হোম > ফিচার > তারুণ্য

জুলাই মেমোরিজ বিস্মৃতির বিরুদ্ধে এক ডিজিটাল আর্কাইভ

হাসান ইনাম

২০২৪, চলছে জুলাই। একদিকে চলছে গণহত্যা, অন্যদিকে রচিত হচ্ছে নয়া বিপ্লবের ইশতেহার। দেয়ালে-দেয়ালে আর রাজপথে লেখা হচ্ছে জুলাইয়ের ম্যানিফেস্টো। একটু পেছন ফিরে তাকালেই মনে পড়ে সেইসব দুঃসাহসী দিনের কথা—মুখে মাস্ক, হাতে স্প্রে নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন নাম না-জানা তরুণ-তরুণীরা। ভয়ডরহীন চিত্তে দেয়ালে দেয়ালে লিখছেন— ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’, ‘দফা এক, দাবি এক—খুনি হাসিনার পদত্যাগ।’

তবে এসব গ্রাফিতি আর স্লোগান দেয়াল থেকে মুছে যেতে বেশি সময় লাগেনি। স্বৈরাচারের পতনের পর এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে দেশজুড়ে লেখা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বহু গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে। আবার জুলাইয়ের পর স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চা রঙতুলি হাতে নেমেছে রাস্তায়; কাঁচা হাতে লিখেছে—‘বাংলাদেশ ২.০’, ‘স্বাধীনতা এনেছি, সংস্কারও আনব।’

২০২৬ সালে এসে এসবের অনেক কিছুই গণমানুষের স্মৃতি থেকে বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে; ফিকে হয়ে গেছে অনেক দেয়াললিখন ও গ্রাফিতি। আর এই বিস্মৃতির বিরুদ্ধেই লড়াইয়ে নেমেছিলেন একদল তরুণ। সারা বাংলাদেশ ঘুরে তারা তৈরি করেছেন ডিজিটাল আর্কাইভ—জুলাই মেমোরিজ। শুরুটা ছিল জুলাই গ্রাফিতি আর্কাইভ দিয়ে। লক্ষ্য ছিল, দেয়ালে-দেয়ালে লেখা আন্দোলনের ভাষা হারিয়ে যাওয়ার আগে আর্কাইভ করে রাখা। পরে তারা বুঝতে পারেন, শুধু গ্রাফিতি দিয়ে জুলাইকে বোঝা যাবে না; এই গণঅভ্যুত্থানের ভাষা ছড়িয়ে আছে স্লোগানে, গানে, র‍্যাপে, কবিতায় আর মানুষের স্মৃতিতে। সেই জায়গা থেকেই জুলাই মেমোরিজ—একটি অনলাইন আর্কাইভে।

জুলাই মেমোরিজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘শুরুতে আমরা শুধু জুলাইয়ের গ্রাফিতিগুলো সংরক্ষণের জন্য কাজ শুরু করি। পরে মনে হলো, শুধু গ্রাফিতি নয়, পুরো আন্দোলনের স্মৃতিগুলো একসঙ্গে আনা দরকার।’ এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তাদের দীর্ঘ যাত্রা। ১১টি জেলায় ঘুরে তারা তুলেছেন প্রায় ১০ হাজার গ্রাফিতির ছবি। ইয়াসির আরাফাত নিজে জুলাইয়ে মাঠে ছিলেন সাংবাদিক হিসেবে। সচিবালয় বিটে কাজ করলেও জুলাইয়ের উত্তাল সময়ে তার সেই নিয়মিত বিট ভেঙে যায়; তাকে আন্দোলন কাভার করতে পাঠানো হয় মিরপুর-১০, উত্তরাসহ রাজধানীর উত্তপ্ত এলাকায়।

তিনি বলেন, ‘জুলাই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত করেছে। সেখান থেকেই এই কাজটা শুরু করা—একটা দায়বোধ থেকেও।’ অন্যদিকে আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা সিলমী সাদিয়া তখন খুলনায় কাজ করতেন। তিনিও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী। খুলনার দেয়ালে নিজে গ্রাফিতি আঁকতে আঁকতেই একসময় বুঝতে পারেন, এই দেয়ালগুলো বেশিদিন থাকবে না। সিলমীর ভাষায়, ‘নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগেই যেন এগুলো চিরদিনের জন্য অনলাইন মহাফেজখানায় রেখে দেওয়া যায়—এই চিন্তা থেকেই গ্রাফিতির ছবি তোলা শুরু।’

কাজটি সহজ ছিল না। কিছু গ্রাফিতি ছিল আন্দোলন চলাকালের, যেখানে সরাসরি ক্ষোভ, বিচার দাবি আর পতনের ডাক ছিল। আরেক অংশ জুলাই-পরবর্তী সময়ের, যেখানে শিশু-কিশোর ও তরুণেরা রঙতুলি হাতে স্বপ্নের বাংলাদেশ এঁকেছে। তাই তাদের আর্কাইভেও গ্রাফিতির দুটি সময় আলাদা করে দেখা যায়—জুলাই চলাকালীন প্রতিবাদের ভাষা এবং জুলাই-পরবর্তী পুনর্গঠনের স্বপ্ন।

তবে যে লেখাগুলো সবচেয়ে বেশি সময়ের দলিল হয়ে থাকতে পারত, তার অনেকগুলোই দ্রুত মুছে ফেলা হয়েছে। শেরাটন হোটেল এলাকা, সচিবালয়, মেট্রোর পিলার—এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লেখা ‘ছাত্রহত্যার বিচার চাই’, ‘মার্ডারার হাসিনা’, ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’-এর মতো গ্রাফিতি এখন আর নেই। ইয়াসির বলেন, ‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখা ছয় মাসের মধ্যেই মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমরা সেগুলোর ছবি রেখে দিতে পেরেছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।’

জুলাই মেমোরিজ শুধু গ্রাফিতির ভান্ডার নয়। ইন্টারনেট ও রাজপথের বিভিন্ন উৎস থেকে তারা সংগ্রহ করেছেন আন্দোলনের স্লোগান। আন্দোলনের সময় লেখা কবিতা, প্রতিবাদের গান, র‍্যাপ—এসবও যুক্ত হয়েছে ওয়েবসাইটে। ভবিষ্যতে জুলাইকে ঘিরে লেখা উপন্যাস, আরো কবিতা ও সাহিত্যকর্ম যুক্ত করার পরিকল্পনাও আছে তাদের।

এই উদ্যোগের পেছনে ছিল আরো অনেক মানুষের শ্রম। কেউ লোকেশন দিয়েছে, কেউ সারাদিন সঙ্গে হেঁটেছে, কেউ ছবি তুলতে সাহায্য করেছে, কেউ অর্থ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। ইয়াসির বলেন, ‘অনেকেই আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের নাম যদি সামনে আসে, তারা খুশি হবে; কারণ এই কাজটা আসলে সবার।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে ইয়াসির ও সিলমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শহীদ সাংবাদিকদের নিয়ে বই লেখা। জুলাইয়ে শহীদ হওয়া ছয়জন সাংবাদিককে নিয়ে তাদের লেখা বই প্রকাশ করেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)। সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে মাঠের অভিজ্ঞতা, শহীদ সাংবাদিকদের গল্প এবং আন্দোলনের সাংস্কৃতিক দলিল—সব মিলিয়ে তাদের কাজ এক ধরনের ধারাবাহিক স্মৃতি সংরক্ষণের প্রচেষ্টা।

জুলাই মেমোরিজ কেবল একটি ওয়েবসাইট নয়। এটি বিস্মৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক ডিজিটাল প্রতিরোধ। দেয়ালের লেখা হয়তো মুছে যাবে, রঙ ফিকে হবে, নতুন প্রলেপে ঢাকা পড়বে প্রতিবাদের বাক্য; কিন্তু সেই লেখা, স্লোগান, গান ও কবিতা ডিজিটাল আর্কাইভে থেকে যাবে।

শ্রমের দামে বোনা জীবনের স্বপ্ন

ভিন্নধারার বৈশাখ

উপকূল-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার গল্প

এক চোখে দেখা স্বপ্ন

শীতের রিক্ততা মুছে এসে গেছে বসন্ত

যেভাবে রাজনীতির লাইমলাইটে ওসমান হাদি

নির্বাচনে কারা প্রার্থী হতে বা ভোট দিতে পারবেন না

সদ্য সমাপ্ত নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতা : বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন

বই মানুষের প্রকৃত বন্ধু

‘কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ শিখতে জাপানে