একসময় যেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, বাস-ট্রাকসহ নানা যানবাহন, যেখানে জ্বালানি নিতে মানুষের ব্যস্ততা আর কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত পুরো এলাকা—সেই পেট্রোল পাম্পগুলোতেই এখন চলছে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজ।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। পাম্পের পাকা ও খোলা চত্বরে বিছিয়ে রাখা হয়েছে সদ্য কাটা বোরো ধান। কোথাও নারী-পুরুষ মিলে ধান উল্টেপাল্টে শুকাচ্ছেন, কোথাও চলছে মাড়াইয়ের কাজ। দূর থেকে দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে এটি যেন কোনো অস্থায়ী ধানচাতাল।
সরেজমিনে উপজেলার টেংরা এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো চত্বরজুড়ে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে ধান। আকাশে মেঘ থাকলেও রোদের ফাঁকে দ্রুত ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে এমন দৃশ্য পথচারীদের মাঝেও কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ধান ঘরে উঠেছে। কিন্তু গ্রামে পর্যাপ্ত খোলা ও পাকা জায়গার সংকট থাকায় তারা বিকল্প হিসেবে ফিলিং স্টেশনগুলোর খালি চত্বর ব্যবহার করছেন। পাম্পের খোলা জায়গায় রোদ ভালো লাগায় দ্রুত ধান শুকানো সম্ভব হচ্ছে।
টেংরা গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমাদের বাড়ির উঠান ছোট। এত ধান শুকানোর জায়গা নেই। পাম্পের জায়গা বড় আর পাকা হওয়ায় সুবিধা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ধান ঘরে তুলতে পারব।’
স্থানীয় কৃষাণী খোদেজা আক্তার বলেন, ‘ধান মাড়াইয়ের জন্য পরিষ্কার জায়গা দরকার হয়। এখন পাম্পে গাড়ির চাপ কম থাকায় আমরা সাময়িকভাবে এখানে কাজ করছি।’
উপজেলার টেপিরবাড়ি এলাকার আর এইচ ফিলিং স্টেশনের মালিক আলহাজ্ব রুহুল আমিন আকন্দ বলেন, ‘একসময় সারাদিন যানবাহনের ভিড় থাকত। কিন্তু এখন আগের মতো চাপ নেই। জ্বালানি সংকট কেটে যাওয়ার পরও গ্রাহক কমে গেছে। খোলা জায়গা পড়ে থাকায় সাময়িকভাবে ধান শুকানো ও মাড়াই করা হয়েছে।’
স্থানীয়রা জানান, দেশে কয়েক বছর আগে জ্বালানি সংকটের সময় ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল নিতে দীর্ঘ লাইন দেখা যেত। তখন অনেক পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি পাওয়া যেত না। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও অনেক পাম্প এখন গ্রাহক সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খাতে মন্দাভাব এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে আগের তুলনায় বিক্রি কমেছে বলে দাবি পাম্প মালিকদের।
তবে এমন পরিস্থিতিতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ধান শুকানোর দৃশ্য গ্রামীণ জীবনের এক ভিন্ন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কৃষকের প্রয়োজন, জায়গার সংকট এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব—সবকিছু মিলিয়ে ব্যস্ত পেট্রোল পাম্পগুলো যেন সাময়িকভাবে রূপ নিয়েছে মৌসুমি কৃষিকাজের কর্মস্থলে।
সচেতন মহল বলছে, পেট্রোল পাম্পে দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ করা হয়। তাই সেখানে ধান মাড়াই ও শুকানোর সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে আগুন, ধূমপান বা বৈদ্যুতিক ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে হবে। এ বিষয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারিও প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
এমএইচ