবা তাদের জন্য টাকা পাওয়ার একটি ‘কুইক রুট’। এটা ঠেকাতে হলে বিকল্প সুযোগ দিতে হবে।

ফসলি জমিতে ‘সবুজ বিষ’

চকরিয়া উপজেলার বরইতলীতে এক সময় চোখ জুড়াতো হাজারো গোলাপের বাগান। লাল, গোলাপি, হলুদ রঙে মাঠ ভরে থাকত। দুই শতাধিক কৃষক পরিবার গোলাপ চাষেই জীবন চালাত। পাশের জমিতে চাষ হতো ধান, মরিচ ও বেগুন। বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পলিমাটিতে যা বুনতেন, তাই সোনা হয়ে উঠত। সেসব দিন এখন স্মৃতি।

এখন বরইতলীতে গেলে চোখে পড়ে সারি সারি তামাকের গাছ। গোলাপের পাশেও তামাক, মাঠের পরে মাঠ একই ছবি।

প্রায় ৫০ বছর বয়সি কৃষক আবুল কালাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কোম্পানি এসে বলল বেশি টাকা দেবে, বিক্রির নিশ্চয়তা আছে। গোলাপ লাগিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে এটা নিরাপদ মনে হলো। কিন্তু এখন বুঝি, জমিটা আর সেই জমি নেই।

সরকারি কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্যমতে, কক্সবাজারের বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীতীরবর্তী ২৭টি ইউনিয়নে প্রায় পাঁচ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। মূলত চকরিয়া ও রামু উপজেলাই এর কেন্দ্র। ২০১৩-১৪ সালের জাতীয় পরিসংখ্যানে কক্সবাজারে তামাকের চাষ ছিল ৮৫০ হেক্টর (প্রায় দুই হাজার ১০০ একর)। অর্থাৎ এক দশকের কিছু বেশি সময়ে তামাকের বিস্তার প্রায় আড়াই গুণেরও বেশি বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, জাতীয়ভাবে ছয় বছরে দ্বিগুণ জমিতে তামাক চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে সে বিস্তার আরো দ্রুত এবং গভীর।

চকরিয়ার মাতারবাড়ী, ঢেমশা, বরইতলী, সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নগুলোয় এক সময় শীতকালীন সবজির বিশাল বাজার বসত। পাইকারি ক্রেতারা ঢাকা থেকে এসে কিনে নিতেন এসব সবজি। রামুর জোয়ারিয়ানালা ও ঈদগড় এলাকায় বোরো মৌসুমে ধানের ভালো ফলন হতো। এখন এই জমির অনেকাংশে তামাক। বহুজাতিক কোম্পানি বিএটি বাংলাদেশ, ঢাকা টোব্যাকো ও আকিজ গ্রুপের প্রতিনিধিরা প্রতি বছর শীত মৌসুমের আগেই মাঠে নামেন। অগ্রিম বীজ, সার, কীটনাশক দেন বাকিতে। এই সহজ ঋণের জালে একবার ঢুকলে বেরোনো কঠিন।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের তথ্যমতে, তামাক চাষের কারণে নদীতীরবর্তী এলাকায় বনের গাছ কাটা হচ্ছে পাতা শুকানোর জ্বালানির জন্য। প্রতি বিঘা তামাক পাতা শুকাতে ৮-১০ মণ কাঠ পোড়াতে হয়, যা এলাকার অবশিষ্ট বনভূমিকে দ্রুত নিঃশেষ করছে।

কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, তামাক চাষ মাটির পক্ষে সবচেয়ে আগ্রাসী ফসলগুলোর একটি। প্রতি একর তামাক উৎপাদনে মাটি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামসহ সব ধরনের খনিজ পদার্থ ব্যাপকভাবে শোষিত হয়। এরপর ওই জমিতে অন্য ফসল লাগালে ফলন আসে অনেক কম।

উবিনীগের গবেষণায় দেখা গেছে, যে জমিতে ২৫ থেকে ৪০ বছর ধরে তামাক চাষ হয়েছে, ওই জমি প্রায় মৃত মাটিতে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়া ও রামুতে তামাক চাষের বয়স অনেক জায়গায় দুই দশক ছাড়িয়েছে। এছাড়া তামাক চাষে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এই রাসায়নিক বৃষ্টিতে ধুয়ে নদীতে মিশলে কমে যায় মাছ ও জলজ প্রাণীর সংখ্যা, যা কক্সবাজারের মৎস্যজীবী পরিবারগুলোকেও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তামাক চাষের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এটি বোরো মৌসুমের অন্যান্য ফসলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, কক্সবাজারের বাঁকখালী-মাতামুহুরী তীরের ২৭ ইউনিয়নে তামাক চাষে যুক্ত হয়ে পড়েছে অন্তত এক লাখ কৃষক পরিবার, যারা আগে ধান ও সবজি চাষ করত।

তামাক চাষের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হয়তো সংখ্যায় ধরা যায় না, সেটি হলো কৃষকের শরীরে ধীরে ধীরে ঢুকতে থাকা বিষ। উবিনীগের গবেষণা বলছে, তামাক চাষে কৃষক ও তার পরিবারকে বছরে ছয় থেকে আট মাস সরাসরি তামাক গাছের সংস্পর্শে থাকতে হয়। তামাক পাতায় থাকে নিকোটিন, যা শক্তিশালী বিষাক্ত অ্যালকালয়েড এবং ভেজা পাতায় হাত দিলেই চামড়া ভেদ করে রক্তে মিশে যায়। এ অবস্থাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ বা সবুজ তামাকের অসুখ।

কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, জেলায় তামাক চাষের বিস্তার কৃষি ও পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। একদিকে খাদ্যশস্য ও সবজি চাষের জমি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠ ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম, সাধারণ মানুষ হলে কী হতো?

অফডকেও সুযোগ বাড়ছে বিদেশি বিনিয়োগের

সেই শিবিরনেতা অপহরণ নয় আত্মগোপনে ছিলেন, পুলিশের বিবৃতি

‘মাতামুহুরী’ উপজেলা ও ‘পেকুয়া’ পৌরসভা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সায়েন্টেফিক সেমিনার অনুষ্ঠিত

ব্লু ইকোনমিতে অপার সম্ভাবনার হাতছানি সীতাকুণ্ড উপকূলে

ক্রিকেটার নাঈমকে ডিবি পরিচয়ে মারধর, থানায় নিয়ে হেনস্তা

লক্ষ্মীপুরে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য আনন্দ র‍্যালি

অপহরণের ২৩ ঘণ্টা পর কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবির নেতা লাকসাম থেকে উদ্ধার

শনিবার চকরিয়ায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী, সমাবেশস্থল পরিদর্শনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী