নদীপথে নাব্য সঙ্কট
বাস-ট্রেনে টিকিটের সংকট, মহাসড়কে যানজট ও বিড়ম্বনাসহ নানা ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে উত্তরের আট জেলার মানুষের পছন্দ নদীপথে চলাচল। দ্রুত যাতায়াতে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল গাইবান্ধার বালাশী-বাহাদুরাবাদ নৌপথ। কিন্তু এবারের ঈদযাত্রায় সেই স্বস্তি নেই। এই নৌপথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের নাব্যসংকট।
জানা যায়, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট ও জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাটের মধ্যে সরাসরি ফেরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে বিআইডব্লিউটিএ প্রায় ১৪৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এই বিশাল প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়ে আছে প্রকল্পটি। এত ব্যয়ের পরও সাধারণ যাত্রীদের এখনো ভরসা কেবল ছোট নৌকা আর নিজেদের গায়ের জোর।
সড়কপথে যেখানে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ বা সংলগ্ন জেলাগুলোতে যেতে বাসের ভাড়া হাঁকানো হচ্ছে ১০০০ থেকে ১১০০ টাকা, সেখানে নৌপথ ব্যবহার করে খরচ নামিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে ৫০০ টাকার নিচে। নৌকার টিকিট ৩০০ টাকা আর অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ৫০০ টাকার মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছানো যাচ্ছে।
বিশেষ করে গাজীপুর বা ময়মনসিংহের যাত্রীরা যমুনা সেতুর দীর্ঘ জট এড়াতে এই রুটকেই বেছে নিচ্ছেন বেশি। তবে এই সাশ্রয়ী যাত্রা এখন চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় এই নৌপথে নিয়মিত যাতায়াতকারী শামীমা আক্তার বলেন, এই পথে নৌকায় যাতায়াত এখন কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝে মাঝেই বালুচরে নৌকা আটকে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে।
বালাসীঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলে শুরুতে ব্রহ্মপুত্রের রূপ আর দুই পাড়ের সবুজ ধান ও ভুট্টাক্ষেত চোখে প্রশান্তি দেয়। তবে এই সৌন্দর্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। মাঝ নদীতে আসতেই দেখা দেয় মূল বিপত্তি। মাঝি মিঠু মিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নদীর গভীরতা অনেক জায়গায় মাত্র ৩ থেকে ৪ ফুটে নেমে এসেছে। ফলে বড় নৌকা চলাচল এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাহাদুরাবাদ ঘাটে পৌঁছানোর কয়েক কিলোমিটার আগেই নৌকা বালুচরে আটকে যাচ্ছে। তখন নিরুপায় যাত্রী ও মাঝিদের পানিতে নেমে নৌকা ঠেলে পার করতে হচ্ছে। আনন্দের ঈদযাত্রা তখন পর্যবসিত হচ্ছে অমানুষিক পরিশ্রমে। এই নৌরুটের নৌকার মাঝি রবিউল ইসলাম জানান, ‘বর্তমান সময়ে নৌকা চালাতে পারছি না। অসংখ্যবার আটকে যাচ্ছে চরে।’
২০২২ সালে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বালাসী ও বাহাদুরাবাদ ঘাটে ফেরি টার্মিনাল ও আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা। কিন্তু নাব্যসংকটের কারণে মাত্র কয়েক দিন চলার পরই ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এই বিশাল স্থাপনা কোনো কাজেই আসছে না। ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজার অলস পড়ে থাকতে দেখা গেলেও নদী খননে কার্যকর কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি। কাউন্টার মাস্টারদের অভিযোগ, বারবার আবেদন করার পরও নদী ড্রেজিংয়ের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাত্রীদের দাবি, সরকার যদি ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্য ফিরিয়ে আনে এবং এই নৌপথ নিয়মিত সচল রাখে, তাহলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এতে সরকারের রাজস্ব যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় যেন সাধারণ মানুষের ঈদ আনন্দ বালুচরে আটকে না যায়, এখন এটিই সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।