সুনামগঞ্জে ফসলহারা কৃষকদের আর্তনাদ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। হাওরে ফসলডুবির পর কৃষকের জীবনে নেমে এসেছে বিপর্যয়। একের পর এক কষ্ট এসে যোগ হচ্ছে জীবনে। ধারদেনা পরিশোধ, পরিবারের খরচসহ নানা সংকটে পড়ে কৃষকের এখন মাজাভাঙা অবস্থা। জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় হাওরের একমাত্র বোরো ফসল তলিয়ে যায়। যেটুকু ধান কাটা হয়েছে তার অর্ধেক অঙ্কুর এসে পচে গেছে। গো-খাদ্যের সংকটও প্রকট আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে বর্গাচাষিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। ঋণের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে বাড়িছাড়া অবস্থা তাদের।
কৃষকদের ভাষ্য, বোরো ধান ঘরে উঠবে, মহাজনের ঋণ শোধ হবে, ব্যাংকের কিস্তি মিটবে, সংসারে ফিরবে কিছুটা স্বস্তি। কিন্তু টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সেসব হিসেব এখন এলোমেলো। সুনামগঞ্জের হাওরের বিস্তীর্ণ মাঠ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায়, এক মৌসুমেই স্বপ্ন হারিয়েছেন হাজারো কৃষক। ফসল হারিয়ে এখন ঋণের ভারে দিশাহারা হয়ে পড়ছেন তারা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন হাওরে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক খরচের জন্য অনেকেই এনজিও, ব্যাংক কিংবা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে সেই ধান।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের কৃষক আবদুল কাইয়ুম বলেন, এবার ১২ কিয়ার জমিতে ধান করছিলাম। সবকিছু মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছি। ধান উঠলে শোধ করতাম। এখন জমির ধানই নাই, কিস্তি দিব কেমনে বুঝতেছি না।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাংহাই হাওরের কিষানি আইবুন বেগম বলেন, সার, বীজ, শ্রমিক সব ধার কইরা করছি। এখন খলায় যে ধান আনছি, বৃষ্টির কারণে শুকাইতে না পাইরা অনেক ধান নষ্ট হইয়া গেছে। সংসার চালানোই কষ্ট হয়ে গেছে।’ হাওরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, যেসব কৃষক অল্প কিছু ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও নতুন সংকটে পড়েছেন। রোদ না থাকায় খলায় শুকাতে না পেরে অঙ্কুর গজিয়ে ধান নষ্ট হয়েছে। অনেকের গোলা ফাঁকা পড়ে আছে। ফলে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। আরেক কৃষক নুর উদ্দিন বলেন, ধানের বদলে এখন মাথায় উঠছে ঋণের পাহাড়। মহাজন টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। এনজিওর কিস্তিও বন্ধ নেই।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, ‘হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারের দুজন মন্ত্রী এসে কৃষকদের তিন মাস মেয়াদি সহায়তার উদ্বোধন করেছেন। পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষককে সহায়তার আওতায় আনা হবে।