নরসিংদীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা অবহেলিত। এর ওপর তারা যদি হয় প্রতিবন্ধী, তাহলে তো অবহেলার শেষ নেই। তাদের তাদের অনেকটা সমাজের বোঝা মনে করা হয়। আর সেই নারীদের স্বাবলম্বী করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন নরসিংদীর সাবিনা আক্তার।
নরসিংদীর অনগ্রসর একটি উপজেলা শিবপুর। প্রায় ২১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত এই উপজেলা। ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার ৬৬৭ জনের বসবাস। এর মধ্যে প্রায় সাত হাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে বেকার রেখে সমাজকে এগিয়ে নেওয়া একটি কঠিন কাজ। তাদের উপযুক্ত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতোধারায় সম্পৃক্ত করতে পারলেই সমাজকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। আর এমনই একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার সাবিনা আক্তার নামে এক নারী।
তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিবপুর প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এর পাশাপাশি এই প্রতিবন্ধী নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যতিক্রমী হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। প্রায় দুই বছর ধরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছয় মাসমেয়াদি কাজ শিখিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবন্ধী নারীদের এ হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শাড়ি, পাঞ্জাবি ও বিভিন্ন কাপড়ে ব্লকপ্রিন্ট এবং আসবাবপত্র ও নারীদের গহনা তৈরির কাজ শেখানো হয়। কাজ শেখা হলে একই প্রতিষ্ঠানে কাজের মাধ্যমে জনপ্রতি আয় করছেন ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। এর ফলে তাদের নিজেদের খরচ মিটিয়ে পরিবারকেও সহায়তা করতে পেরে খুশি। তাদের এসব কার্যক্রম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে আমেরিকার এক নারী তাদের কাছ থেকে পণ্য নিয়ে থাকেন। ফলে সমাজের এই পিছিয়ে পড়া মানুষদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মূল স্রোতোধারায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
শারীরিক প্রতিবন্ধী এক প্রশিক্ষণার্থী সাদিয়া আক্তার। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা কৃষিকাজ করেন আর মা গৃহিণী। দরিদ্র পরিবারের সন্তান সাদিয়া শিবপুর মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজ কর্মসংস্থানের জন্য সাবিনা আক্তারের প্রতিষ্ঠিত ব্যতিক্রমী হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছয় মাসেই ব্লকপ্রিন্টের কাজ আয়ত্ত করে নেন। এরপর তিনি এই কাজে দক্ষ হয়ে এখানেই কাজ শুরু করেন। তার হাত দিয়েই এখন তৈরি হয় শাড়ি, পাঞ্জাবি ও থ্রি-পিসের ব্লকপ্রিন্ট। সুন্দর ও নিখুঁতভাবে ব্লক বসিয়ে এক-এক করে তৈরি করেন কাপড়। ফলে ছয় মাস ধরে প্রতি মাসে আয় করেন ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা। তার এই আয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে বাবা-মাকেও কিছু দিতে পেরে খুশি। তার দাবি, এই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এসব প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যক্তি উপযোগী কাজ দেওয়া হলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশির আয়ও হবে। তাই এ বিষয়ে সরকারসহ বেসরকারি পর্যায়ের ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণার্থী সানজানা মরিয়াম সারা। তার মা ফাতেমা বেগম জানান, মেয়ে প্রতিবন্ধী হলেও সাবিনা আক্তারের এমন প্রশিক্ষণে এসে সে অনেকটা কাজ করতে পারে। এখানে এসে প্রশিক্ষণ নিতে পেরে সে অনেকটা খুশি। কাজ শেখার পাশাপাশি কিছু টাকাও পাচ্ছে। এই টাকা দিয়ে তার নিজের খরচ চালাতে পারছে।
বাকপ্রতিবন্ধী বর্ষা রানী দে। সাবিনা আক্তারের প্রতিষ্ঠিত ব্যতিক্রমী হস্তশিল্প প্রশিক্ষণে এসে বর্ষা কথা বলতে না পারলেও হাতের কাজ অল্প সময়েই রপ্ত করেছেন। তার মা দিপীকা রানী দে জানান, বর্ষা অল্প সময়েই কাজ শিখে নিয়েছে। এ জন্য হাতে গলার মালা, কানের দুল তৈরি এবং বিভিন্ন জিনিসপত্রে রঙ করার কাজ শিখেছে। তার তৈরি জিনিসপত্র এখন আমেরিকার বাজারে যাচ্ছে। এ কথা শুনে আমরা খুশি। বর্ষা এখন প্রতি মাসে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা আয় করছে। এতে করে নিজের খরচ চালিয়ে সংসারেরও কিছু কাজে জোগান দিচ্ছে। এতে পরিবারের সবাই খুশি।
শিবপুর ব্যতিক্রমী হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠাতা সাবিনা আক্তার জানান, ২০১৮ সাল থেকে তিনি একটি প্রতিবন্ধী স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের জন্য দুই বছরমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে দেখেন তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে পরিবারের বোঝার পরিবর্তে সম্পদে তৈরি হবে। তাই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছয় মাস মেয়াদে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করা হয়। এরপর তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে জিনিসপত্র তৈরি করা হয়। তাদের তৈরি পণ্য আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়ে যাচ্ছে। ওখান থেকে যা আসে, তার সম্পূর্ণটাই তাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে এ কাজের পরিধি আরো সম্প্রসারণ সম্ভব। এভাবে সমাজের এই পিছিয়ে পড়া মানুষকে মূল স্রোতোধারায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
নরসিংদী জেলা মহিলাবিষয়ক কার্যালয়ের উপপরিচালক সেলিনা আক্তার বলেন, নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। সরকার নারীদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তাই নারীরা আজ উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের আশপাশের মানুষকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন। এটি একটি ভালো লক্ষণ। এই সাবিনা তার কৃতকর্মে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। তার এই হস্তশিল্প কার্যক্রমটি ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন জেলা মহিলাবিষয়ক কার্যালয়ের উপপরিচালক।
শুধু সাবিনা আক্তারই নন। এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তশালীরা এগিয়ে এলে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের মূল স্রোতোধারায় ফিরিয়ে এনে বোঝা নয়, সম্পদে রূপান্তর সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।