হোম > ফিচার > নারী

‘স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়াই অব্যাহত রেখেছি’

রায়হান আহমেদ তামীম

সিনথিয়া জাহিন আয়েশা

সিনথিয়া জাহিন আয়েশা। বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং প্রথম সারির যোদ্ধা। আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত তার অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন আমার দেশকে। সিনথিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী তা তুলে ধরা হলো...

শুরুটা যেভাবে

কোটার বিরুদ্ধে মেধার লড়াই, এই যে যাত্রা কিংবা আন্দোলনÑএকজন সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে, নৈতিক জায়গা থেকে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়া। ১০ জুলাই বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি সফল করার জন্য বদরুন্নেসা কলেজের কিছু শিক্ষার্থীকে নিয়ে বকশীবাজার মোড় এবং চানখাঁরপুল মোড়ে কর্মসূচি পালন করি। সফলভাবে কর্মসূচি শেষ করে চানখাঁরপুলের সবাই মিছিল নিয়ে শাহবাগে যাই এবং সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা হয়। ১১ ও ১২ জুলাইও ছিল শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি। ১৩ জুলাই সাত কলেজের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার জন্য সাত কলেজের পক্ষ থেকে নাহিদ উদ্দিন তারেক ভাই আমাদের সমন্বয় করে, সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ভাই এবং আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে টিএসসিতে মিটিং করেন। ১৪ জুলাই কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পুলিশের বাধার অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।

একই দিনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষার্থীদের রাজাকার বলার প্রতিবাদে ১৫ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। সেদিন ভিসি চত্বরে প্রথম শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ হয়। হলপাড়ার দিকে বড় র‌্যালি নিয়ে আমরা এগোচ্ছিলাম। মলচত্বর হয়ে রাজু ভাস্কর্যে যাব, এমনটা পরিকল্পনা ছিল। আভাস পাচ্ছিলাম, আমাদের ওপর আক্রমণ হতে পারে। তারপর স্লোগান দেওয়ার জন্য হাতে মাইক নিয়েছিলাম। সামনে ছিলেন নাহিদ ভাই, উমামা আপাসহ অনেকেই। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নাহিদ ভাই এবং উমামা আপারা পেছনের দিকে যাচ্ছেন। তাকিয়ে দেখি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ভাড়া করা গুন্ডারা হেলমেট পরে হাতে লাঠি, রড, আদলা ও ইট নিক্ষেপ করতে করতে আমাদের দিকে এগোচ্ছে। আমরা পেছন দিক দিয়ে হলপাড়ার দিকে চলে গেলাম। তখন পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার কারণে মিছিল কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। একপর্যায়ে আমরা নাহিদ ভাইদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাই। সে সময় দেখি একটা মেয়ে ঘটনাটার লাইভ করছে। তখন আমরা দুজন হাত ধরে সামনের দিকে এগোতে থাকি। বিভিন্ন দিক থেকে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া তখনো চলছিল। আমার সঙ্গে যে সহযোদ্ধা ছিল, তার নাম ফারহানা। তাকে নিয়ে ভিসি চত্বরের সামনে এসে দাঁড়াই। ফেসবুকে তখনো সে লাইভ করছে। হুট করে মল চত্বরের সামনের রাস্তা থেকে আবার সেই পোষা লীগরা অস্ত্রশস্ত্রসহ আমাদের দিকে ধাবিত হয়। তারা আমাদের ওপর রড, আদলা ও ইট দিয়ে আক্রমণ শুরু করে। ওই সময় দৌড়াতে গিয়ে ফারহানার হাত, আমার হাত থেকে ছুটে যায়। ভিসি চত্বরের ওখানে রাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের চিপায় আমি আশ্রয় নিই। দুদিক থেকেই ভাড়া করা গুন্ডারা আক্রমণ করতে থাকে। একপর্যায়ে আমিও আহত হই। আমার জীবনে এ রকম নির্মম পরিস্থিতির মুখে আগে কোনোদিন পড়িনি।

ঢাকা মেডিকেলে হামলা

মারধরের সময় আমার মাথায় আঘাত লাগে, চশমা ভেঙে যায়। তখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দেশব্যাপী একটা মেসেঞ্জার গ্রুপ ছিল ‘সমন্বয় সারাদেশ’ নামে। তাৎক্ষণিক মেসেঞ্জার গ্রুপে একটা ভয়েস দিয়ে আমার পরিস্থিতি জানালাম এবং সহযোগিতা চাইলাম। এরপর কয়েকজন ভাই এসে আমাকে রিকশায় তুলে দেন। পরে কী হয়েছে, আমার মনে নেই। দীর্ঘক্ষণ অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম। শেষ বিকেলের দিকে ঢাকা মেডিকেলে যখন অল্প জ্ঞান এলো, তখন দেখি বেশ কয়েকজন সমন্বয়ক বিশেষ করে রিফাত রশিদ, প্রীতম সোহাগ ভাইসহ আরো যারা ছিলেন, তাদের অনেকেই সেখানে উপস্থিত। সন্ধ্যার দিকে আমাকে সিটি স্ক্যান রুমে নেওয়া হয়।

এ কথা প্রচলিত, মাঠে যারা একবার আক্রমণের শিকার হন, দ্বিতীয়বার তারা হাসপাতালে হামলার শিকার হন। তাই বড় ভাইয়েরা আমাকে ঢামেক থেকে সরিয়ে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ওই সময়টাতেই ঢাকা মেডিকেলে হামলা হয়। সেদিন তারা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে আহত করেছিল। যারা আহত ছিলেন, তাদের ওপর আরো এক দফা আক্রমণ হয়। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ১৭ জুলাই পর্যন্ত থাকি। সেখান থেকে লালবাগে এক সিনিয়র আপার বাসায় চলে যাই।

পলাশী মোড়ে অবস্থান এবং পুলিশের হামলা

১৮ জুলাই সকালবেলা আবার বের হই। সেখানে শেখ বোরহানুদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের নিরব ভাইসহ আরো যারা আছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা কোথায় অবস্থান করব, তা জেনে নিই। তারা আজিমপুর কলোনির সামনের মোড়ে অবস্থানের কথা জানান। সেখানে গিয়ে দেখি তেমন কেউ তখনো আসেননি এবং পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। এরপর শিক্ষার্থীরা আস্তে আস্তে জড়ো হন এবং আমরা অবস্থান কর্মসূচি শুরু করি। ভিকারুননিসার শিক্ষার্থীরাও আমাদের সঙ্গে সংহতি জানায়। সারাদিন তারা আমাদের সঙ্গে অবস্থান করে। বিকালের দিকে আমাদের মনে হয়েছে, পলাশীর দিক থেকে পুলিশ কিংবা ছাত্রলীগ আক্রমণ করতে পারে। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাই, আমরা যারা বড়রা আছি, তারা অবস্থান করব। স্কুলের যারা আছে, তাদের বাসায় পাঠিয়ে দেব। কারণ, এখানে তাদের রাখাটা ঝুঁকিপূর্ণ। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্কুলের শিক্ষার্থীদের বাসায় পাঠিয়ে দিই। তখনো আমরা খবর পাচ্ছিলাম, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ করছে। কিছুক্ষণ পরই পলাশীর মোড় থেকে পুলিশ গুলি করতে করতে আমাদের দিকে আসা শুরু করে। অন্যদিক থেকে ছাত্রলীগ লাঠিসোঁটা নিয়ে আসতে থাকে। পুলিশ তখন টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেডও নিক্ষেপ করতে থাকে। বের হওয়ার রাস্তা না পেয়ে আমরা আজিমপুর কলোনির ভেতরে ঢুকে পড়ি। সেখানেও ছাত্রলীগ ঢুকে যায়। তখন একটি ভবনে আশ্রয় নিই। আশ্রয় নেওয়াদের মধ্যে একজনের গায়ে ১৭টা রাবার বুলেট লাগে। টিয়ার গ্যাস খেয়েও অনেকের অবস্থা গুরুতর ছিল।

কারফিউর দিনগুলো

১৮ জুলাই রাত ৮টার পর আমরা ওই ভবন থেকে বের হই। ওই ভবনে যারা ছিলেন, আমাদের বের হতে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। তারা আমাদের খবর দিয়েছেন, ছাত্রলীগের কারা কোথায় আছে। এরপর থেকে কারফিউ শুরু হয়। ইন্টারনেটের অবস্থা পুরোপুরি অচল করে দেওয়া হয়। আমাদের আইডি হ্যাক করা হয়। তখন আমরা ফোনে যোগাযোগ করতাম, কোন সময় কোনখানে অবস্থান করতে হবে। অনেক স্থানেই মিছিল, মিটিংগুলো বিচ্ছিন্নভাবেই হতো। আমরা ছোট ছোট গ্রুপ করে রাস্তায় নেমে যেতাম। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগÑএ রকম কর্মসূচিগুলো পালন করতাম। তখন আন্দোলনটা আর ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছিল না। সারাদেশে ছড়িয়ে যায়।

লাল প্রতিবাদ

৩০ জুলাই, যখন স্বৈরাচার সরকার শোকের মাস ও কালো ব্যাজ ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন জুলাই মাসে আমাদের ভাইদের হত্যা করার প্রতিবাদে প্রোফাইল লাল করে প্রতিবাদ জানানোর সিদ্ধান্ত হলো এবং সারাদেশের মানুষ ফেসবুক প্রোফাইল লাল করে সেই প্রতিবাদে শামিল হন। আমরা দেখলাম, পুরো বিশ্বে এর একটা ভালো প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে আন্দোলন দমানোর জন্য সমন্বয়কদের কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তখন আর আন্দোলন থেমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

এক দফা ঘোষণা

২৫-২৬ জুলাইয়ের দিকে বুঝতে পারলাম, লালবাগে থাকাটা ঠিক হবে না। কারণ নানাভাবে আমাকে ট্রেসিং করা হচ্ছে। শিক্ষকদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছে। বাসা পর্যন্ত আইডেন্টিফাই করেছে। তখন আমি যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগে বান্ধবীর বাসায় চলে যাই। আমরা বুঝতে পারছিলাম, আন্দোলন ঘিরে যা হচ্ছে, তা চরমপর্যায়ে চলে গেছে। এরই মধ্যে কাদের ভাই ৯ দফা দিয়ে দিয়েছেন। তা না মেনে সরকার আমাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছিল।

৩ আগস্ট, রায়েরবাগ থেকে আমরা হাসিনার পদত্যাগের এক দফা ঘোষণার জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে রওনা হই। শহীদ মিনারে এসে দেখলাম লাখ লাখ মানুষ। নাহিদ ভাইয়ের প্রেস ব্রিফিংয়ের আগেই মানুষ স্লোগান দিচ্ছিল ‘হ-তে হাসিনা, হ-তে হত্যাকারী’, ‘এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’, ‘দফা এক দাবি এক, খুনি হাসিনার পদত্যাগ’। আমরা তখন ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে। সেদিন শহীদ মিনারে সব সমন্বয়ক ছিলেনয না। কারণ, সেখানে আমাদের ওপর স্নাইপার অ্যাটাক থেকে শুরু করে যেকোনো কিছু হওয়ার ভয় ছিল।

যাত্রাবাড়ীতে যা দেখলাম এবং কাঙ্ক্ষিত বিজয়

আগস্টের ৪ এবং ৫ তারিখ যাত্রাবাড়ীতে ছিলাম। ৩ তারিখের পর থেকে ফেসবুকে নানা গুজব চলছিল, ৭ মিনিটে ক্লিয়ার করে দেবে। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এগুলো ছড়াচ্ছিল। ৪ তারিখে ঘোষণা করা হলো, ৬ তারিখে ‘লংমার্চ টু ঢাকা’। কিন্তু সেদিনই শহীদ মিনারে একটা ম্যাসাকার হয়। তাই লংমার্চ টু ঢাকা এক দিন এগিয়ে ৫ তারিখে করা হয়।

৫ তারিখের ঘটনা এমন ছিল, সারারাত একপ্রকার না ঘুমিয়ে সকালে নামাজ পড়ে, আল্লাহর কাছে শেষ মোনাজাত করে বাসা থেকে বের হই। সকালে যখন আমি রায়েরবাগের বাসা থেকে বেরিয়ে রাজপথে আসি, তখন মানুষজন কম ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, গণভবন অভিমুখে যাত্রা করার। কিন্তু পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের লোকজন হানিফ ফ্লাইওভার এবং যাত্রাবাড়ীর দিক থেকে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল। প্রতিমুহূর্তে গুলি, টিয়ার গ্যাস এবং সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ছিল। এর ভেতরে কত মানুষ আহত হয়েছে, শহীদ হয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। কিন্তু যাত্রাবাড়ী থানার সামনে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যাপকভাবে প্রস্তুতি রেখেছিল, তাদের সঙ্গে শেষ বিকাল পর্যন্ত লড়াই করতে হয়েছে।

অবশেষে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বিজয় এলো। ফ্যাসিবাদ হাসিনামুক্ত বাংলাদেশ। তখন মনে হচ্ছিল, এই বাংলার বাতাস এত সতেজ, কোমল এবং শান্ত আর কখনো মনে হয়নি। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়েছিলাম সেদিন। এটাই ছিল বিজয়ের স্বাদ। কিন্তু একটা কথা আছে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে, রক্ষা করা কঠিন। তাই এখনো প্রতিনিয়ত সেই স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য লড়াই অব্যাহত রেখেছি। আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবই, ইনশাআল্লাহ।

গ্রন্থনা : রায়হান আহমেদ তামীম

মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিলেন যারা

সেলিমার ‘হোমমেড’ থেকে ‘হোমব্র্যান্ড’

রমজানে ইবাদত ও সাংসারিক অদৃশ্য শ্রম

নিজের কাজকে ভালোবাসতে হবে: শর্মি

দৃঢ় প্রত্যয় থেকেই বিসিএস ক্যাডার অনন্যা

নারীবান্ধব রাষ্ট্রনীতি ও তাদের সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন চাই

ভোটের মাঠে নারীর পদচারণা

স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ও ভালোবাসা পাচ্ছেন নারী প্রার্থীরা

নিরাপদ খাবার নিয়ে সাবিহার পথ চলা

রাজধানীতে শীতকালীন উদ্যোক্তা মেলা