হোম > ফিচার > স্বাস্থ্য

ক্যানসার: সংকট ও বাস্তবতা

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

ক্যানসার বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ধরা হচ্ছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ, অঞ্চল বা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ধনী দেশ হোক বা উন্নয়নশীল, সর্বত্রই ক্যানসারের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, দূষণ, ধূমপান, স্থূলতা, নিষ্ক্রিয় জীবনধারা এবং দীর্ঘায়ু—এসব কারণে ক্যানসার আজ একটি নীরব কিন্তু গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি দেরিতে শনাক্ত হয়, ফলে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। ক্যানসারের প্রতিকূল প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নয়, এটি পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে। এটি ব্যক্তির কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়, পরিবারে মানসিক চাপ বাড়ায় এবং আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করে।

বিশ্বে ক্যানসারের বর্তমান চিত্র

বিশ্বব্যাপী ক্যানসার একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে ধরা হচ্ছে।

* প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় দুই কোটি মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়।

* বছরে প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ ক্যানসারে মারা যায়।

* প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন জীবদ্দশায় কোনো না কোনো ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

* ভবিষ্যতে বছরে নতুন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ফুসফুস, স্তন, বৃহদান্ত্র, প্রোস্টেট ও যকৃতের ক্যানসার। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ক্যানসারের বোঝা দ্রুত বাড়ছে, কারণ সচেতনতা ও প্রাথমিক শনাক্তকরণের সুযোগ তুলনামূলক কম।

স্বাস্থ্যসেবা খাতেও চাপ বেড়ে গেছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর বিছানা সীমিত এবং বিশেষায়িত বিভাগ কম। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীরা সঠিক যত্ন পাচ্ছে না।

দেশে ক্যানসারের পরিস্থিতি

বাংলাদেশে ক্যানসার একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।

* প্রতিবছর নতুন ক্যানসার রোগী প্রায় ১ লাখ ৬০ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার।

* বছরে ক্যানসারে মৃত্যু প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার।

* দেশে আনুমানিক ১৮-২০ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত।

* প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে গড়ে ১০৬ জন ক্যানসারে আক্রান্ত।

বড় সমস্যা হলো রোগ শনাক্তে বিলম্ব। অধিকাংশ রোগী তখনই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসে, যখন রোগ অনেকটাই অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছে। গ্রামাঞ্চলে এই প্রবণতা আরো বেশি। ক্যানসারের কারণে পরিবার ও সমাজেও বড় প্রভাব পড়ে। পরিবার আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে, রোগী সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় রোগী কর্মক্ষমতা হারায় এবং শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়।

ক্যানসারের ঝুঁকিপূর্ণ কারণ

ক্যানসার সাধারণত একাধিক ঝুঁকির সমন্বয়ে তৈরি হয়।

১. তামাকজাত দ্রব্য : সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল ও ধোঁয়াবিহীন তামাক। ফুসফুস, মুখ, গলা, খাদ্যনালি ও মূত্রথলির ক্যানসারের প্রধান ঝুঁকি। মোট ক্যানসারের প্রায় ৩০ শতাংশ তামাকের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২. খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন : অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার। শাকসবজি ও ফলমূলের স্বল্পতা। * শারীরিক পরিশ্রমের অভাব। স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন।

৩. সংক্রমণজনিত কারণ : মোট ক্যানসারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত—

এইচপিভি (HPV) জরায়ুমুখ ক্যানসার * হেপাটাইটিস বি ও সি যকৃৎ ক্যানসার হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি পাকস্থলী ক্যানসার

৪. পরিবেশ ও কর্মক্ষেত্র : বায়ুদূষণ, কীটনাশক ও রাসায়নিক পদার্থ

ভারী ধাতু, অতিরিক্ত সূর্যালোক।

৫. জীবনযাত্রা ও মানসিক চাপ : অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, দীর্ঘ সময় কম শারীরিক কার্যকলাপে থাকা, ধূমপান বা মাদক ব্যবহার। এসব কারণে দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সহজ হয়ে যায়।

ক্যানসারের লক্ষণ

* অকারণে ওজন কমে যাওয়া।

* দীর্ঘদিনের ক্লান্তি।

* শরীরের কোথাও গাঁট বা ফোলা।

* ক্ষত বা ঘা দীর্ঘদিন ভালো না হওয়া।

* অস্বাভাবিক রক্তপাত।

* দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন।

* পায়খানা বা প্রস্রাবে রক্ত।

* হঠাৎ খাবারের আগ্রহ কমে যাওয়া বা হজমজনিত সমস্যা।

ক্যানসারের জটিলতা

* শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া।

* আক্রান্ত অঙ্গের স্বাভাবিক।

* কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়া।

* রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া।

* রক্তস্বল্পতা ও সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি।

* শারীরিক দুর্বলতা ও কর্মক্ষমতা হ্রাস।

* মানসিক চাপ ও হতাশা। ক্যানসার শুধু রোগীর শরীর নয়, পরিবার ও সামাজিক জীবনেও বড় প্রভাব ফেলে।

ক্যানসার নির্ণয়

* রোগীর শারীরিক পরীক্ষা ও ইতিহাস মূল্যায়ন।

* রক্ত ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষা।

* চিত্রায়ণ পরীক্ষা (এক্স-রে, কম্পিউটেড টমোগ্রাফি, চৌম্বকীয় রেজোন্যান্স)।

* টিস্যু পরীক্ষা বা কোষ্ঠী পরীক্ষা।

* রোগের বিস্তার নির্ধারণ (পর্যায় নির্ণয়) সঠিক নির্ণয় ছাড়া ক্যানসার মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্ক্রিনিং ক্যানসার শনাক্তকরণের জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে, ৪০-৫০ বছরের পর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। স্তন ক্যানসারের জন্য ম্যামোগ্রাফি, জরায়ুমুখের জন্য প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষা এবং যকৃৎসংক্রান্ত পরীক্ষা সময়মতো করা গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো শনাক্তকরণ চিকিৎসার সম্ভাবনা বাড়ায় এবং জীবন রক্ষা করতে সাহায্য করে।

সামাজিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে ক্যানসার নিয়ে এখনো অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই এটিকে নিয়তির বিষয় মনে করেন বা লুকিয়ে রাখেন। ফলে রোগ শনাক্তে দেরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাব্যয় পরিবারকে আর্থিক চাপের মুখে ফেলে। ক্যানসারের কারণে পরিবারে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। রোগী সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, কাজ ও শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয় এবং সন্তান বা পরিবারকে দৈনন্দিন দায়িত্ব সামলাতে অসুবিধা হয়।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

হার্ট অ্যাটাক না হয়েও হৃদযন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে কেন?

সুস্থ ঘুমের ১২টি কৌশল

দেশের সব হাসপাতালে জরুরি ১০ নির্দেশনা

দেশে প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্পেশালাইজড ডেন্টাল হাসপাতাল চালু

নিয়মিত স্ক্রিনিং কেন গুরুত্বপূর্ণ

গর্ভাবস্থায় ইনফেকশনে হতে পারে শিশুর জন্মগত হৃদরোগ

হ্যান্ডশেকে হতে পারে এই রোগ

ফিট শরীরেও হার্ট অ্যাটাকে চিকিৎসকের মৃত্যু

বিএমইআইএসএ'র সভাপতি মাহফুজ, সম্পাদক মাসুমুল

প্যাথলজি রিপোর্টে চিকিৎসকের একক স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্যখাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র