ঢাকার ইতিহাস লিখতে গেলে ঢাকার প্রাচীন মন্দিরগুলোর কথা অনিবার্যভাবেই উঠে আসে। এসব প্রার্থনালয়ের স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে নগরীর বহু মিথ, লোককথা ও ইতিহাস। ঢাকার প্রাচীন ঐতিহ্যের আলোচনায় সবার আগে যে নামটি আসে, তা হলো ঢাকেশ্বরী মন্দির, ঢাকার অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আবাস হিসেবে যে মন্দিরকে ঘিরে হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে শত শত বছর ধরে গড়ে উঠেছে নানা বিশ্বাস ও গল্প।
১৯১২-১৯১৩ সালে প্রকাশিত ঢাকার ইতিহাস গ্রন্থে শ্রীযতীন্দ্রমোহন রায় লিখেছেন, “বর্ত্তমান ঢাকা নগরীর পশ্চিম প্রান্তে ঢাকেশ্বরীর মন্দির অবস্থিত। ঢাকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলিয়াই ইনি ঢাকেশ্বরী নামে অভিহিত হইতেছেন, অথবা ঢাকেশ্বরী দেবীর নামানুসারেই ঢাকার নামকরণ হইয়াছে, তাহা নির্ণয় করা সুকঠিন। ঢাকেশ্বরী কতকাল যাবৎ জনসাধারণের পুষ্পাঞ্জলি গ্রহণ করিয়া আসিতেছেন তাহা জানা যায় না।”
ঢাকার নামকরণের সঙ্গে ঢাকেশ্বরী দেবীর সম্পর্ক নিয়েও রয়েছে নানা মত। কেউ মনে করেন, দেবীর নাম থেকেই ঢাকার নামকরণ হয়েছে; আবার কেউ মনে করেন, ঢাকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবেই তিনি ঢাকেশ্বরী নামে পরিচিত হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত ঢাকা কোষ-এ ঢাকেশ্বরী মন্দির সম্পর্কে বলা হয়েছে, “ধারণা করা হয় একাদশ শতাব্দীতে এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল। তবে এর নির্মাতা ও নির্মাণকাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে।”
স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যে আরাকানি প্রভাব এবং মন্দিরে অধিষ্ঠিত প্রতিমার সঙ্গে মগ দেবীদের সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের সূত্র ধরে অনেকে মনে করেন, মন্দিরটির নির্মাতা ছিলেন বল্লাল সেন নামে পরিচিত আরাকান রাজপুত্র মঙ্গত রায়। ধারণা করা হয়, আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি ঢাকায় এসে এই মন্দির নির্মাণ করেন।
তবে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। ইতিহাসবিদ রতনলাল চক্রবর্তীর মতে, মন্দিরটির গঠনপ্রণালী অনেকটা বৌদ্ধ মঠের মতো। এটি সম্ভবত প্রথমে বৌদ্ধ মন্দির ছিল, পরে তা হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত হয়।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে সবচেয়ে প্রচলিত কিংবদন্তিগুলোর একটি বল্লাল সেনকে নিয়ে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, রাজা বিজয় সেনের রানি একবার লাঙ্গলবন্দে স্নানে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তার একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে, যিনি ইতিহাসে বল্লাল সেন নামে পরিচিত হন। সিংহাসনে আরোহণের পর নিজের জন্মস্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে বল্লাল সেন এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায় মোগল সেনাপতি মানসিংহকে কেন্দ্র করে। ঢাকার ইতিহাস গ্রন্থে আনন্দনাথ রায়ের বারভূঞা গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিক্রমপুরের কেদার রায়কে পরাজিত করে মানসিংহ তার গৃহদেবী শিলাময়ীকে নিয়ে ফেরার সময় একটি ঘটনা ঘটে।
কথিত আছে, কারিগরেরা শিলাময়ী দেবীর অবিকল একটি নতুন প্রতিমা তৈরি করেন। পরে স্নান করানোর কথা বলে তারা আসল মূর্তিটি সরিয়ে নিজেদের তৈরি মূর্তি দেবীর আসনে স্থাপন করেন। দুটি মূর্তি একসঙ্গে রাখার পর কোনটি আসল, আর কোনটি নতুন তা কেউ বুঝতে পারেননি। পরে কারিগরেরা বিষয়টি প্রকাশ করলে মানসিংহ তাদের পুরস্কৃত করেন। তিনি চাঁদ রায়ের দেবীকে জয়পুরে নিয়ে যান এবং অপর মূর্তিটি ঢাকায় স্থাপন করেন। পরে এটি ঢাকেশ্বরী নামে পরিচিত হয়।
উনিশ শতকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা ছিল আজকের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হৃদয়নাথ মজুমদারের বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় মন্দিরটি ছিল ঘন জঙ্গলে আবৃত মন্দিরের দক্ষিণ দিকে ছিল উর্দু রোড, যা পশ্চিমে পিলখানার দিকে চলে গিয়েছিল। উত্তর-পশ্চিমে ছিল মিরপুর যাওয়ার রাস্তা। উত্তরে ছিল জঙ্গল এবং পূর্বদিকে ছিল উর্দু বাজার।
তখন মন্দিরটি ছিল পঞ্চরত্ন স্থাপত্যের। সামনে ছিল নাটমন্দির, আর নাটমন্দিরকে ঘিরে ছিল এক সারি ঘর। মন্দির প্রাঙ্গণে ছিল একটি বড় পুকুর এবং নহবতখানা-সংবলিত ফটক, যার ভেতর দিয়ে হাতি প্রবেশ করত।
মন্দিরের পূর্বদিকে ছিল কয়েকজন সাধুর সমাধি, যারা একসময় এখানে পূজা বা ধ্যান করতেন। মন্দিরের বাইরে ছিল পাঁচটি (কিছু বর্ণনায় চারটি) মঠ, প্রতিটিতে ছিল একটি করে শিবলিঙ্গ। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত প্রতিদিন এসব শিবলিঙ্গের পূজা করতেন।
দেবী ছিলেন দশভূজা। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, দেবীর মূর্তি নাকি সোনার তৈরি। দেবীর দুই পাশে ছিল আরও কয়েকটি মূর্তি। পুরনো হিন্দু মন্দিরগুলোর মতো এর অভ্যন্তরও ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন; ফলে দিনের বেলাতেও দেবী দর্শনের জন্য আলো জ্বালাতে হতো।
১৯০১ সালে যতীন্দ্রমোহন রায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে উঠে আসে এক শান্ত, সবুজে ঘেরা পরিবেশের ছবি। তিনি লিখেছেন, “ঢাকেশ্বরী জঙ্গলাকীর্ণ কিন্তু যেন শান্তি নিকেতন। কলকণ্ঠ বিহগের অস্ফুট কাকলির সহিত সন্ধ্যারাতির শঙ্খ ঘণ্টারোল বিমিশ্রিত হইয়া স্থানটিকে বাস্তবিকই আনন্দ-মুখরিত করিয়া তুলে।” তিনি আরও লিখেছেন, আমগাছসহ নানা বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা এমনভাবে বিস্তৃত ছিল যে মধ্যাহ্নের সূর্যের আলোও সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে পারত না। ফলে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও মন্দির প্রাঙ্গণ থাকত শীতল ও প্রশান্ত।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সামাজিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় নাজির হোসেনের স্মৃতিচারণে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, বিংশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে চৈত্র মাসে মন্দির প্রাঙ্গণে বসত বিশাল মেলা।
বিভিন্ন রঙের দোকান, তীর্থযাত্রী ও ভক্তদের আগমনে মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদীতে পুণ্যস্নানের মতোই অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ দেবী দুর্গার আশীর্বাদ লাভের আশায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আসতেন।
দূর-দূরান্ত থেকে দল বেঁধে আসতেন তীর্থযাত্রীরা। তাঁদের মধ্যে থাকতেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নারী ও সাধারণ মানুষ। অনেকে মন্দিরের পথে এগিয়ে যেতেন প্রার্থনা ও বিশ্বাস নিয়ে। মন্দিরে এসে তাঁরা নিবেদন করতেন নিজেদের আকুতি, উচ্চারণ করতেন—‘ওম ঢাকা ঈশ্বরী’।
সময় বদলেছে। বদলেছে ঢাকার নগরচিত্র। সেই জঙ্গলঘেরা, শান্ত পরিবেশের ঢাকেশ্বরী মন্দির আজ আর নেই। কিন্তু ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের সঙ্গে এই মন্দিরের সম্পর্ক এখনো অটুট।
ঢাকেশ্বরী শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি ঢাকার বহু শতকের স্মৃতি, কিংবদন্তি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। ইতিহাসের নানা স্তর, বিতর্ক ও বিশ্বাসকে ধারণ করে মন্দিরটি আজও দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো ঢাকার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক চিহ্ন হয়ে।