হোম > সাহিত্য সাময়িকী > বাংলার ইতিহাস

বঙ্গভঙ্গ এবং নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্ব

আবূ সা’দ ড. মো. ওসমান গনী

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের সূচনালগ্নে বাংলা ছিল ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম বৃহৎ ও জনবহুল অঞ্চল। প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক সচেতনতার উত্থান এবং সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা এর সবকিছুর সমন্বয়ে ১৯০৫ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ। বহু বছরের সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় ছিল বঙ্গভঙ্গ। এই প্রেক্ষাপটে পূর্ববাংলার মুসলমান সমাজের নেতৃত্বে যারা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, ঢাকার নবাব পরিবারের নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন তাদের অগ্রগণ্য নেতা। বঙ্গভঙ্গের প্রশ্নে তার নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি বিশেষ মূল্যায়নের দাবি রাখে।

নবাব সলিমুল্লাহ (১৮৭১-১৯১৫) ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারের সুযোগ্য উত্তরসূরি। একজন সুশিক্ষিত দূরদর্শী ও প্রগতিশীল মুসলিম নেতা। তার উত্থান ছিল অবহেলিত মুসলমানদের জন্য আশীর্বাদ। মুসলমানদের কল্যাণই ছিল তার ব্রত। তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেন। তার অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বঞ্চিত ও অবহেলিত মুসলিম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।

মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় তার সুস্পষ্ট অবস্থানদৃষ্টে দেশবাসী আকৃষ্ট হয়। বিকশিত হয় এক সাংগঠনিক দক্ষতা। অচিরেই ত্রাতারূপে সব মহলে সমাদৃত হন। তার অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতাচর্চা তাকে দলমত-নির্বিশেষে ঐক্যের রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিত করে তোলে। তার শিক্ষাবান্ধব ও সংস্কারমুখী চিন্তাভাবনা সমাজে সুবাতাস প্রবাহিত হয়। মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার যৌক্তিক প্রয়োজন সমাজে অনুভূত হয়। এ জন্য জাতিকে শিক্ষিত করার শর্ত প্রাধান্য লাভ করে।

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের উন্নতি হতে পারে নাÑএই ভাবনা তাকে প্রভাবিত করে। তার মতে, শিক্ষা হলো জীবন-সংগ্রামের হাতিয়ার; এর উদ্দেশ্য মানসিক উৎকর্ষ, বিলাস নয়। নৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন একটি আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষা বিস্তারে তিনি সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ছাত্রছাত্রীদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যা তাদের ভবিষ্যতের সুস্থ নাগরিকরূপে গড়ে তুলবে এবং এর ফলে তারা কর্মজীবনে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। ১৯০৬ সালে ঢাকায় আয়োজিত প্রাদেশিক মুসলিম শিক্ষা সমিতির প্রথম সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি উল্লেখ করেনÑ

I have my own ideas about the short of eduction that should in imparted our children to fit them to become good Citizens and capable of discharging their Varius duties in life effciently. (Procedings of The Princial Mohammadan education Conference, Eastarn Bangald Assam, 1996, P. 7-9|)

তিনি সুনির্দিষ্টভাবে শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেন। অচিরেই তার এবংবিধ শিক্ষাবান্ধব ও সংস্কারমুখী চিন্তা সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

বিস্তীর্ণ অঞ্চল একই সঙ্গে শাসনাধীন রেখে পরিচালনা করা ইংরেজদের জন্য সহজ কাজ ছিল না। তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর উইলিয়াম গ্রে বলেন, ‘এই প্রদেশের বিশাল আয়তনের কারণে একজনের পক্ষে শাসন পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।’ ন্যায্যতার নিরিখে তিনি আরো বলেন, ‘এ কারণে সব জনগণের প্রতি সুবিচার সম্ভব নয়।’ বস্তুত বিশাল আয়তনের পাশাপাশি ৬ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশ নিয়ন্ত্রণ সুকঠিন ছিল, তা আমরা এর আগে উল্লেখ করেছি। এই উপলব্ধি শুধু ইংরেজ সরকারেরই ছিল না, নবাব সলিমুল্লাহ গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। আর কাজটি সর্বজনগ্রাহ্য ও সহজীকরণের লক্ষ্যে লর্ড কার্জন রিজলি পরিকল্পনা সম্প্রসারণ করে ঢাকার নেতাদের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করেন।

লর্ড কার্জনের আন্তরিকতা সত্ত্বেও সহসাই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৯০৩ সালে ১৭ জানুয়ারি জমিদার আনন্দচন্দ্র রায়ের বাসভবনে ত্রৈলোক্যনাথ বসুর সভাপতিত্বে হিন্দু জমিদার, তালুকদার, মহাজন, উকিল ও ব্যবসায়ী ইত্যাদি শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি নবাব সলিমুল্লাহর বিপক্ষে অতিমত দেন। নবাব সলিমুল্লাহ দমার পাত্র ছিলেন না। তিনি ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জনের পূর্ববঙ্গ সফরকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি লর্ড কার্জনকে ঢাকায় বিপুল সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করেন। শুধু তাই-ই নয়, নবাব সলিমুল্লাহ নিজ বাসভবনে কার্জনের অবস্থানের ব্যবস্থা করেন। লর্ড কার্জনের ঢাকায় আগমন এবং নবাব সলিমুল্লাহর সঙ্গে কার্জনের এই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কার্জনের সঙ্গে নৈকট্য অর্জন সরকারি পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন হয় এবং তা শেষ পর্যন্ত পূর্ববাংলার মুসলমাদের অনুকূলে দাঁড়ায়। বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা বিলাতে বিশেষভাবে পরীক্ষিত হওয়ার পর ১৯০৫ সালের জুন মাসের ভারত সচিব কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। অবশেষে প্রবল উত্তাপ ও উত্তেজনার মধ্যে ১৯০৫ সালে ১৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ জন্মলাভ করে।

বঙ্গভঙ্গের ফলে সমগ্র বাংলায় ঐতিহাসিক বিপ্লব সূচিত হয়। তৃতীয়বারের মতো ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পায়। ১ লাখ ৬ হাজার বর্গমাইলের সুবৃহৎ প্রদেশের রাজধানী হিসেবে বরিত হয়। কিন্তু নানা অযৌক্তিক কারণকে সামনে এনে হিন্দুরা এর প্রবল বিরোধিতা শুরু করে। পাঁচ বছর পর এটি রদ হলেও নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ জন্ম লাভ করে। অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার অবিনাশী প্ল্যাটফর্ম শোকাহত মুসলমানদের পুনর্বার সাহসী করে তোলে।

নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করলে প্রতীয়মান হয়, তিনি আবেগনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে বাস্তববাদী ও লক্ষ্যভিত্তিক নেতৃত্ব দেন। মুসলমানদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেন; উজ্জীবিত করেন, যা পরবর্তীকালে মুসলিম রাজনীতির ভিত্তি গঠনে সহায়ক হয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও সলিমুল্লাহ মুসলমানদের সংগঠিত ও আত্মসচেতন করে তোলেন, যার ফলে ভবিষ্যৎ পাকিস্তান আন্দোলনের বীজ উপ্ত হয়। আপাতত দৃষ্টিতে বলা যায়, বঙ্গভঙ্গ সমর্থনের ফলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরো স্পষ্ট হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নবাব সলিমুল্লাহর সিদ্ধান্ত ছিল মুসলমান সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক ও সমযোপযোগী।

বঙ্গভঙ্গ ছিল বাংলার ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী ঘটনা এবং নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন এর অন্যতম মুসলিম নেতা। তার নেতৃত্বে শুধু একটি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সমর্থনের সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার, আত্মপরিচয় ও সংগঠিত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথ প্রশস্ত করে। তাই বলা যায়, বঙ্গভঙ্গ ও নবাব সলিমুল্লাহÑএই দুটি ইতিহাসের পাতায় অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। তার নেতৃত্বে বাংলার মুসলিম রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। নবাব সলিমুল্লাহ নিজের উদাহরণ হিসেবে বাংলার ইতিহাসে আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন।

লেখক : প্রফেসর ও পরিচালক, এশিয়ান ইনস্টিটিউট এবং সাবেক ডিন, স্কুল অব আর্টস, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ