গাইবান্ধা জেলার একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান রংপুর চিনিকলটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মিলের কারখানা চত্বরের ৩৫ একর ভূমি জঙ্গলে ভরে গেছে। অযত্ন- অবহেলায় খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় আখ পরিবহনের যানবাহনগুলোও দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চিনিকলের কারখানার ভেতরেও কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি মরিচা ধরে বিকল হয়ে যাচ্ছে। লোকসান কমাতে আধুনিকায়নের মাধ্যমে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চিনিকলের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়।
আখচাষি, শ্রমিক কর্মচারীসহ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকার কেন্দ্রস্থল কৃষিনির্ভর এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি চালুর বিষয়টি এখন সময়ের দাবি।
জেলার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর চিনিকলকে ঘিরে সাতটি উপজেলার কৃষকরা ব্যাপকভাবে আখের চাষাবাদ করতেন। তখন এ অঞ্চলের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ছিল আখচাষ। আখচাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা অন্যান্য আবাদে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। মৌসুমের বেশিরভাগ সময়জুড়ে চলত মাড়াইয়ের কাজ।
সে সময় কৃষকরা আখ চাষের মাধ্যমে সফলতা পেলেও সফলতার ছোঁয়া লাগেনি এ মিলের অর্থনীতিতে। কৃষি অঞ্চল হিসেবে এ এলাকায় আখ চাষের প্রসার ঘটাতে ১৯৫৪ সালে চিনিকলটি স্থাপিত হয়। গত ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চিনিকলটি ৫১৪ কোটি ১১ লাখ টাকা লোকসানের দায় চাপিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) চিনিকলটি বন্ধ করে দেয়। এতে এ অঞ্চলের কৃষিতে আখ চাষের সম্ভাবনার দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়।
এ অঞ্চলে আখ চাষ যেন ব্যাহত না হয়, এজন্য চাষিদের জয়পুরহাট সুগার মিলের আওতায় নামমাত্র কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। এ চিনিকলের আওতায় দীর্ঘদিন আখচাষ করে আসা আখচাষি সাঘাটার আলতাফ হোসেন ও বোনারপাড়ার আজিজুর রহমান জানান, সে সময় মূলত মিলের কারণেই এ এলাকায় বৃহৎ পরিসরে আখের চাষ হতো। আবারও মিলটি চালু হলে একদিকে যেমন কৃষকরা লাভবান হবে, অপরদিকে এলাকার অর্থনীতিও এগিয়ে যাবে। মিল চালুর দাবিতে আন্দোলন করে আসা মিলের শ্রমিক কর্মচারীরা জানান, কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট হলেও সবাই নির্বিকার। মিলটি চালু হলে এর সঙ্গে জড়িতদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন মহিমাগঞ্জের গণমাধ্যমকর্মী আবু বক্কর লিটন। এলাকাবাসী জানান, চিনিকলটি চালু হলে এলাকার মানুষ আর বেকার থাকবে না। এ বিষয়ে কথা হলে রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ইনচার্জ) মাসুমা আকতার জাহান জানান, চিনিকল চালুর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ব্যাপার।
তিনি বলেন, চালু অবস্থায় এ চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের জন্য বেতন-ভাতা বাবদ মাসে প্রায় এক কোটি টাকা প্রয়োজন হতো। সরকারি সিদ্ধান্তে মাড়াই বন্ধ হওয়ায় এ চিনিকলের বিপুল পরিমাণ সম্পদ রক্ষায় বর্তমানে সাতজন স্থায়ী কর্মকর্তা ও ৭৫ জন অস্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা প্রদানে ১৮ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি এ এলাকার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন চিনিকলটি চালুর দাবিতে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেওয়ার পর এলাকায় এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আশার সঞ্চার হয়েছে চিনিকল সংশ্লিষ্টদের মাঝে।